ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর শ্রীলঙ্কা, ভারত, ভিয়েতনামের মতো দেশও মূল্যস্ফীতি কমাতে সক্ষম হয়েছে, তবে সুশাসনের অভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না বাংলাদেশ। মূল্যস্ফীতির জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কারণ হিসেবে ব্যবহার করা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হলেও তা সঠিক চিত্র নয়। কর আহরণের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত এনবিআর এখন পুলিশ ডিপার্টমেন্টের মতো হয়ে গেছে আমাকে পয়সা দাও, সেবা বুঝিয়ে দেব।
গতকাল শনিবার ঢাকার মতিঝিলে এমসিসিআইয়ের নিজস্ব কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ ফ্রম ভালনারিবিলিটি টু রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড র্যাপিড ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক আলোচনায় এ কথা বলেন বিশ^ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদ। অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান প্রধান অতিথি ছিলেন।
সাদিক আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের সামনে এ মুহূর্তে চারটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় অনেক দুর্বলতা রয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ ২০২২-২৩ অর্থবছরেও ছিল, এবারের বাজেটেও আছে। আগের বাজেটের চ্যালেঞ্জটি বাংলাদেশ কোনোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
তিনি বলেন, যেসব বড় দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল সেসব দেশ সফলভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গত জুন মাসের তুলনায় এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি কমানো হয়েছে ৪৬ শতাংশ। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ২০২২ সালের এপ্রিলে যেখানে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২৩ সালের এপ্রিলে এসে তাদের মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তার মতে, দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা। ২০২৩ সালে রাজস্ব আয় জিডিপির তুলনায় ৭ শতাংশের মধ্যে ছিল। তিনি এনবিআরকে ভিখারির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, এখন এ প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছে ভিখারির মতো দানখয়রাতনির্ভর। গত ছয় অর্থবছর ধরে এনবিআরের আয় গড়ে ১০ শতাংশ করে বেড়েছে, নতুন করে ৩৭ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা হাস্যকর। এর ফলে রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়বে।
তিনি তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন বাজেট ঘাটতির অর্থায়ন কীভাবে করা হবে তার কথা। বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশের নিচে রাখা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারকে অবশ্যই ব্যাংকঋণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকারের সামনে বিকল্প হিসেবে দুটো পথ আছে, একটি স্বল্পসুদের বৈদেশিক ঋণ আরেকটি বাজারভিত্তিক অভ্যন্তরীণ ঋণ।
চতুর্থ চ্যালেঞ্জ হিসেবে সাদিক আহমেদ উল্লেখ করেন, সামাজিক খাতে অর্থায়নকে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ। এতে রাজস্ব সুরক্ষা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, নতুন বাজেট নিয়ে আমারও কিছু দ্বিমত ছিল কিন্তু জাতীয় স্বার্থে আমরা ঐকমত্যে পৌঁছেছি। গত সাড়ে ১৪ বছরের মধ্যে ১৩ বছরই আমরা দারুণ সময় পার করেছি। কিন্তু কভিড ও যুদ্ধ আমাদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক কিছু বিধিনিষেধে পড়েছি আমরা। কিছু নীরব স্যাংশনেও আছি। জি-৭ও এক ধরনের সিন্ডিকেট। তারাও এসব ক্ষেত্রে অনেক সিদ্ধান্ত নেয়।
বাজেট প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এবারের বাজেটে গ্রামীণ এলাকার বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। সব দিক থেকেই গ্রামের মানুষের ভালো হয়েছে। বাজেটে প্রথমবারের মতো ইমপোর্ট সাবস্টিটিউশন আছে। কর আদায়ের জন্য এটি ভালো আইডিয়া। তবে দ্বিমত পোষণ করে তিনি বলেন, কর এজেন্টে আমার দ্বিমত আছে। এটিকে সারা দেশে একবারে না বাস্তবায়ন করে পরীক্ষামূলকভাবে বিভাগীয় পর্যায়ে চালু করা যেতে পারে। এবারের বাজেটে ভর্তুকি থেকে সরে আসার ঘোষণা প্রচ্ছন্নভাবে আছে।
মেট্রোপলিটান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) পরিচালক আদিব এইচ খান বলেন, ‘এত দিন বিদেশি ঋণের সুদের ওপর ব্যবসায়ীরা কর অব্যাহতি পেলেও এবার তা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। এতে ব্যবসায়ীদের খরচ আরও বাড়বে।’
তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সাল থেকে অব্যাহতি পাওয়া বিদেশি ঋণের সুদের ওপর কর যোগ হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এটা পাস হলে বিদেশি ঋণ পরিশোধের সময়ে সুদের বিপরীতে কর দিতে হবে ব্যবসায়ীদের। বিদেশি ঋণদাতারা সুদের ওপর যে কর ধার্য হবে, তা দেবেন না। সুদ কর ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়িয়ে দেবে।’
এই সুদ হার কত হবে, সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘২০-৩০ শতাংশ হতে পারে। সরকার এখনো তা পরিষ্কার করেনি। নন-রেসিডেন্সিয়ালদের সুদ পরিশোধের ক্ষেত্রে যে হারে কর দেওয়ার বিধান, তা এখানেও প্রযোজ্য হতে পারে।’
সরকার এমন সময়ে বিদেশি ঋণের সুদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব করেছে, যখন বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদায় রয়েছে অর্থনীতি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের বিদেশি ঋণ ছিল ৭ হাজার ১৯৩ কোটি ৬৪ লাখ কোটি ডলার। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ২১১ কোটি ২৯ লাখ ডলার, আর দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৬ হাজার ৯৮২ কোটি ৩৪ লাখ ডলার।
বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৪৩০ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ১ হাজার ৬৪১ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা মোট ঋণের ৬৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। বেসরকারি খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৭৮৯ কোটি ২৪ লাখ ডলার, যা বেসরকারি খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিদেশি ঋণের দায় গত ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৬২৪ কোটি ৫৯ লাখ ডলারে। বেসরকারি খাতে সর্বোচ্চ ঋণ গ্রহীতা খাত হচ্ছে জ্বালানি খাত। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতের বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬৫৪ কোটি ৫২ লাখ ডলার। এরপরই উৎপাদন খাতে ২০৯ কোটি ৩৩ লাখ ডলার, ট্রেডিংয়ে ১৩৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার, ব্যাংকিংয়ে ১৩০ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণের উৎসে শীর্ষ দেশ চীন। সেখানে থেকে এসেছে ২৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এ ছাড়া হংকং থেকে ১০৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার, যুক্তরাজ্য থেকে ৮৫ কোটি ২১ লাখ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৬৯ দশমিক ৯১ কোটি, নেদারল্যান্ডস থেকে ৬৪ কোটি ৭৭ লাখ, সিঙ্গাপুর থেকে ৬৪ কোটি ৫৬ লাখ এবং জার্মানি থেকে ৩৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার এসেছে।
আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৭ শতাংশ বেড়ে গত ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩৪৩ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। এর মধ্যে ১৯ দশমিক ২ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নিট বিনিয়োগ ছিল ৬৬ কোটি ১১ লাখ ডলার। এরপরই ছিল ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়ে চীনের ৪৬ কোটি ৫১ লাখ ডলার। ১১ দশমিক ২ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগ ছিল ৩৮ কোটি ৩৯ লাখ ডলার।
