আশঙ্কা সত্য হলো। পটুয়াখালীর পায়রায় দেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পড়ে রইল, কয়লার অভাবে উৎপদন বন্ধ, তাই উড়ে গেল বিদ্যুৎ। সোমবার দুপুরে কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায়ই বন্ধ থাকা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কয়লার অভাবে দু’সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকার পর চালু হলেও ফের বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশের বড় দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটির উৎপাদন বন্ধ ও অপরটিরও বন্ধ হওয়ার উপক্রমে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে তীব্র লোডশেডিংয়ের।
একদিকে প্রকৃতিতে তাপপ্রবাহ। অন্যদিকে মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। যখন বিদ্যুতের চাহিদা বেশি, সেই সময়েই কয়লার অভাবে দেশের সবচেয়ে বড় এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে যাবে। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৩৯০ মিলিয়ন ডলার বকেয়া বিল পরিশোধ না করায় কয়লা সরবরাহ বন্ধ করে দেয় চায়না প্রতিষ্ঠান সিএমসি। এতেই কয়লার অভাব দেখা দেয়। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের কারণে জনদুর্ভোগ ও কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে পুরো ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
এদিকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দামের বাইরে শুধু কয়লা বাবদ পিডিবির কাছে কেন্দ্রটির বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে থাকা এ বকেয়ার টাকা পরিশোধের জন্য দফায় দফায় চিঠি দিয়েও তা পরিশোধ করা হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অবহেলার কারণেই কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো নিজেদের দায় অস্বীকার করে বলছে, বৈশি^ক মন্দা পরিস্থিতিতে ডলার সংকটের কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার পর ডলার ছাড় ঠিকই হচ্ছে। যা আগেই করা উচিত ছিল। এ ক্ষেত্রে দুটো বিষয় হতে পারে। একটি হলো যারা ডলার ছাড় করছেন তারা বিদ্যুৎ খাতের গুরুত্ব বুঝতে পারছেন না অথবা দেশের পরিস্থিতি আসলেই ভয়াবহ। তবে দেশের উন্নয়নে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতকে অবশ্যই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। সূত্রমতে, কয়লা দেশে পৌঁছানো এবং কেন্দ্র চালু করতে সব মিলে অন্তত এক মাসের মতো সময় লাগবে। কোনো কারণে যদি কয়লা আসতে আরও দেরি হয়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। কেন্দ্র ভাড়ার পাশাপাশি লোডশেডিংয়ে মানুষের ভোগান্তি এবং কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিলেও এ ক্ষতির পরিমাণ অপূরণীয়।
টানা তিন মেয়াদের সরকার সবচেয়ে বড় সফলতা যে সেক্টরে দেখিয়েছে তা হলো বিদ্যুৎ। তবে নির্বাচনের বছর মুদ্রাস্ফীতি ও লোডশেডিংয়ে কাতর সাধারণ মানুষ। সর্বশেষ কয়লা সংকটে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ দুর্ভোগের পথ আরও বাড়াবে। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ক্ষমতাসীন দলের এমপিদের ভেতরেও এখন লোডশেডিংয়ের ভীতি। অব্যাহত লোডশেডিংয়ের ভয়ে নিজের এলাকায় যেতে অস্বস্তিতে ভুগছেন এমপিরা। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও স্বীকার করেছেন, বেশ কিছুদিন ধরে লোডশেডিং বেড়ে গেছে এবং জনগণ কষ্টে আছে। তিনি আশা করছেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে। কিন্তু কী উপায়ে সেটি হবে, তা বলেননি।
সরকার এতদিন গ্যাস, কয়লা ও তেলের সংস্থান না করেই বিদ্যুতের অবকাঠামো বাড়িয়েছে, শতভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। প্রচুর ঢাকঢোল পিটিয়ে এসবের ব্যয়বহুল উদযাপনও করেছে। কিন্তু নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করেনি। জ্বালানি আমদানিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আমরা বলতে চাইÑ আমদানিনির্ভর জ্বালানিনীতি বাদ দিয়ে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নিন। তেল, গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ নির্বিঘœ করতে হবে। এই প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের কালে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা থেকে রেহাই দিন।
