বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। এই জনগণের মধ্য থেকে কিছু মানুষ রাজনৈতিক ব্যানারে যুক্ত হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পরিচালনা করেন। জনগণ তাদের মেন্ডেট দেয় রাষ্ট্র পরিচালনার এবং রাষ্ট্রের জনগণের ভালো মন্দ দেখাশোনার। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে আইন প্রণয়ন করতে হয়। যে আইন রাষ্ট্রের সব নাগরিক এমনকি রাজনৈতিক ব্যানারে যারা আছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা থাকেন তাদের সবার জন্যই একই। দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা রোধসহ সব ধরনের অপরাধ ও অনিয়ম থেকে জনগণকে দূরে রাখা এবং জনগণের সুরক্ষার দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে বিদ্যমান আইনে। জনগণ যে রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব দেন তারও নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো আছে। অর্থাৎ কীভাবে নির্বাচন হবে, কারা নির্বাচন করতে পারবেন, কারা নির্বাচন পরিচালনা করবেন সব কিছুই আইনি ধারায় নির্দিষ্ট করা আছে। তাহলে প্রতি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো কেন সংঘাত-সহিংসতায় জড়ায়? যা জনগণকে অস্বস্তিকর পরিবেশে ফেলে। প্রশ্ন ওঠা কী স্বাভাবিক নয়, যে যারা আইন প্রণয়ন করেন জনগণের জন্য, যারা জনগণকে আইন মেনে চলতে বলেন তারা কেন আইন মানছেন না?
’৯০-এর গণআন্দোলনের পর বলা হয় গণতন্ত্রের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক দলগুলো কোনো নির্বাচনের আগে জনগণকে স্বস্তি দেয়নি। কোনো না কোনো ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে বিতর্ক হয়েছে। জনগণকে ভুগিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত দেনদরবারে পৌঁছিয়েছে। আর এই দেন দরবার দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিবারই আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার মধ্য দিয়ে হয়েছে, যা জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত করে।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। এবারও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। এ কারণে বহির্বিশ্বে নানা প্রকার দেনদরবার চলছে অনেক দিন ধরেই। বিএনপি বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে নারাজ, কিন্তু সংবিধান ও নির্বাচনী আইন অনুসারে বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। পক্ষান্তরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আইনসম্মতভাবে নির্বাচন পরিচালনা করার কথা বলছে ঠিকই, কিছু আইন সংস্কার করে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি করেছে। যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাতিল করেছে আওয়ামী লীগ, যা তারাই দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম করে অর্জন করেছিল। তাও আবার বিএনপির শাসনকালে। এখন বিএনপি তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন চায়, কিন্তু মানতে নারাজ আওয়ামী লীগ। যে কারণে বিএনপি এখন দাবি তুলেছে বর্তমান সরকারের অধীনে তারা নির্বাচনে যাবে না। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনরায় চালু করতে হবে।
সম্প্রতি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের এক সমাবেশে আওয়ামী লীগ নেতা ও ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমুর জাতিসংঘের সহযোগিতায় বিএনপির সঙ্গে সংলাপ হতে পারে মন্তব্যে রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ৬ জুন ১৪ দলের সমাবেশে আমু অনেকটা আকস্মিকভাবেই বিএনপির সঙ্গে সংলাপের কথা বলেন। যদিও তার এই বক্তব্য দলের বা সরকারের নয়, তবু সরকারি দলের একজন শীর্ষনেতার মুখ থেকে সংলাপের প্রস্তাব আসার অর্থ হচ্ছে বিএনপি চাইলে তারা সংলাপে বসতে ইচ্ছুক। আমুর একই বক্তব্যের পর সরকারি কয়েকজন মন্ত্রীও একই সুরে কথা বলেছেন। বিএনপি অবশ্য সংলাপে বাসার আগে সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সংলাপ কেন করতে হবে? দেশে আইন আছে, নির্বাচন কমিশন আছে। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন ও পরিচালনায় বাধ্য। রাজনৈতিক দলগুলো আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে এবং নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে বা করতে পারলে কারও সঙ্গে কোনো সংলাপের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সংলাপে বসতে চাইছে তাও আবার জাতিসংঘের মধ্যস্থতায়। বিষয়টি কি লজ্জাস্কর নয়। আমরা এমন কোনো সংকটে নেই যে, বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশের সহযোগিতা নিয়ে কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে।
ধরে নিলাম আলোচনার বিকল্প নেই। কিন্তু আলোচনা যে কোনো কাজে আসে না তাও তো আমরা জানি। শুধু সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য আস্থা সংকটের কারণে ’৭৫-পরবর্তী প্রতিটি সরকারকেই নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসতে হয়েছে।
১৯৭৬ সালের ২২ জানুয়ারি জিয়াউর রহমানের বিশেষ সহকারী হিসেবে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ১৯৮৪ সালের ৯ এপ্রিল বঙ্গভবনে সাত দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সাত দলের ৩০ দফা দাবি এরশাদ মানেনি। সাত দলের নেতারা সংলাপ কক্ষ ছেড়ে বের হয়ে আসেন। ১৯৮৭ সালে সব বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির অব্যাহত আন্দোলনে কোণঠাসা এরশাদ সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিক নেতারা প্রত্যাখ্যান করে সে আহ্বান। একই বছরের ২৮ নভেম্বর স্বৈরশাসক এরশাদ আবারও সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলেন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি। কিন্তু কোনো দলের কাছ থেকেই তেমন সাড়া মেলেনি।
’৯০-এর গণআন্দোলনে এরশাদ সরকারের পতনে দেশ গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার প্রত্যাশা ছিল জনগণের কাছে। কিন্তু হয়নি। ১৯৯৪ সালে রাজনৈতিক দলগুলো বিএনপির কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে সংলাপ আহ্বান করলেও সে সংলাপ খুব বেশি ফলপ্রসূ হয়নি। এবার আসে বিদেশিদের হস্তক্ষেপের পালা। ২০০১ সালে জিমি কার্টারের মধ্যস্থতায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ হলেও সেটি আলোর মুখ দেখেনি। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আব্দুল জলিল ও বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব প্রয়াত আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার দীর্ঘদিন ধরে চলা সংলাপেও সংকটের সুরাহা হয়নি। ২০১৩ সালে তারানকোর মধ্যস্থতায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনো ফলপ্রসূ ফল আসেনি। ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংলাপসংক্রান্ত কোনো সমাধান আসেনি বিশেষ করে রাজনৈতিক মাঠে।
কাজেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংলাপ হতাশার চিত্রই পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। বিগত কয়েকটি সংলাপে দেখা গেছে, সরকার এবং বিরোধীদের ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা নীতির কারণে সংলাপ ব্যর্থ হয়েছে। সংলাপে অংশগ্রহণ করা মানে ধরে নিতে চাই চলমান সংকটের সমাধান হবে। এবারও যদি সংলাপ হয় তবে ধারণা করা যায়, এই সংলাপও ব্যর্থ হবে। কারণ রাজনীতির ময়দানে অন্যতম বৃহত্তর দল বিএনপি যেসব দাবিতে আন্দোলন করছে তার বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব। কিন্তু এগুলো বিএনপি খুব জোরেশোরে দাবি করবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগও চাইবে বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে। যেটা মানতে চাইবে না বিএনপি। ফলে সংলাপ এগোবে না।
২০০১ সালের পর থেকে বিদেশিরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে ছড়ি ঘুরাচ্ছে। নির্বাচনের আগে দূতাবাসগুলোর সরব অবস্থা দেখে মনে হয় আমরা ব্যর্থ অকেজো। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেমনি পারস্পরিক সহনশীলতা ও আস্থা নেই, তেমনি এ দেশে এমন কোনো পক্ষ নেই, যিনি বা যারা তাদের একটি মতের ছাতার নিচে আনতে পারবে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন করতে না পারার কারণেই মূলত আস্থাহীনতার সংকট। যখন যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, দলগুলো আইন অনুসারে নির্বাচন করার ব্যবস্থা করলে আস্থাহীনতার সংকট থাকে না। আর তা করা যাচ্ছে না বলেই সংলাপ মুখ্য হয়ে ওঠে। ধরে নিলাম সংলাপ হলো আগামী নির্বাচন করা নিয়ে। কিন্তু কোনো পক্ষ ছাড় দিল না। তা হলে কী হবে? সংলাপকে যদি অর্থবহ করতে হয়, তবে সংলাপ করতে হবে আগামী সব নির্বাচন যে আইনের ধারায় বা যে নিয়মে হবে তা নিয়ে। আর আইন না মানলে কী ধরনের শাস্তি হবে তা নিয়ে করতে হবে সংলাপ। সংলাপ করলেই যে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হয়ে যাবে তা তো না। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে সব দলকে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যারা যুক্ত থাকবেন তাদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে।
আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন। আইন প্রণেতারা যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হন, তবে সাধারণ মানুষ আইন মেনে চলতে উৎসাহিত হবেন কেন? নির্বাচন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যা সুনির্দিষ্ট আইন দ্বারা নির্ধারিত। তাই যে দলই ক্ষমতায় থাকুক আইন এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যে যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে কোনো বিদেশি শক্তিকে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা পেতে ডাকতে হবে না।
লেখক: সাংবাদিক
