বাংলাদেশি আরাফাতের কাউন্টি রোমাঞ্চ

আপডেট : ২১ মে ২০২৩, ১২:০৩ এএম

গুড লেন্থ থেকে একের পর এক বাউন্সার। কখনো ব্যাটসম্যানের মাথা উচ্চতা বরাবর আবার কখনো পঞ্চম স্ট্যাম্পে বাইরের বল খেলার প্রলোভন দিয়ে। পিচে সজোরে হিট করা মানে বাউন্স পাওয়া সহজ। ইংলিশ কন্ডিশনে বল করার এটাই মূল অস্ত্র। তখন যে বাউন্সার উঠবে তা ব্যাটারের পক্ষে খেলা কঠিন, তা ডিফেন্ড না করে মারতে গেলেই হয় আউটফিল্ডে ক্যাচ নয়তো উইকেটের পেছনে। বোলার হিসেবে ইংলিশ কন্ডিশনে বল করার এই কৌশলটা পুরোপুরি জানা হয়ে গেছে এক বাংলাদেশির আরাফাত ভুঁইয়ার। ভাবছেন ইনি আবার কে! দেশের ক্রিকেটে তো তার নাম শোনা যায়নি কখনই।

শোনার কথাও না। কারণ ২৬ বছর বয়সী আরাফাত আজীবন ক্রিকেটটা খেলেছেন ইংল্যান্ডেই। দেশটির বিভিন্ন কাউন্টির দ্বিতীয় একাদশের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে গত বুধবার প্রথমবারের মতো পেশাদার কাউন্টি চুক্তি করেছেন কেন্টের সঙ্গে। আর অভিষেকেই সারের প্রথম ইনিংসে ২০ ওভারে ৬৫ রানে ৪ উইকেট নিয়ে বাজিমাত করলেন। এ সুবাদে বার্মিংহামে অবস্থিত সাউথ এশিয়ান ক্রিকেট অ্যাকাডেমির (সাকা) সপ্তম ক্রিকেটার হিসেবে এ সম্মান আরাফাতের।

আরাফাতকে অভিষেক সুযোগ এনে দিয়েছে গত মাসে হ্যাম্পশায়ারের বিপক্ষে তার ৮১ রানে ৪ উইকেট নিয়ে বোলিং। কেন্ট দ্বিতীয় একাদশের হয়েই ওই পারফরম করেছিলেন এ পেসার। তার ক্যারিয়ার জুড়েই এমনটা কেটেছে। কেন্ট প্রিমিয়ার লিগে ব্ল্যাকহিথ ক্লাবের হয়ে খেলেছেন আরাফাত। এটা তার মূল ক্লাব। এরপর সারে, এসেক্স ও ডার্বিশায়ারের দ্বিতীয় একাদশের হয়ে গত ছয় বছর অপেশাদার চুক্তিভিত্তিক খেলে গেছেন। এখন অবশ্য ব্যাকহিথকেও ঠিকঠাক সময়টা দিতে পারবেন না। কেন্টের প্রসঙ্গে আরাফাত বলছিলেন, ‘কেন্টের সঙ্গে পেশাদার চুক্তি করে আমি যেন চাঁদ হাতে পেয়েছি। পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার পথে আমার সব পরিশ্রম ফল দিয়েছে। আমি কেন্ট ও কেন্ট দ্বিতীয় একাদশের কোচ মার্ক ডেকেরকে ধন্যবাদ দিতে চাই। একাদশে ‍সুযোগ পেলে অবশ্যই আমি ভালো করব।’

অভিষেকেই আরাফাত সফল তা স্কোর-ই বলে দিচ্ছে। অবশ্য ম্যাচের প্রথম দিন কেন্টের প্রথমে ব্যাটিংয়ে যাওয়ায় শুরুতেই বল হাতে নামতে হয়নি আরাফাতকে। কাউন্টি ক্রিকেটের আসল আমেজ গায়ে মাখার সময় পেয়েছেন। ওই একদিনেই নিজের নার্ভাসনেস কাটিয়ে উঠেছেন। আর সেই প্রমাণ মিলল ক্রিজে। ইনিংসের ৩৪তম ওভারে ইংল্যান্ডের ভাইস ক্যাপ্টেন ওলি পোপকে কাউন্টিতে নিজের প্রথম শিকার বানান। সারেতে ৯৭ গড়ে রান তোলা এই ব্যাটার ডাউন দ্য উইকেটে এসে স্ট্যাম্পে থাকা বলটি মারতে চাইলেন মিড উইকেটের ওপর দিয়ে। কিন্তু মিসটাইমে তা মিড উইকেটে ক্যাচে পরিণত হলো। পরের দুটি উইকেট ঠিক যেন কার্বন কপি। জেমি স্মিথ ও ইংল্যান্ড জাতীয় দলের উইকেটরক্ষক বেন ফোকস দুজনই আরাফাতের পঞ্চম স্ট্যাম্পের বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে দ্বিতীয় সিøপে হলেন ক্যাচ আউট। আর ইংলিশ জাতীয় দলের অপর ক্রিকেটার ওপেনার উইল জ্যাকস আরাফাতের বাউন্সি বলটা মিডঅনের ওপর দিয়ে মারতে গিয়ে মিডঅফে ক্যাচ হয়ে ফিরেছেন।

স্নায়ু চাপ সামলে অভিষেকে চার উইকেট নেওয়া আরাফাত বলছিলেন, ‘প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারের প্রথম ইনিংসে চারটি উইকেট নেওয়া আকাশ হাতে পাওয়ার মতো। আমি ম্যাচের প্রথম দিনটা একটু নার্ভাস ছিলাম। কিন্তু দ্বিতীয় দিন নেটে কিছুক্ষণ বল করতে পেরেছি ইনিংস শুরুতে। এটা আমার স্নায়ু চাপ সামলাতে অনেকটা সাহায্য করেছে।’

ঢাকায় জন্ম নেওয়া আরাফাত ১৯৯৬ সালে ১৪ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। ইস্ট লন্ডনে থিতু হয়েছিল তার পরিবার। এই সময়ে ইংল্যান্ডের রেসিডেন্সি পেয়ে গেছেন তারা। এদিক থেকে ইংল্যান্ডের কাউন্টিতে খেলতে তার বাধা নেই। ইংল্যান্ডের চেমসফোর্ড থেকে আরাফাতদের বাড়ি বেশি দূরে নয়। এ মাসে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশ যেখানে তিন ম্যাচের সিরিজ খেলেছে সেই চেমসফোর্ড। আরাফাত চেয়েছিলেন খেলা দেখতে যাবেন। কিন্তু ওস্টারশায়ার দ্বিতীয় একাদশের হয়ে ওয়ারউইকশায়ারের বিপক্ষে ম্যাচ থাকায় পারেননি।

আরাফাতের শুরুটা হয়েছিল সাকাতে। ইংল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত পেসার কবির আলি কোচ টম ব্রাউনের সঙ্গে ইংল্যান্ডে থাকা দক্ষিণ এশিয়ান ক্রিকেটারদের জন্য কিছু করার চেষ্টায় সাকা প্রতিষ্ঠিত করেন। সেখানে শীতের সময় অনুশীলনের ব্যবস্থা করা হয়। এই ক্রিকেটারদের অনুশীলন দেখতে বিভিন্ন কাউন্টির হেড কোচরা আসেন। কোনো ক্রিকেটার পছন্দ হলে তাকে টেনে নেন নিজেদের নেট বোলিংয়েÑ এরপর ধীরে দ্বিতীয় একাদশ ও ওই কাউন্টির লিগে। সেখান থেকে ভালো পারফরম করাদের কাউন্টিতে পেশাদার চুক্তি মেলে।

ঠিক এভাবেই সাসেক্সের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েছেন অপর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ক্রিকেটার রবিন দাশ। ইতিমধ্যে ইংল্যান্ড জাতীয় দলে নাম লিখিয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এক ম্যাচে দ্বাদশ ফিল্ডার ছিলেন রবিন। সাকা অ্যাকাডেমি থেকে মোট সাত ক্রিকেটার বিভিন্ন কাউন্টিতে খেলেছেন। পর্যায়ক্রমে ইংল্যান্ড জাতীয় দলেও। পেসার আজমল শেহজাদ তাদের একজন। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এই পেসার আরাফাতকে অভিষেকের প্রথম দিনই সাধুবাদ জানিয়েছেন। যেন তার মতো আরাফাতও একদিন ইংল্যান্ড জাতীয় দলের পথ খুঁজে পান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত