ঢাকার অদূরে সাভারে কর্তৃপক্ষের অবহেলায় বহুতল ভবন রানা প্লাজাধসের ১০ বছর পূর্ণ হলো গতকাল সোমবার। সেই ট্র্যাজেডির শিকার হয়ে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তাদের স্বজন, আহত ব্যক্তিসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা। গতকাল সকাল থেকেই বিভিন্ন ব্যানারে এবং অনেকে ব্যক্তিগতভাবে রানা প্লাজার সামনের নির্মিত অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় চোখের জলে স্মৃতিচারণা করেন আহত শ্রমিক ও স্বজনরা।
ঘটনার বিচার ও আহতদের পুনর্বাসনের দাবিসহ চার দফা দাবিতে তিন দিন ধরে ঢাকার শহীদ মিনারে অনশন করছেন রানা প্লাজায় আহত কয়েকজন শ্রমিক।
১০ বছর ধরেই পঙ্গুত্ব নিয়ে বাঁচার লড়াই করছেন ভুক্তভোগীদের অনেকেই। অসুস্থতা আর দারিদ্র্য নিয়ে দীর্ঘদিন বসবাস করে এলেও কেউ তাদের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসেনি বলে অভিযোগ শ্রমিকদের। আহত শ্রমিক তাসলিমা বেগম বলেন, ‘মেরুদণ্ড ও পায়ে আঘাত পাওয়ায় আমি কোনো কাজ করতে পারি না। অনেক কষ্টে থাকলেও কেউ আমাদের কোনো খবর নেয়নি। আমরা কারও কাছে ভিক্ষা চাই না। আমাদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হোক।’
ওই ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়েছেন রানা প্লাজার একটি পোশাক কারখানার সুইং অপারেটর নীলুফা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার একটা পা মারাত্মকভাবে আহত। এগারোটা অপারেশন করা লাগছে পায়ে। পা কেটে ফেলার জন্য অনেক জায়গায় গেছি। শেষ একটা অপারেশন আছে, যার জন্য সাত লাখ টাকা লাগবে। অপারেশনের আগে চার লাখ টাকা জমা দেওয়া লাগবে। কিন্তু ওই টাকা আমি কই পাব? আমি ক্ষতিপূরণ পাইছি মাত্র ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা।’ বিনা চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত ১৩ জন মারা গেছেন বলে তিনি দাবি করেন।
আক্ষেপ করে নীলুফার বলেন, ‘আমি সড়কে বসে একটা পান-সিগারেটের দোকান চালাই। এটা দিয়ে ঘরভাড়া, খাওয়া সবই করতে হয়।’
রানা প্লাজাধসে আহত হয়েছিলেন হাওয়া বেগম। প্রতিদিন অসুস্থ শরীর নিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ফুট ওভারব্রিজে বসে ভিক্ষা করেন। ধসে পড়া রানা প্লাজার ৯ তলায় ক্লিনার পদে চাকরি করতেন তিনি।
হাওয়া বেগম বলেন, ‘অনেকেই তো অনেক কিছুই পেয়েছে। কিন্তু আমি তেমন কোনো সহযোগিতা পাইনি। শুধু চাকরির বেতন বাবদ ছয় হাজার টাকা এবং পরে ব্র্যাকের কাছ থেকে এককালীন ৬০ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছিলাম। সেই টাকা দিয়ে আমার নিজস্ব কিছু ঋণ ছিল সেটি পরিশোধ করি আর বাকি টাকা দিয়ে একটি অটোরিকশা কিনে ভাড়া দিয়েছিলাম। কিন্তু সেটিও কিছুদিন বাদে নষ্ট হয়ে যায়, ঠিক করতে অনেক টাকা খরচ হবে, তাই সেটি বিক্রি করে দিয়েছি।’
রানা প্লাজায় আহত শ্রমিকদের সংগঠন রানা প্লাজা সার্ভাইভার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদুল হাসান হৃদয় বলেন, ‘আমার জানা মতে রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক বর্তমানে ভিক্ষা করে তাদের জীবন চালাচ্ছেন।’
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার বলেন, এখনো নিহত শ্রমিক পরিবারের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন এবং রানা প্লাজার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি।’
বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অরবিন্দু বেপারি বলেন, ‘রানা প্লাজার ধসে এত শ্রমিক হতাহতের ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে দোষী ভবন মালিক সোহেল রানা। সম্প্রতি তার জামিন দিয়ে আবার স্থগিত করেছে আদালত। তার জামিনের জন্য নানা জায়গায় তদবির করা হচ্ছে। সরকার ও বিচার বিভাগের কাছে আমরা রানার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘গত ১০ বছরেও আমাদের দাবিগুলো পূরণ হয়নি। চিকিৎসা আর পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘১০ বছর পরে এসেও আমরা একই দাবি জানাচ্ছি। আমরা আশা করি, আগামী বছর আর এসব দাবি নিয়ে আমাদের রাস্তায় দাঁড়াতে হবে না। এর আগেই সবগুলো দাবি পূরণ করা হবে।’
এর আগে ২৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে সাভারের রানা প্লাজার সামনে অস্থায়ী শহীদ বেদিতে মোমবাতি জ্বালিয়ে নিহত শ্রমিকদের স্মরণ করা হয়। এ সময় রানা প্লাজাধসের ঘটনায় নিহত শ্রমিক ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য চার দফা দাবি জানান বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। দাবিগুলো হলো, শ্রমিকের এক জীবনের আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ, রানা প্লাজার জমিটি বাজেয়াপ্ত করে হতাহত শ্রমিকদের স্থায়ী পুনর্বাসন, বিনা মূল্যে আজীবন চিকিৎসা ও রানা প্লাজার মালিকের দ্রুত বিচার।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজাধসে ঘটনাস্থলে ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ১ হাজার ১৩৮ জন শ্রমিক। এ ছাড়া আহত হন সহস্রাধিক শ্রমিক।
রানা প্লাজাধসের ঘটনায় তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে শ্রমিকদের মৃত্যুতে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ এনে মামলা করে পুলিশ। ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণের অভিযোগে অন্য মামলাটি করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। আর ভবন নির্মাণ-সংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে আরেকটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তিনটি মামলার কোনোটিই এখনো শেষ হয়নি। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা আইনে করা মামলা দীর্ঘদিন হাইকোর্টে স্থগিত হয়ে আছে। এটি বর্তমানে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন। ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’র অভিযোগে পুলিশের করা মামলাটি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। আর ভবন নির্মাণ-সংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
