চলমান বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যে দেশের বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীল খাতকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে একটি শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট প্রণয়নে সরকার আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী। আগামী অর্থবছরে কেমন বাজেট প্রয়োজন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বৈশ্বিক মন্দায় টিকে থাকতে হলে এদেশের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে দেশি বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে না। তাই সবকিছুর ওপরে আগামী অর্থবছরে স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়াতে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য নীতিসহায়তা খুব জরুরি।
ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, এদেশে রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প। এ খাতে উৎসে করের হার কমিয়ে ৫ থেকে ১০ বছর রাখতে হবে। এছাড়া নগদ প্রণোদনা, যন্ত্রপাতি আমদানি, কারখানা নির্মাণের, বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের যন্ত্রপাতিতে রাজস্ব ছাড় এখন সময়ের দাবি। শিল্পের অন্যান্য খাতেও সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করে ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, কোন খাতের কী সুবিধা তা খতিয়ে দেখে তালিকা করে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে সমগ্র অর্থনীতি সুষমভাবে গতিশীল হবে।
শিল্পে প্রয়োজনমতো জ্বালানি সরবরাহ করতে পদক্ষেপ নিতে হবে এমন মন্তব্য করে সালাম মুর্শেদী বলেন, শুধু সরকারের ওপর দায় না চাপিয়ে বেসরকারি খাতকেও জ্বালানি সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখতে হবে। এক্ষেত্রেও সরকারকে নীতিসহায়তা দিতে হবে। বিশেষভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা দিতে হবে।
আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে এমন প্রশ্নের উত্তরে ব্যবসা খাতের এ নেতা বলেন, ভালোমন্দ সব জায়গায় আছে তাই সংস্কার প্রস্তাবের যা এদেশের অর্থনীতির জন্য ভালো তা গ্রহণ করা যায়। তবে কোনো কিছু রাতারাতি চাপিয়ে দিয়ে নয়। সহনীয়ভাবে তা করতে হবে।
অর্থপাচার কমাতে আপনার প্রস্তাব কী, জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, অর্থপাচারের ফলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থ বিদেশে চলে গেলে সরকারের ক্ষতি, সাধারণ মানুষের ক্ষতি। ব্যক্তি পর্যায়ে, সামষ্টিকভাবে অর্থ সংকট বাড়ে। তাই অর্থপাচার বন্ধ করতে হবে। এজন্য কঠোর আইনি প্রয়োগ প্রয়োজন। তবে মনে রাখতে হবে পাচারকারীর একার পক্ষে অর্থপাচার করা সম্ভব না। অনেকে মিলে পাচার করে। সবাইকে সমানভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। আগামী বাজেটে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেন ব্যবসায়ী এ নেতা।
জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এমন মত জানিয়ে সালাম মুর্শেদী বলেন, গত এক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি গড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশের ঘরে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে করমুক্ত আয়ের সীমা তিন লাখ টাকা থেকে আরও দুই লাখ টাকা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, রাজস্ব জালের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। কিছু মানুষের ওপর চাপ বাড়িয়ে আদায় বাড়ানো যাবে না। এজন্য এনবিআরকে সব কাজে অটোমেশনের ব্যবহার বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে প্রযুক্তির ব্যবহারে দুর্নীতি কমবে। করদাতাদের হয়রানি কমবে।
করপোরেট করহার কমানোর প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করপোরেট করহার বেশি। এতে ব্যবসায়ের খরচ বাড়ছে। বৈশি^ক মন্দার মধ্যে যা ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি চাপ। ব্যবসায়ীদের এ খরচ কমানো হলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিনিয়োগ বাড়বে।
কোম্পানির ক্ষেত্রে অর্জিত ব্যাংক সুদ আয়ের ওপর উৎসে কর কমানোর পরামর্শ দিয়ে সালাম মুর্শেদী বলেন, এ হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে আনা প্রয়োজন। না হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্যাংকে সঞ্চয়ে নিরুৎসাহিত হবে। বিদ্যমান ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট দূর করতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আগামী অর্থবছরের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ এমন মত জানিয়ে সালাম মুর্শেদী বলেন, আগামী বাজেটে মানুষের ভোগান্তি কমাতে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজার তো আর আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তাই দেশের মধ্যে যতটা পারা যায় পদক্ষেপ নিতে হবে।
