লোহার পাত কাঁধে করে সাগরের কর্দমাক্ত মাটি পেরিয়ে ইয়ার্ডের ভেতরে নিয়ে আসত ১০-১২ জনের শ্রমিক দল। আর সেই সঙ্গে শ্রমিকদের হাঁকডাকে পুরো এলাকায় রব রব আওয়াজ উঠত। আর এখন নেই কোলাহল। শত শত শ্রমিকের উপস্থিতিও নেই। বার্জের ওপর দাঁড়িয়ে সাগরের উপকূলে থাকা জাহাজ কাটছে শ্রমিকরা। সেখান থেকে লং বোমে (বড় ক্র্যান) করে তা নিয়ে আসা হচ্ছে ইয়ার্ডের ভেতরের নির্ধারিত স্থানে। এই হলো প্রযুক্তির সহায়তায় ইয়ার্ডের রূপান্তরের একটি চিত্র।
আগে পুরো ইয়ার্ড ছিল মাটির। এখন জাহাজ ভেড়ানোর আদলে গড়ে তোলা হয়েছে দীর্ঘ জেটি। সাগরের অনেক ভেতর পর্যন্ত জেটি চলে গেছে। মাটি থেকে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু সেই জেটির কাছে এসেই ভিড়ছে জাহাজ। জেটিটি সাগরের দিক থেকে উপকূলের দিকে ঢালু। আধুনিক এসব শিপ দেখতে গত বুধবার সীতাকু-ের কুমিরা ফেরিঘাটের কাছে কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে যাওয়া হয়। নিজের ইয়ার্ড দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসলিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাটির প্রায় ৫০ ফুট নিচ থেকে জেটির দেয়াল উঠানো হয়েছে। খুবই মজবুত করে পুরো ইয়ার্ডটি তৈরি হয়েছে। পুরো ইয়ার্ড আরসিসি ঢালাই রয়েছে। জাহাজ কাটার কোনো অংশ নিচে পড়লে কোথাও হারানোর সুুযোগ নেই।
কিন্তু ইয়ার্ডটি সাগরের দিকে ঢালু না করে স্থলভাগের দিকে ঢালু করা হয়েছে কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, জাহাজ কাটার সময় তেলসহ বিভিন্ন দূষিত পদার্থ ইয়ার্ডে পড়তে পারে। এসব পানি ইয়ার্ডের একপ্রান্তে গিয়ে মিলিত হবে। সেখানে সেপারেটর রয়েছে। তেলের পানিগুলো পরিশোধন করে ভালো পানি সাগরের দিকে চলে যাবে ড্রেন দিয়ে আর তেল চলে যাবে নির্ধারিত পয়েন্টে।’
তিনি আরও বলেন, একসময় জাহাজের বিভিন্ন ছোটখাটো টুকরো মাটি থেকে খুঁজে খুঁজে নিতে হতো। কিন্তু এখন গ্রিন ইয়ার্ডগুলো পাকা করায় ম্যাগনেট মেশিন দিয়ে সহজে লোহার টুকরোগুলোকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। এতে শ্রমিকের ব্যবহারও কমে গেছে। এত বড় ইয়ার্ড মাত্র ৩০০ শ্রমিক দিয়েই পরিচালন সম্ভব হচ্ছে।
শুধু ইকুইপমেন্টের ব্যবহার নয়, একসময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে অনেক শ্রমিক মারা যেত। কিন্তু যেসব ইয়ার্ড গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর হয়েছে সেগুলোতে দুর্ঘটনার হার শূন্য। কোনো শ্রমিক-মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। দেশে আধুনিক শিপইয়ার্ডের পথপ্রদর্শক হলো বিশিষ্ট শিল্পগ্রুপ পিএইচপি। তাদের মালিকানাধীন শিপইয়ার্ড ২০১৭ সালের মাঝামাঝিতে ইতালি থেকে আন্তর্জাতিক গ্রিন সার্টিফিকেট পায়। ইতালিভিত্তিক আন্তর্জাতিক ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি (রিনা) নিরাপদ ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশে জাহাজ কাটার জন্য এই সার্টিফিকেট দেয়। হংকং কনভেনশন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রথম সুরক্ষামূলক শিপইয়ার্ডও এটি। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে শিপইয়ার্ড জগতে সর্বোচ্চ সনদ হিসেবে বিবেচিত জাপানি স্বীকৃতিও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পিএইচপির পথ ধরে গ্রিন শিপইয়ার্ডের স্বীকৃতি পেয়েছে কবির স্টিল ও এম এন করপোরেশনও। স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে কে আর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডও। এছাড়া আরও প্রায় সাতটি ইয়ার্ড গ্রিন ইয়ার্ডের উপযোগী হয়েছে বলে শিপব্রেকিং শিল্পের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা জানান। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার উপপরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের আইনে গ্রিন শিপইয়ার্ড বলে কিছু নেই। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী লাল তালিকাভুক্ত এই শিল্পের জন্য কিছু গাইডলাইন দেওয়া রয়েছে। এই গাইডলাইনগুলো যেসব ইয়ার্ড মেনে চলবে আমরা সেগুলোর নবায়ন অনুমোদন করি। এ হিসেবে বর্তমানে সক্রিয় প্রায় ৩০টির মতো শিপইয়ার্ড পরিবেশ অধিদপ্তরের আইন ও দিকনির্দেশনা মেনে জাহাজ কাটার কাজ করছে।’
তাহলে গ্রিন শিপইয়ার্ড কী? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা হলো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশনের আলোকে কিছু গাইডলাইন। যেসব প্রতিষ্ঠান এসব গাইডলাইন অনুসরণ করবে তাদের আন্তর্জাতিকভাবে গ্রিন শিপইয়ার্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে তিনটি ইয়ার্ড এই স্বীকৃতি পেয়েছে এবং আরও প্রায় সাতটি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান শিপ ইয়ার্ডগুলো খুবই আধুনিক। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা উপকরণ ও সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে পরিকল্পিতভাবে জাহাজ কাটা হয়। এজন্য দুর্ঘটনাও কমে এসেছে।
এদিকে নিরাপত্তা প্রসঙ্গে গ্রিন শিপইয়ার্ডগুলো ঘুরে এবং শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি জাহাজ কাটিংয়ের আগে সেই জাহাজের কোথায় কী রয়েছে এবং কীভাবে কাটতে হবে, কোনটার পর কোনটা কাটা লাগবেÑ সেসব বিষয়ে প্রতিদিন ইয়ার্ডের প্রশিক্ষণ রুমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেই জাহাজের আদলে জাহাজ এঁকে তা শ্রমিকদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
একসময় ইয়ার্ডগুলোতে শ্রমিকরা কাঁধে করে অক্সিজেন সিলিন্ডার বহন করে নিয়ে যেত। এখন পুরো প্ল্যান্টে তরল অক্সিজেন প্ল্যান্ট বসানো রয়েছে। সেই প্ল্যান্ট থেকে পুরো ইয়ার্ডে পাইপের মাধ্যমে অসংখ্য পয়েন্ট করে রাখা হয়েছে। আর ঢাকনাযুক্ত ট্রেতে রাখা হয়েছে এলপিজি গ্যাস। এই দুই গ্যাসের মিশ্রণে কাটা হয় জাহাজ। তারপরও যদি অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে তাহলে পুরো প্ল্যান্টে কিছুদূর পর পর রয়েছে ফায়ার হাইড্রেন্ট (আগুন নেভানোর জন্য পানির পাইপ)। এই পাইপে সার্বক্ষণিক পানি রয়েছে। আগুন লাগলে ফায়ার হাইড্রেন্ট থেকে পানি নিয়ে অগ্নিনির্বাপণ করা যাবে। পুরো প্ল্যান্টটি দেখতে পরিকল্পনার ছাপ স্পস্ট। ইয়ার্ডের ভেতরে মানুষ হাঁটার জন্য যেমন নির্ধারিত লেইন রয়েছে তেমনিভাবে ক্ষতিকারক পদার্থগুলো এবং কোন পণ্য কোথায় রাখা হবে সে অনুযায়ী স্থানও নির্ধারিত রয়েছে।
যারা এসব ইয়ার্ডে কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে আবাসিক ডরমেটরি সুবিধা। খাবার পানির সুব্যবস্থা এবং স্যানিটেশন সুবিধা।
উল্লেখ্য, জাহাজভাঙা শিল্প দেশে স্টিলের কারখানাগুলোতে কাঁচামাল সরবরাহের অন্যতম ক্ষেত্র। এক দশক আগে জাহাজভাঙা শিল্পে পরিবেশ দূষণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবেও জাহাজ কেনার হার কমে গিয়েছিল। প্রায় মরতে বসা এই খাত আবারও চাঙ্গা হতে যাচ্ছে পরিবেশ আইন মেনেই। তবে একটি ইয়ার্ড আধুনিকায়ন করতে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকার প্রয়োজন হয়। এই টাকা বর্তমানে ইয়ার্ড মালিকরা নিজ থেকে বিনিয়োগ করছেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে যদি ঋণ দেওয়া হতো তাহলে গ্রিন শিপইয়ার্ডের সংখ্যা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পেত বলে ইয়ার্ড মালিকদের মত।
