নির্বাচনকালীন নানা প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হয়ে ভোটাররা ভোট দিয়ে বানিয়েছিলেন জনপ্রতিনিধি (ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান)। কিন্তু সেই আস্থা দ্রুতই পরিণত হয় হতাশায়। বিপদে বা প্রয়োজনে দরজায় কড়া নেড়েও সহযোগিতা দূরে থাক, একটু সাড়াও মেলে না সেই জনপ্রতিনিধির। যদিও স্থানীয় সরকার বিধিমালা অনুযায়ী জনসাধারণের নাগরিক সুবিধা দিতে দায়বদ্ধ ইউপি চেয়ারম্যান। কিন্তু দিনের পর দিন ঘুরেও সেবাপ্রত্যাশীরা খুঁজে পান না জনপ্রতিনিধিকে। জনদুর্ভোগের এমন নানা অভিযোগ পাবনা সদর উপজেলার দোগাছি ইউনিয়নে। জনসেবার প্রতিশ্রুতিতে নির্বাচিত হয়েও জনগণের প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানে অনীহা ও অসহযোগিতার অসংখ্য উদাহরণ তৈরি করেছেন ইউনিয়ন পরিষদটির চেয়ারম্যান আলী হাসান।
একাধিক ইউপি সদস্য (মেম্বার) ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাতভর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পদ্মা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনকাজের তদারকিতে ব্যস্ত থাকেন চেয়ারম্যান আলী হাসান। এসব কাজ করে ভোরে ঘুমাতে যান। ওঠেন দুপুরে।
জন্মসনদ থেকে শুরু করে মৃত্যুসনদ, ওয়ারিশান সনদ, প্রত্যয়নপত্র, হোল্ডিং ট্যাক্স ও বিভিন্ন সালিশি বিষয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসেন ইউনিয়ন পরিষদে। কেউ আসেন জন্মসনদ সংশোধনের জটিলতা নিয়ে, কেউবা আসেন মৃত্যুসনদ, ওয়ারিশান সনদ বা প্রত্যয়নপত্রের তাগিদে। এসব ক্ষেত্রে দাপ্তরিক কাজ শেষে নথিতে স্বাক্ষর প্রয়োজন হয় ইউপি চেয়ারম্যানের। কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাসের পর মাস ঘুরলেও দেখা মেলে না চেয়ারম্যান আলী হাসানের।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বাক্ষর হয়তো প্যানেল চেয়ারম্যান দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু জমিজমাসংক্রান্তসহ নানা সালিশি জটিলতার সমাধানে প্রয়োজন হয় চেয়ারম্যানকে। কিন্তু মাসের পর মাস ঘুরেও সাক্ষাৎ মেলে না তার। ফলে সমস্যার সমাধান দূরে থাক চেয়ারম্যানকে সমস্যা জানাতেই পারেন না ইউনিয়নবাসী। ইউনিয়ন পরিষদের নির্দিষ্ট কার্যালয় থাকলেও কখনোই সেখানে অফিস করেন না তিনি। ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বাংলাবাজারে নিজের বাড়ির পাশে গড়েছেন অস্থায়ী কার্যালয়। কিন্তু সেই কার্যালয় দূরে থাক বিপদে পড়ে তার বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লেও চেয়ারম্যান নেই বলে তাড়িয়ে দেওয়া হয় ভুক্তভোগীদের।
এলাকাবাসীর কাছ থেকে এমন বহু অভিযোগ পেয়ে চেয়ারম্যান আলী হাসানের বাংলাবাজারের অস্থায়ী খুঁজে পান না জনতা কার্যালয়ের ওপর নজর রাখেন এই প্রতিবেদক। গত ১৭ এপ্রিল সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বাজারের ব্যাগ হাতে কিশোর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে চেয়ারম্যানের অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে ঘোরাঘুরি করছেন ইউনিয়নের চর আশুতোষপুর গ্রামের বাসিন্দা বৃদ্ধ মোতালেব শেখ। তিনি জানান, জমিজমাসংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে এসেছেন। লেখাপড়া না জানায় স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন।
মোতালেব শেখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক মাস ধরে বাংলাবাজারে ঘুরতেছি। তার (চেয়ারম্যান) অফিসে জিজ্ঞেস করলে বলে চেয়ারম্যান নাই। কয়েক দিন ঘুরে ঘুরে একদিন চেয়ারম্যানের বাড়ি গেলাম। তবুও বলে নাই। এক মাস ধরে যদি তার দেখাই না পাই, তাহলে আমাদের সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে? আমার মতো অনেকেই ঘুরতেছে। কেউই তাকে প্রয়োজনে পায় না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন সেবা গ্রহীতা বলেন, ‘আমার এক আত্মীয় প্রবাসে মারা গেছেন। তার লাশ দেশে আনা ও সরকার ঘোষিত সুবিধা পেতে কাগজে তার (চেয়ারম্যান) স্বাক্ষর প্রয়োজন ছিল। সেই স্বাক্ষর নিতে কয়েক সপ্তাহ লেগেছে।’
ধারাবাহিক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এরপর আরেক দিন বাংলাবাজারে চেয়ারম্যানের অস্থায়ী কার্যালয়ে যান এই প্রতিবেদক। সেখানে দেখা হয় শফিকুল ইসলাম নামে এক যুবকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারের একাধিক সদস্যের জন্মসনদ সংশোধন ও ওয়ারিশান সনদসহ নানা কাজে পরিষদে আসি। অধিকাংশ সময়ই এগুলোতে প্যানেল চেয়ারম্যান স্বাক্ষর দেন। পরিষদ ও চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে তার আজ্ঞাবহ স্থানীয় কয়েকজন অনুসারীও বসেন। সেদিন দেখলাম ওয়ারিশান সনদে তারাই স্বাক্ষর দিয়ে দিলেন। ট্যাক্সও কাটেন বাইরের লোক। নেন ইচ্ছামতো অস্বাভাবিক হারে টাকা। আর চেয়ারম্যানকে তো এর মধ্যে আমি দেখিই নাই।’
শুধু সাধারণ মানুষেরই নয়, চেয়ারম্যান আলী হাসানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেছেন খোদ তার পরিষদের সদস্যরাও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি সদস্য বলেন, ‘প্রায় দুই বছর হতে চলল এই পরিষদ গঠিত হয়েছে। সদস্যদের সঙ্গে মাসিক ও সাধারণ সভায় উন্নয়নমূলক কাজ এবং আয়-ব্যয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। কিন্তু এযাবৎ একটি-দুটি বিশেষ বা জরুরি সভা ছাড়া কোনো সভা চেয়ারম্যান করেন নাই। পরিষদ কীভাবে চলছে? কী হচ্ছে? তা সুনির্দিষ্টভাবে আমরা কিছুই বলতে পারব না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ইউপি সদস্য বলেন, ‘স্থানীয় সামাজিক সমস্যায় প্রয়োজনে কোনো পরামর্শ বা সহযোগিতাই আমরা চেয়ারম্যানের থেকে পাই না। রাতভর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন তদারকি করেন তিনি। কোটি কোটি টাকার বালু লুট সিন্ডিকেটের মূল হোতা তিনি। এসব কাজ করে উনি ঘুম থেকেই ওঠেন দুপুরে। জরুরি প্রয়োজনে তাকে পাওয়া দুষ্কর। এতে ইউনিয়নবাসী ন্যূনতম সেবা থেকেও বঞ্চিত। আমরা বারবার বলেও এর কোনো সুরাহা করতে পারিনি।’
চেয়ারম্যানের দায়িত্বে অবহেলায় ক্ষুব্ধ দোগাছি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘চেয়ারম্যান আলী হাসান তার নিজ এলাকা বাংলাবাজার ছাড়া দোগাছি, চর আশুতোষপুর, চর সদিরাজপুর, মন্ডলপাড়াসহ ইউনিয়নের অন্যান্য এলাকার গ্রামগুলোতে আসেন না। সামাজিকতাও রক্ষা করেন না। দলের কিছু বড় নেতার প্রশ্রয় থাকায় তিনি আওয়ামী লীগের নামেই সব অপকর্ম করছেন। উনি সাধারণ মানুষের সংস্পর্শেই নেই। রাজনীতি ও দলের জন্য এগুলো ভালো নয়।’
চেয়ারম্যানের পরিষদে না আসার কারণ জানতে চাইলে দোগাছি ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো. মহিদুজ্জামান মমিন বলেন, ‘অসুস্থতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে চেয়ারম্যান সাহেব পরিষদে আসতে পারেন না। কিন্তু প্যানেল চেয়ারম্যানের মাধ্যমে আমরা সেবা প্রত্যাশীদের সমস্যার সমাধান করে দিই। ভোগান্তির অভিযোগ সঠিক নয়। সালিশ ও পরিষদের সভা চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতেই হয়। আমরা দিন-তারিখ নির্ধারণ করে চেয়ারম্যান সাহেবকে জানালে তিনি সভায় অংশ নেন।’
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে চেয়ারম্যান আলী হাসানের মোবাইল ফোনে বিভিন্ন সময়ে কল করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
