১৪ মে তুরস্কে রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে এরদোয়ানের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) না-ও জিততে পারে। ২০ বছর তারা যেভাবে তুরস্ক শাসন করছে, দেশজুড়ে তার গভীর ছাপ পড়েছে ঐতিহ্যগত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ইসলামের প্রসার ঘটেছে এবং বিদেশে তুরস্কের প্রভাব বেড়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক নীতি এবং ফেব্রুয়ারির ভয়াবহ ভূমিকম্প সরকারের ওপর জন-আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। অনেক ভোটার প্রশাসনের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যা ছিল একেপির অন্যতম প্রশস্তির বিষয়।
এরদোয়ান ক্ষমতায় থাকবেন না এটা তার দুই দশক ধরে ক্ষমতায় থাকার পরে আজ তা ভাবা সহজ নয়। তবে বিভিন্ন জরিপ ইঙ্গিত দেয়, একেপির পরাজয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও জনশ্রুতি আছে, ক্ষমতায় থাকতে তিনি যা যা করার করবেন। হয় অল্প ব্যবধানে জিতবেন, বা ফলাফল চ্যালেঞ্জ করতে ক্ষমতার সুবিধা ব্যবহার করবেন। এরদোয়ান পরম সৌহার্দ্যে পরাজয় মেনে নিচ্ছেন তা কল্পনা করা মুশকিল। এমন হলে তা হবে নজিরবিহীন। তুরস্কের কোনো রাষ্ট্রপতি কখনো সরাসরি পদত্যাগ করেননি।
এরদোয়ান শুধু সংসদের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রথম রাষ্ট্রপতি নন, বরং দেশকে সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতিতে রূপান্তরেরও উদ্ভাবক। তার পূর্বসূরি ১১ জনের অনেকের ক্ষমতায় আগমন ও প্রস্থান হয়েছে গণরায় ছাড়াই। গণরাজনীতির সমর্থনসহ মাত্র কয়েকজন সামরিক বাহিনী কর্র্তৃক অপসারণ বা অপ্রত্যাশিত মৃত্যু ছাড়া ক্ষমতায় আসীন ছিলেন।
তুরস্কের স্থপতি প্রথম রাষ্ট্রপতি কামাল আতাতুর্ক মাত্র ৫৭ বছর বয়সে ক্ষমতায় থাকতে মারা যান। উত্তরসূরি হন ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন ইসমেত ইনোনু। ১৯৫০ সালে তুরস্কের প্রথম তুলনামূলক অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে ইনোনুর রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি) হেরে যায় ডেমোক্র্যাট পার্টি নামের একটি বিচ্ছিন্ন উপদলের কাছে। দিনটি ছিল ১৪ মে। তুরস্কের আসন্ন নির্বাচনের তারিখ ধার্য করার পেছনে তাই ভিন্ন অর্থ আছে।
১৯৬০ সালে ডেমোক্র্যাট রাষ্ট্রপতি জেলাল বায়ারকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া হয়। কারাগারের বাইরে থাকা ডেমোক্র্যাটরা সুলেমান দেমিরেলের নেতৃত্বে ‘জাস্টিস পার্টি’ গঠন করেন। পরবর্তী তিন দশক রাষ্ট্রপতি পদ ছিল সেনা নিয়ন্ত্রণে। রাষ্ট্রপতি জেমাল গুরসেল, জেভদেত সুনাই ও ফাহরি কোরুতুর্ক তিনজনই জেনারেল বা অ্যাডমিরাল। ১৯৮২ সালে নতুন অভ্যুত্থান ও সংবিধান জেনারেল কেনান এভরেনকে সপ্তম রাষ্ট্রপতি করে। তার অবসরের মধ্য দিয়ে ১৯৮৯ সালে দেমিরেলের দীর্ঘদিনের বন্ধু তুরগুত ওজাল তুরস্কের প্রথম বেসামরিক রাষ্ট্রপতি হন।
ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদীরা সেজারের নেতৃত্বে আর ইসলামপন্থি ও কুর্দিরা এরদোয়ানের অধীনে। এরদোয়ান তখন ইস্তাম্বুলের মেয়র এবং ইসলামিস্ট ওয়েলফেয়ার পার্টির সদস্য। তিনি যেহেতু গতানুগতিক রাজনৈতিক ধারার বাইরের মানুষ, ওদিকে অভিজাত রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতি ও ভূমিকম্পের (১৯৯৯ সালের) কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত ফলে ভোটারদের আস্থা এরদোয়ানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ২০০২ সালের সংসদ নির্বাচনে এরদোয়ান এবং তার নবগঠিত একেপি ব্যাপক জনসমর্থন পায়। তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষিক্ত হন তখন সংসদে একেপি আর পুনর্গঠিত সিএইচপির বাইরে কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। যারা সেজারকে ক্ষমতায় এনেছিলেন, সেই ইসেভিত, দেমিরেল ও ওজাল সবাই হাওয়া।
মেয়াদ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সেজার এরদোয়ানকে ভালোই ভুগিয়েছেন। ২০০৭ সালে আবদুল্লাহ গুল রাষ্ট্রপতি হলে সচিবালয় ও বিচার বিভাগ একেপির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ২০১৪ সালে তুরস্কের প্রথমবারের মতো সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এরদোয়ান নিজেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং গুল সরে দাঁড়ান। ২০১৭ সালে এরদোয়ান গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেন এবং প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের বদলে দেশকে রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থায় নিয়ে আসেন।
ক্ষমতা ও প্রভাবের বিবেচনায় এরদোয়ানের সঙ্গে তুলনীয় একমাত্র রাষ্ট্রপতি হলেন ইনোনু; যিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু পঞ্চাশের নির্বাচনে জিতে ডেমোক্র্যাটরা ইনোনুকে কম জ্বালায়নি। সিএইচপির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, ইনোনুর এক ছেলেকে যানবাহন ভাঙার দায়ে বিচার করা, ইনোনুর সমাবেশে আক্রমণ করতেও সমর্থকদের সংগঠিত করা, এমনকি অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর আগমুহূর্তে সিএইচপি-কে নিষিদ্ধ করারও প্রস্তুতি নিচ্ছিল তারা।
ক্ষমতা হারালে তিনি বা তার পরিবার বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন। তার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগও তিনি হালকভাবে নেন না এ-জাতীয় বক্তব্যের জন্য বিরোধী নেতাদের জরিমানা এবং বিচার করা হয়েছে।
তুরস্কের রাজনীতিতে এরদোয়ান প্রথম ব্যক্তি, যিনি এতটা ক্ষমতা অর্জন করেছেন। পেরেছেন তার দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি এবং কল্পনাশক্তির কারণে। প্রশ্ন হলো, সেই ক্ষমতা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করায়ও প্রথম হবেন, এমন কল্পনা তিনি করতে পারেন কি না।
লেখক : স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর তুর্কি স্টাডিজের গবেষক
টুইটার: @silvermanreuben
ফরেন পলিসি ডটকম থেকে ভাষান্তর
মনযূরুল হক
