জুয়েল মাজহারের ‘কবিতাসংগ্রহ’ কলকাতা বইমেলা ২০২৩-এ ‘আদম’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। জুয়েল মাজহারের প্রথম কবিতার বই ‘দর্জিঘরে এক রাত’ প্রকাশিত হয় তার ৪১ বছর বয়সে ২০০৩ সালে।
কবির পরবর্তী ৪টি বই প্রকাশিত এই সময় অনুসারে : মেগাস্থিনিসের হাসি (২০০৯, কবির ৪৭ বছর বয়সে), দিওয়ানা জিকির (২০১৩, ৫১ বছর বয়সে), রাত্রিও বাঘিনী (২০২০, ৫৮ বছর বয়সে), বসন্তরূপক হাসি (২০২২, ৬০ বছর বয়সে)। কবির কবিতা যাপনের সমৃদ্ধ যে যাত্রাপথের জানালা খুলে রেখেছেন কবি এই বইতে, সেই জানালার সামনে উঁকি দিয়ে নব্য কবিরা পেয়ে যেতে পারেন আলোছায়াময় এক ভিন্নতর ঋদ্ধ পথ। কবিতার সঙ্গে এই যাপন কবির দীর্ঘ ৪০ বছরের এবং আশির দশকের কবি হিসেবে বহুল পরিচিত জুয়েল মাজহারের কবিতায় নিজের সিগনেচারের গাঁথুনি শক্তই। এই বইয়ের অসাধারণ ভূমিকায় কবি নিজেই নিজের কবি যাপন নিয়ে বলেন, ‘জানি না, কোন স্বর্গ-নরকের লোভে টানা চারটি দশক ধরে আমার আয়ুর চেয়ে দীর্ঘ এক গন্ধকের নদী সাঁতরে চলেছি। হেঁটে চলেছি ভাষার অন্তহীন অরণ্যের ভেতর দিয়ে-নিঃশব্দে, নীরবে। ঝোলাহীন, আলখাল্লাহীন। অক্ষর-সরণি ধরে আয়ুদীর্ঘ এই মেরাথন বুঝি-বা কখনো থামবে না। যুধিষ্ঠিরের ভাগ্যে অন্তত একটা কুকুরসঙ্গী জুটেছিল। শিল্পী বা কবির কোনো সঙ্গী নেই, সারথিও নেই...’
জুয়েল মাজহারের ৫টি কবিতার বইয়ের কবিতার এই সমগ্রে প্রথম কবিতার বই ‘দর্জিঘরে এক রাত’ দেখা যাক প্রথমেই। ‘নিঃশব্দ কামানে তুমি একা বসে ভরছো বারুদ’ এই লাইনটিই এই বইয়ের ওয়ান লাইন সারমর্ম বলা যায়। এই বইয়ের কবিতাগুলো নিঃশব্দে ধাবমান। নীরবে হেঁটে চলা এক পরিযায়ী পাখি যেন এই বই। আকাশে মেলে ধরছে না সে ডানা। প্রস্তুতি নিচ্ছে, শক্তি সঞ্চয় করছে যেন দিনের পর দিন একা একা। বাক্সময় হয়ে ওঠে না কবিতাগুলো। ভাষার ভিন্ন ব্যবহার চোখে পড়লেও কবিতাগুলো গেঁথে থাকে না, কিছুটা প্রলেপ দিয়ে যায় কেবল। এই কবিতা সমগ্রের ২য় কবিতার বই ‘মেগাস্থিনিসের হাসি’তে মনোযোগ দেওয়া যাক। এই বইতে সেই পরিযায়ী পাখি আকাশে শরীর ছেড়ে হালকা লয়ে উড়ছে যেন। এই বইয়ে ভাষা উন্মুক্ত হয়েছে ভীষণ। ছন্দের গুনগুন টের পাওয়া যায় বই ভর্তি। কবি এখানে অনেকটাই হাত খুলে, হৃদয় খুলে দিয়েছেন যদিও হৃদয় খুলতে চান না কবি! প্রকৃতি বেশি এসেছে এই বইতে। প্রকৃতিকেই কেন্দ্রে রেখেছেন এই বইতে কবি একটু ভিন্নভাবে। প্রকৃতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে মূলত উপমার জন্য, যার সঙ্গে মিশিয়ে ব্যক্তির অন্তর্নিহিত বোধই এঁকেছেন। অনেক ভারী বোধও এই বইতে ভাষার কারুকার্যে নরম হয়ে আসে। যদিও এখানেও কবিতাগুলো হৃদয়ে গেঁথে যায় না, তবে হৃদয় প্রসারিত হতে দেয় পাঠে।
এই বইয়ের তৃতীয় কবিতার বই ‘দিওয়ানা জিকির’-এ যেন সেই পরিযায়ী পাখি আরও সাবলীল হয়ে উড়ছে নিজেকে অন্যান্য পরিযায়ী পাখিদের চেয়ে আরও আলাদা করে। আগের দুটি বইসহ এখানে এই বইতে এসে কবির কবি যাপনের একটা নির্দিষ্ট বলয় অঙ্কন করা যায় অনেকটাই। এখানে কবিতার ভাষা ভঙ্গিমা হৃদয় প্রায় ভেদ করে দিতে চায়। অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার আগের দুটো বইয়ের তুলনায় কিছুটা বেশি দেখা যায়। ‘আমার সামনে এক রুবিকন, পুলসিরাত, ভয়ানক ক্রুর অমানিশা/এর সামনে একা আমি; কিস্তিহীন, নিরশ্ব, রসদহীন/পিগমিদের চেয়ে ছোট আমি!/আর আমার ভাঙা হাড়, থেঁতলানো খর্বকায় দেহের ভেতরে যত/রক্ত-পিত্ত-কফ-থুথু-বীর্য-লালা সবই/অসীম বরফে-হিমে গ্রানিটের মতো ক্রমে হতেছে জমাট;/’ ভিন্ন এক জগতের কাছে নিয়ে যায় এই বই। গহীনতা ও মোলায়েম বোধের এক ভারসাম্য সূচিত হয় এই বইয়ের কবিতাগুলো মিলে।
এরপর আসা যাক এই কবিতাসংগ্রহের চতুর্থ বই ‘রাত্রি ও বাঘিনী’তে। ‘আমি জানি, আমার প্রস্থানপথ হয়ে থাকবে শয়তানের পুরীষে আবিল!/স্বপ্নের ভেতরে গিয়ে জিরোবার ছল করে ডাকলে তোমাকে/কান দু’টি ভরে উঠবে প্রতিধ্বনিময় কা-কা রবে/অথবা, আমার স্বর শুষে নেবে খর মরুবালি;/’ এই বইতে পরিযায়ী পাখিটি যেন আরও আয়েশে সাবলীল হয়ে উড়ছে তো উড়ছেই। খানিক বাদে তার ভেতর কাজ করছে যেন স্নিগ্ধ বোধ। এই বইতে প্রকৃতি ও চারপাশকে সবচেয়ে বেশি প্রসারিত ভঙ্গিমায় পাওয়া যায় বাকি বইগুলো থেকে। আত্মবোধ অনেকটাই নরম হয়ে থাকে এখানে। অন্তর্দহন থেকে প্রকৃতির সঙ্গে, চারপাশের সঙ্গে যেন মানিয়ে নিচ্ছে হৃদয়। কবিতার বেশির ভাগই দীর্ঘ, বিশ্রাম যথেষ্টই নেওয়া যায় এই কবিতাগুলোতে।
সবশেষে এবার দেখা যাক এই বইয়ের শেষ কবিতার বই ‘বসন্তরূপক হাসি’কে। এই বইটিতে এসে কবির এই দীর্ঘ কবিযাপনের যাত্রাপথ পূর্ণাঙ্গ লাভ করে নিজস্ব কঠোর সিগনেচারসহ। পরিযায়ী পাখি এখানে এসে যেন ইচ্ছামতো উড়ছে, ভাঙছে, বুনছে, মাতাল হচ্ছে, প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে অবগাহন করছে এই মর্ত্য।ে এখানে অনেক অপ্রচলিত শব্দের আনাগোনা দেখা যায়, যার মানে জানা না থাকলে কবিতার মূল রস আস্বাদন অনীহায় ভেসে থাকে বাতাসে। এই বইয়ের প্রতিটি কবিতার ভাষা-ভঙ্গিমা আকৃষ্ট করে পাঠককে নিয়ে যায় নানাবিধ পথে, তারপর ঘুরিয়ে আনে যেন শুরুতেই। ভাষার যে এক প্রবল শক্তি তার অনুধাবন নিশ্চিত হয় এখানকার প্রতিটি কবিতা পড়তে পড়তে। দুর্দান্ত হয়ে ওঠে এর সমগ্র অবয়ব এবং বারবার পাঠেও একঘেয়েমি আসে না এই কবিতাগুলো নিয়ে থাকতে। এর মূল কারণ শব্দ, স্তবক, পঙ্্ক্তি উপুড় করে দেখলেই সেগুলোর অর্থ হৃদয়ে প্রসারিত নদীপথ যেন হয়ে উঠতে থাকে। কোথাও কোথাও ভাষার বিস্ফোরণ বিস্মিত করে, সামলে নিতে হয় নিজেকে। যেমন, ‘আজও যদি প্রেম কিছু বেঁচে থাকে, অবশিষ্ট থাকে/ নিজেদের ঘাড় মটকে, হৃৎপিণ্ড খুবলে খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে’ আত্মগত স্বর এই বইয়ে চরমভাবে বিভিন্ন রূপে এসেছে, যা কঠোর থেকে কঠোর রূপ হয়ে এসেছে প্রায়ই, হৃদয়ে ঘাঁই মেরে। ‘আমি এক শক্তখোল কূর্মের ভিতরে সুকোমল/ ‘হৃদয় লইয়া থাকি’/ কর্দমাক্ত আবছা জলাশয়ে শ্যাওলাঢাকা খর্ব দেহ।/ যেন এক কিম্ভুত শসার বিকল এঞ্জিনসহ মুখ থুবড়ে পড়েছি ডাঙায়/-আদিম জলার পাশে।/ সঙ্গীহীন।/ একা নিঃসহায়!/’ এই বইয়ের বয়ে চলায় আবার কোথাও
কোথাও ভীষণ ভারী বোধ মৃদুলয়ে পাঠকের সম্মুখে বইতে থাকে, যার আড়ালেই পারদ ঠাসা আসলে। যেমন, ‘প্রতিটি গাছের গোড়ায় গোপনে কুড়াল রেখে আসে কাঠুরের দল/রাত্রে পাতাকুড়ানির রূপ ধরে চুপে তারা আসে/হায়েনার চোয়ালে তৃণভোজীদের হাড় ভাঙার দূরাগত আওয়াজের মতন অরণ্যে শব্দ করে চলেছে তাদের স-মিল;/যারা তৃণে ও ত-ুলে তৃপ্ত ছিল, তারা আজ নব ভোগ চায়;/তাদের দাঁত এখন কামড় বসাচ্ছে গাছের কোমরে/অসতর্ক সরল মেঘেদেরও লেহনে উদ্যত তারা’ নিশ্চিতভাবে বলা যায় ‘বসন্তরূপক হাসি’ ক্ল্যাসিক বা ধ্রুপদি। এর মূল রস নিঙড়ে বের করে বিস্মিত হতে চাইলে হাতে সময় আর হৃদয়ে রস আস্বাদনের আকুলতা থাকতে হবে এবং আগাতে হবে সন্তর্পণে।
জুয়েল মাজহারের কবিতা সংগ্রহে পাওয়া যাবে এক বোহেমিয়ান বোধ, নিহিলিস্ট যাপন, অন্তর্দহন, কখনো কখনো ক্রুরতা, যাপনের ক্লেদ, অসাম্যের ও কখনো কখনো নরকময় এই পৃথিবীর প্রতিচিত্র। ব্যক্তির ভেঙে যেতে যেতেও ভেঙে না গিয়ে বলীয়ান হয়ে থাকার আপ্রাণ চেষ্টাও প্রকট এই বইতে। আরও দেখা যায়, বিবিধ কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ব্যক্তির নিজের কাঁধেই নিজেকে সওয়ার করে পৃথিবীর পথে আগানোর দৃঢ়তা। অপ্রচলিত শব্দের, সংস্কৃত শব্দের ও ইংরেজি শব্দের স্বকীয় ব্যবহার অন্য দ্যোতনা এনে দেয়ে কবিতাগুলোয়। কোনো কোনো কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার, শৈশবকে ভিন্নভাবে ঢেলে আনা, প্রেম সংরাগে মত্থিত হয়ে শরীরী হয়ে ওঠা কিছু কবিতা মিলে এক বৈচিত্র্য তৈরি হয় এই বইতে।
অন্যদিকে, মিথ ও ঐতিহাসিক বেশ কিছু চরিত্রের সাবলীল ব্যবহার কিছু কিছু কবিতায় উঠে এসে কবিতাগুলোর মর্মার্থ ব্যাপকতা নিয়ে হাজির হয়। অনেক কবিতার ভেতরে যাপনের ভীষণ চাপবোধে বা তপ্ত লোহার আঁচে পাঠক ক্ষত-বিক্ষতও হতে পারেন যদি সংবেদনশীল পাঠক হন। তবে ঋদ্ধ হয়ে উঠতে হবেই কোনো না কোনোভাবে এই বই শেষ হলে যদি অপার মনোযোগ দিয়ে, মর্মার্থ বের করে পাঠ করা যায় এর শেষ অব্দি। কঠোর পরিশ্রম, গভীর মনোনিবেশে এই বইয়ের কবিতাগুলো বাহুল্যহীন রেখে খোদাই করা যেন।
প্রতিটি কবিতা অনেক বেশি ওউন করা কবির। নিজের সঙ্গে নিজের কবিতার ঢের বোঝাপড়া কবিতাগুলোতে প্রকাশ্য। পুরো বই পাঠ শেষে অনুভব করি, পরিযায়ী পাখিটি নিঃশব্দ কামানটির ওপরে বসে আছে এখন। আর আমার মাথায় ঘুরছে কেবল, ‘নিঃশব্দ কামানে তুমি একা কেন ভরছো বারুদ?’
