এ সপ্তাহের বিতর্ক, হিন্দি চলচ্চিত্র আমদানি

হিন্দি ছবি প্রদর্শিত হলে দর্শকের পদচারণা বাড়বে

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৩, ১০:৪০ পিএম

মনে পড়ে না, কবে পত্রিকার জন্য কলাম লিখেছি। আজ এমন একটি বিষয় সামনে এসেছে, কিছু না বললেই নয়। যেহেতু আমি কিশোর বয়স থেকেই চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছি, তাই বিবেকের তাড়নায় এই লেখা। প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন আমি এই বিষয় সমর্থন করে লিখতে বসলাম? এর কারণও ঢের।

তখন আমি কিশোর। ১৯৬৭ সালে আব্বার হাত ধরেই চলচ্চিত্র অঙ্গনে প্রবেশ। আব্বা সিদ্ধান্ত নিলেন, একটি সিনেমা হল বানাবেন। চ্যানেল বিজয়ী ব্রজেন দাসের কাছ থেকে আব্বা, মধুমিতা সিনেমা হলের জায়গাটা কিনেছিলেন। তখন মতিঝিল আজকের মতো ছিল না। একেবারেই নির্জন জায়গা। তবু আব্বা সাহস করলেন। এরপর পত্রিকায় আহ্বান করলেন, সিনেমা হলের নাম চেয়ে। সবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নাম ঠিক হলো মধুমিতা। যাদের কাছ থেকে এই নাম পাওয়া গিয়েছিল, তাদের নগদ ৫-৬ হাজার টাকা পুরস্কৃত করা হয়। একই সঙ্গে ওপেনিং ডের টিকিট। শুরু হলো মধুমিতা সিনেমা হলের পথচলা।

মনে আছে, প্রথম ছবি ছিল ডাকবাবু। সে কি উত্তেজনা আমাদের! এরপর পাবলিক স্ক্রিনিং হলো ক্লিওপেট্রা। তখন আমি ক্লাস সিক্সের ছাত্র। সে সময় এখানে কোনো বাস চলাচল করত না। কাঁচা রাস্তা। বেশ নীরব জায়গা। তবু সিনেমা প্রদর্শনের কাজ চলতে থাকল। চলচ্চিত্র পরিবেশক ছিলেন হাতেগোনা কয়েকজন। মাত্র ৪-৫ জন।  সে সময় গুলিস্তান, বলাকা, স্টার, আজাদ, তাজমহল সিনেমা হলে হিন্দি ছবি চলত। আবার মাঝেমধ্যে উর্দু ছবিও চলত। এর মধ্যেও আব্বা আস্তে আস্তে টিকিয়ে রাখলেন মধুমিতাকে। 

স্বাধীনতার পর, ‘মধুমিতা মুভিজ’ নামে আব্বা প্রডাকশন শুরু করলেন। প্রথম ছবি ছিল উৎসর্গ। এরপর ১৯৭৬ সালে মারা গেলেন। বড় ভাই, প্রডাকশনের বিষয়টা দেখতেন। ১৯৭৯ সালে আমি আর মেজো ভাই লন্ডনে পড়াশোনা শেষ করে সিনেমা হলের দায়িত্ব নিলাম।

দীর্ঘ ৬ বছর সেন্সর বোর্ডের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলাম। খুব সামনে থেকে অনেক কিছুই দেখেছি। বিভিন্ন কর্মকর্তা আমাদের সিনেমা নিয়ে যে মন্তব্য করতেন, তা লজ্জাকর। কেউ কেউ বলতেন এসব ছবি কি কেউ দেখবে! এগুলো কি হলে চলবে? আমি লজ্জায় কিছু বলতে পারতাম না। এটা সত্য, তখন কিছুই করতে পারিনি।

একটা কথা কিন্তু গভীরভাবে ভাবতে হবে। আমাদের কোনো রিপ্লেসমেন্ট হচ্ছে না। যে সব পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, সংগীত পরিচালক, আলোকচিত্র শিল্পী মারা গেছেন তাদের শূন্যস্থান কি পূরণ হয়েছে? না, হয়নি। একই সঙ্গে ভালগারিজম চলে আসে  আমাদের চলচ্চিত্রে। স্বাভাবিকভাবেই রুচিশীল দর্শক, ঢাকাই সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যে কারণে আমাদের চলচ্চিত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে।

এটা তো একদিনের কোনো সমস্যা না। অবশ্যই ভাবতে হবে, কোন পরিস্থিতিতে আমরা বাধ্য হচ্ছি, ভারতীয় হিন্দি ছবি আমদানি করতে? একা শাকিব খানের পক্ষে ইন্ডাস্ট্রি ধরে রাখা কি সম্ভব?

গত দশ বছরে, ভয়ংকর ধস নেমেছে আমাদের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে। গত ৫ বছরে বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ সিনেমা হল। ১৪০০ সিনেমা হলের মধ্যে, দেশে এখন হল আছে মাত্র ৪০-৪৫টি। এভাবে তো কোনো ব্যবসা চলতে পারে না। সিনেমা হলের বন্ধস্রোত আটকাতেই, হিন্দি চলচ্চিত্র আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। দর্শক আবার সিনেমা হলমুখী হোক। এ ছাড়া বিকল্প কী আছে, এই মুহূর্তে?

সিনেপ্লেক্স দিয়ে দেশের চলচ্চিত্রের বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করা সম্ভব না। ওখানে কি সব শ্রেণির দর্শক যেতে পারেন? এত উচ্চমূল্যে টিকিট কেনার সামর্থ্য কিন্তু সবার নেই। সেখানে সাধারণ মানুষ কিন্তু ছবি দেখতে পারে না। একটা মিনিমাম ড্রেস কোড রয়েছে সেখানে। কেউ কি লুঙ্গি পরে যেতে পারবেন! ২ জন মানুষ ছবি দেখতে চাইলে, হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে যাবে। সব শ্রেণির মানুষের কি এই সামর্থ্য রয়েছে?

এসব বিষয় ভাবতে হবে। সমাজের বিভিন্ন  শ্রেণির মানুষকে, সিনেমা হলমুখী করতে চাইলে হিন্দি চলচ্চিত্র আমদানির বিকল্প নেই।

এখন মুক্তবাজার অর্থনীতির সময়। আকাশ উন্মুক্ত। মানুষ চাইলেই, বিকল্প মাধ্যমে বিনোদন নিতে পারে। সবার সিনেমা হলে গিয়েই, বিনোদন নিতে হবে বিষয়টা এমন না। তবে সিনেমার প্রতি তাদের আকৃষ্ট করতে, কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, দর্শককে আবার সিনেমা হলমুখী করতে হবে।

সিনেমা হলগুলো বাঁচাতে হবে। সেটা হতে পারে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। দেখা যেতে পারে, ১-২ বছরে কেমন পরিবর্তন আসে। এতে আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। আমাদের মেধা থাকলে, উন্নত রুচি থাকলে এমনিতেই মানুষ হিন্দি ছবি প্রত্যাখ্যান করবে। আর যদি আমরা ব্যর্থ হই, তাহলে তারা সফল হবে। ভারতীয় ছবি আনলে দোষের কিছু দেখি না। বাংলা ছবি তো আসতে পারে তাতে তো কোনো সমস্যা নেই?

একসময় কলকাতার ছবির বিপরীতে, আমরাই অনেক ভালো ছবি নির্মাণ করেছি। সে সময় উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, রাজকাপুর,  দীলিপ কুমার অভিনীত ছবির মধ্যেও কিন্তু আমাদের অনেক ভালো ব্যবসা হয়েছে।

প্রচুর ভালো সিনেমা একসময় নির্মিত হয়েছে। এখন হচ্ছে না কেন? এই ক্রাইসিস কেন তৈরি হলো, বিষয়টি গভীরভাবে ভাবতে হবে। এ মুহূর্তে দর্শকদের যে হলবিমুখতা, হিন্দি ছবির আমদানিতে সেই অচলাবস্থা কাটতে পারে। একই সঙ্গে আমাদেরও আরও গঠনমূলক চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে যেতে হবে।

আমি এ ব্যাপারে আশাবাদী। এর কারণও আছে। যারা ছবি আমদানি করছে, তারা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হলে, ভালো ঢাকাই চলচ্চিত্রও নির্মাণ করবেন। তখন অবশ্যই মানসম্পন্ন, গুণী পরিচালকের কদর বাড়বে। আমরা চলচ্চিত্রের এই হাল চাই না।

মনে রাখতে হবে, এখন কিন্তু ব্রিটিশরাও ছবি নির্মাণ করছে না। তাদের অভিনেতা-অভিনেত্রী পুরোপুরি হলিউডের ওপর নির্ভর  করছে। আমরা কিন্তু কোনোভাবেই আশা করি না, পরবর্তী প্রজন্ম একটা হতাশার মধ্যে পড়–ক। আমি আবারও বলতে চাই, হিন্দি ছবি প্রদর্শিত হলে সিনেমাহলে দর্শকের পদচারণা বাড়বে।

এর ফলে আমাদের সিনেমা হলেরও উন্নয়ন হবে। হলগুলো টিকে থাক। আমাদের সিনেমা যেহেতু একের পর এক ফ্লপ হচ্ছে, এই মুহূর্তে অন্য পথ খোলা নেই। আমি আশাবাদী, কারণ বাঙালি কখনো হারেনি হারবে না। আমরা ঘুরে দাঁড়াবই।

লেখক: প্রযোজক, সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিবেশক সমিতি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত