আগামী অর্থবছরের বাজেটে অগ্রিম কর, উৎসে কর, ভ্যাট, শুল্কে ছাড় দেওয়া না হলে টিকে থাকা কঠিন হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। এ জন্য নগদ সহায়তা বাড়ানো, শিল্পের সব খাতে রাজস্বমুক্ত সুবিধায় বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস সরবরাহসহ এ গুচ্ছ দাবি জানিয়েছেন তারা। এ ছাড়া করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, কর অবকাশ খাতের আওতা বাড়ানো, বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা আগামী অর্থবছরেও বহাল রাখা এবং ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য ফ্ল্যাট কিনে কালো টাকা সাদা সুযোগ চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, বাজেটে ব্যবসায়ীদের খুশি রাখার চেষ্টা করা হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ৪৩তম পরামর্শক কমিটির সভায় আগামী অর্থবছরের বাজেটে অন্তর্ভুক্তিতে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা এমন একগুচ্ছ দাবি জানিয়েছেন। দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এ সভার আয়োজন করে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সঞ্চালনা করেন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী নেতা এবং এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসায়ীদের খুশি করার চেষ্টা করা হবে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আপনারা ঠকবেন না। আপনারা যেসব লিখিত প্রস্তাব দিয়েছেন সেসব নিয়ে আমি এবং এনবিআর চেয়ারম্যান এরই মধ্যে বৈঠক করেছি। আরও বৈঠক করব। আশা করি আপনাদের সুবিধামতো একটা বাজেট দিতে পারব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আগামীতে এমনভাবে বাজেট প্রণয়ন করব যাতে কোনো ধরনের ঋণ নেওয়া না লাগে।’
বাংলাদেশ ধীরে ধীরে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘২০৪১ সালের স্বপ্নের সিঁড়িতে আছি। আসন্ন বাজেট হবে জনবান্ধব, বিনিয়োগবান্ধব। এ বাজেটটি হবে জনগণের সুবিধার্থে।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। এর মধ্যেও এ দেশের বেসরকারি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে
বাংলাদেশের অবস্থান ৪১ থেকে ৩৫তম স্থানে এসেছে। এর অংশীদার সবাই। উন্নয়নশীল দেশ ভারত, মালয়েশিয়ার কাতারে আজ আমরাও। সবাইকে নিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে চাই। বাংলাদেশের অগ্রগতিতে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ আজ প্রশংসা করছে।’
চলমান বৈশি^ক মন্দার প্রেক্ষাপটে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীল খাতকে এগিয়ে নিতে শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট প্রণয়নে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানকে দৃঢ় করতে ব্যবসায়িক খরচ (কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস) কমিয়ে আনতে আগামী বাজেটে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিনিয়োগ সুরক্ষা, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুষম বিনিয়োগসহায়ক মুদ্রা ও শুল্ক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, শিপিং খরচসহ সব ধরনের পরিবহন, বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খরচ কমাতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।’
দেশের আবাসন খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির বিবেচনায় ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দাবি করেন ব্যবসায়ী এ নেতা। তিনি বলেন, ‘২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নে বিনিয়োগ, দেশীয় শিল্প ও সেবা খাতে শুল্ক কর যৌক্তিক করা, ভ্যাট অব্যাহতি, বন্ড সুবিধা বহাল রাখা, করনীতি, করপদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণের মাধ্যমে কর জাল সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।’
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, আয়করের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে ব্যক্তি করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ এবং মহিলা ও সিনিয়র নাগরিকদের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা এখন সময়ের দাবি। সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় তালিকাভুক্ত ভোগ্য পণ্যকে উৎসে কর কর্তনের আওতাবহির্ভূত রাখার প্রস্তাব করেন তিনি।
জসিম উদ্দিন বলেন, যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক, মৌলিক এবং দেশে উৎপাদন হয় না এমন কাঁচামালের শুল্ক হার ১ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ করা, পণ্য বা সেবার ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ, জ¦ালানি সাশ্রয় ও পরিবেশবান্ধব গাড়ির শুল্ক হার হ্রাস করারও আহ্বান জানাই।
এ ছাড়া তিনি উপজেলা পর্যন্ত ভ্যাট অফিস স্থাপন, ভ্যাট জালের আওতা বাড়ানো, আমদানিকৃত উপকরণের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ আগাম কর ধাপে ধাপে রহিত করা, নিম্ন আয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যবহার্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবা, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শিল্পের কাঁচামাল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রি-সাইক্লিং, টেন্ডারবহির্ভূত সরাসরি পণ্য মেরামত বা সেবা খাতে মূসক ও সম্পূরক শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া, ভ্যাট নিবন্ধন, রিটার্ন দাখিল, রিফান্ড, অডিটসহ সব কার্যক্রমে অটোমেশন নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন।
সভাপতির বক্তব্যে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। আগামীতে অনেক খাতে অব্যাহতি তুলে দেওয়া হবে। আদায় বাড়াতে ভ্যাট জালের আওতা বাড়ানো হবে। কর আরোপে নতুন ভার আসতে পারে। এসব মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের ও শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রস্তুত হতে হবে।’
‘এনবিআরকে রাজস্ব আদায় বাড়াত হবে। আবার ব্যবসা ও শিল্প এগিয়ে নিতে রাজস্ব ছাড় দিতে হবে’ এমন পরিস্থিতিতে এনবিআর কীভাবে কাজ করবে? এমন প্রশ্ন তুলে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘উপায় একটাই; তা হলো ব্যবসা ও শিল্পে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।’ এনবিআরের সংস্কার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অডিট ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা হচ্ছে, রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করতে অটোমেশন করা হবে। বন্দরে স্ক্যানার বসিয়ে শুল্ক ফাঁকি বন্ধ করা হবে।’
সভায় অনেক ব্যবসায়ী নেতা অভিযোগ করে বলেন, এনবিআরের অনেক অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী রাজস্ব আদায় করতে গেলে বিভিন্ন অজুহাতে অনৈতিক সুবিধা দাবি করেন। কাগজপত্র জব্দ করে নিয়ে যান। হয়রানি করে হিসাবের চেয়ে বেশি রাজস্ব দাবি করেন। কাগজপত্র ছুড়ে ফেলে দেন।
অন্যান্য ব্যবসায়ীর মধ্যে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি সামীর সাত্তার বলেন, ‘বৈশি^ক মন্দার কারণে আমরা ব্যবসা চালিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছি। এমন পরিস্থিতিতে উৎসে কর ও অগ্রিম করে এত ভার চাপানো হলে আমরা কীভাবে ব্যবসা চালিয়ে নেব?’ তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাত কঠিন প্রতিযোগিতায় পড়েছে। আমাদের টিকিয়ে রাখতে সুবিধা দেওয়া না হলে দেশের রপ্তানি আয়ে ধস নামবে। তাই আমাদের সব সুবিধা বহাল রাখা, নগদ প্রণোদনা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অগ্নিনির্বাপণ ও কারখানা নির্মাণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিতে হবে।’
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আলী খোকন বলেন, ‘আমরা সুতা ও কাপড় বানাই। তৈরি পোশাক খাতের মতো আমাদেরও সুবিধা দিতে হবে।’ বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শামীম আহমেদ ও বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মানওয়ার হোসেন কাঁচামাল আমদানিতে রাজস্ব সুবিধা চেয়েছেন।
এসএমই খাতের সংগঠন নাসিবের সভাপতি মির্জা নূরুল গণি শোভন এফবিসিসিআই এবং এসএমই খাতের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি নিয়ে টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করেন। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ বলেন, ‘সব কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার সঠিকভাবে নির্মাণ করতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে ছাড় দেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া চামড়া শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিক আমদানিতেও সব সুবিধা দিতে হবে।’ বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন সব ব্যবসায়ীর কাছে বঙ্গবাজারের ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সুবিধা প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি খন্দকার মনির আহমেদ বলেন, ‘পোলট্রি খাতের উন্নয়নের জন্য একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান করা এখন সময়ের দাবি।’ ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি শমী কায়সার অফিস ভাড়া ও ডেলিভারি চার্জের ওপর রাজস্ব প্রত্যাহারে দাবি জানিয়েছেন।
