আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, পশ্চিমা জোটের উদারনৈতিক অর্থনীতি আর পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে সোভিয়েত জোটের আদর্শিক কর্মপন্থা লাতিন আমেরিকা ও মধ্য এশিয়ায় সুফল দিলেও মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়, যে প্রতিরোধের চূড়ান্ত রূপ ছিল আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধ। আফগান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোয় সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করেছিল। কিন্তু মার্কিনদের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, অনন্ত যুদ্ধের পরে আদর্শিক পররাষ্ট্রনীতির স্থান নিয়েছে স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি। সিরীয় যুদ্ধের অনিশ্চিত গতিপথ রাশিয়াকে যেমন ফিরিয়ে এনেছে মধ্যপ্রাচ্যে। তার সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে চীন। সাত দশকের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট চলছে। ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের অভিযান অব্যাহত রাখায় উত্তেজনা আগের চেয়ে বেড়েছে। ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতের মাত্রা বৃদ্ধি পায় মূলত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ষষ্ঠবারের মতো সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে। তিনি এমনিতেই কঠোর ডানপন্থি হিসেবে পরিচিত, তার ওপর তার সরকারে যারা শরিক হিসেবে রয়েছেন তারা সবাই গোঁড়া ধর্মপন্থি দল। তারা সম্মিলিতভাবে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার বিরোধী এবং সেই সঙ্গে পর্যায়ক্রমে ফিলিস্তিনি বসতি উচ্ছেদ করে ইসরায়েলের দখলদারি চাঙ্গা করার পক্ষপাতী।
ইসরায়েল সরকারের এ ধরনের মনোভাব ফিলিস্তিনিদের ক্রমেই বিক্ষুব্ধ করে তুলছে। সাম্প্রতিক সময়ে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে মধ্য প্রাচ্যকে কেন্দ্র করে আবারও নতুন সমীকরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই অঞ্চলে ২০ শতকের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে যে ভারসাম্য ছিল, তা ভেঙে পড়ে নতুন শতাব্দীর প্রথম দশকে। দ্বিতীয় দশকে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি হতে থাকে। তৃতীয় দশকের প্রথম ২ বছর ছিল নতুন এক মধ্যপ্রাচ্যের ভিত্তি তৈরির সময়। ২০২৩ সাল এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নতুন এক সময়কালের সূচনার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বছর হতে পারে। গত ১২ মার্চ পশ্চিম তীরের নাবলুসের নিকটবর্তী এলাকায় ইসরায়েলের বন্দুকধারীদের গুলিতে তিনজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়। এটি এর আগে গত ৯ মার্চ ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিন শহরে ইসরায়েলের সেনাদের গুলিতে তিনজন ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার একটা ধারাবাহিক ঘটনা। এই উভয় ঘটনায় ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এরা সশস্ত্র ছিল এবং অতর্কিতে তাদের সেনা চৌকিতে হামলা চালিয়েছিল।
জাতিসংঘের তথ্যানুসারে, ২০০৬ সালের পর ফিলিস্তিনিদের জন্য সবচেয়ে বেশি রক্তক্ষয়ের বছর ছিল ২০২২ সাল। তবে ২০২৩ সালের শুরুতেই যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে এ বছর গত বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতি সামাল দিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিংকেন গত ৩১ জানুয়ারি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সফর করে দুপক্ষের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু করার ওপর গুরুত্ব দেন। কিন্তু চলমান সংঘাত থেকে এটা স্পষ্ট অনুমান করা যায় যে, ইসরায়েল মূলত একটি জাতিগত নিধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আর এই লক্ষ্যে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সুকৌশলে বিভেদকে জিইয়ে রাখছে।
মূলত ইসরায়েল এখন চাইছে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামলা চালিয়ে নিরীহ মানুষদের হত্যা করে অভ্যন্তরীণভাবে হামাসকে চাপে রাখতে। আর এর কৌশল হিসেবে তারা বারবার প্রচার করছে হামাসের কারণে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে না। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু পশ্চিমা দেশ, এমনকি জাতিসংঘের মহাসচিবকেও বলতে শুনেছি, যুদ্ধবিরতির বিষয়টি এখন পুরোপুরি হামাসের ওপর নির্ভরশীল। এটাই যখন বাস্তবতা তখন সংগত কারণেই প্রশ্ন আসতে পারে, এই সমস্যার সমাধান তবে কোন পথে? এ প্রসঙ্গে নিকট ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্ষমতা ভাগাভাগির দ্বন্দ্বের জেরে ২০০৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর ও গাজা চলে যায় ফাতাহ ও হামাসের নিয়ন্ত্রণে। মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বে ফাতাহ পশ্চিম তীর এবং খালেদ মেশালের নেতৃত্বে হামাস গাজা শাসন করছে। দুই দলের মধ্যে এ বছরান্তে একটি জাতীয় সরকার গঠনের লক্ষ্যে চুক্তি হয়। সেই থেকে ইসরায়েল এই চুক্তিকে ভালোভাবে নেয়নি।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং মুসলিম দুনিয়ার নেতৃত্ব নিয়ে টানাপড়েনকে কেন্দ্র করে আরব দেশগুলো এখন কয়েকটি গ্রুপে জোটবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যা ইসরায়েলকে তার রাজনৈতিক ইচ্ছা হাসিলে অনেক সুবিধা করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সান-ডিয়েগো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং পশ্চিম এশিয়া বিশেষজ্ঞ আহমেদ কুরু বিবিসিকে বলেন, আরব দেশগুলোর মধ্যে এখন যে বিভক্তি এবং বিরোধ তা সাম্প্রতিক ইতিহাসে আর দেখা যায়নি ইরান-ইরাক-সিরিয়া একদিকে, আবার কাতার যোগ দিয়েছে তুরস্কের সঙ্গে। এই বিভেদকে পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছে ইসরায়েল।
বিপুল সংখ্যক সাধারণ ফিলিস্তিনিরা এখন মনে করছেন, তাদের সামনে এখন একটাই বিকল্প। আর তা হলো নিজেদের রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাদ দিয়ে ইসরাইল রাষ্ট্রে সমান অধিকারের দাবি তোলা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক বন্ধন দৃঢ় করেছে ইসরায়েল। নেতানিয়াহুর প্রত্যাবর্তন সেসব সম্পর্ককে কঠিন পরীক্ষায় ফেলবে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ফিলিস্তিনে সংঘাত আরও বাড়বে। সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছে চীন। ঠিক একই সময়ে গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত তীব্র হয়ে উঠেছে। চীন চাইছে, নিরাপত্তা পরিষদের সাময়িক এ নেতৃত্বকে কাজে লাগিয়ে সংকটের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে। শুধু ফিলিস্তিন-ইসরায়েল নয়, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি সংঘাতেই এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে দিয়েছে চীন। এমনকি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার বৈরিতায়ও চীনকে দেখা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে। যা হোক, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার অবসান ঘটিয়ে শান্তি ফিরে আসুক এটাই বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট
