‘তিনজন বা চারজন পেসারও তো খেলাতে পারি’ আফগানিস্তান টেস্টের আগের দিন হেড কোচ চ-িকা হাথুরুসিংহের এই ইঙ্গিত যদি ফলে যায় তবে ইতিহাস গড়বে বাংলাদেশ। এক টেস্টে চার পেসার খেলানোর ইতিহাস। বাংলাদেশের কোচ হিসেবে হাথুরুসিংহের প্রথম পর্বের সঙ্গে বর্তমান পর্বের বিস্তর পার্থক্যই এই কোচের মানসিকতায় বদল আসার কারণ। বাংলাদেশকে হোম কন্ডিশনের সুবিধা নেওয়া শিখিয়েছেন তিনিই। তার সময়েই স্পিনবান্ধব উইকেট তৈরি করে ২০১৬ সলে ইংল্যান্ড ও ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে স্মরণীয় টেস্ট জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। সেই হাথুরু এখন সবুজ উইকেট তৈরি করেছেন। চার পেসার নেওয়ার ইচ্ছের কথা জানাচ্ছেন। বর্তমান ক্রিকেটের মানসিকতার সঙ্গে মিল রেখে হাথুরুর মানসিকতায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১০৮ রানে জেতা ওই ম্যাচে বাংলাদেশ দলে পেসার খেলেছিলেন মাত্র একজন কামরুল ইসলাম রাব্বি। ইংল্যান্ডের ৮১.৩ (প্রথম ইনিংস) ও ৪৫.৩ (দ্বিতীয় ইনিংস) ওভারে রাব্বি বল করেছেন মাত্র তিনটি ওভার। বাকি সব ওভার ভাগ করে করেছিলেন সাকিব আল হাসান, মেহেদী হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলাম, শুভাগত হোম। সাব্বির রহমানও ৫ ওভার বল করেছিলেন। এরপর ২০১৭ সালে অজিদের বিপক্ষে জেতা ম্যাচেও একই চিত্র। এই ম্যাচের একাদশে অবশ্য দুজন পেসার ছিলেন শফিউল ইসলাম ও মোস্তাফিজুর রহমান। তবে অজিদের ৭৪.৫ ওভারের প্রথম ইনিংসে শফিউল ৬ ওভার ও মোস্তাফিজ ৮ ওভার বল করেন। আর ৭০.৫ ওভারের দ্বিতীয় ইনিংসে মোস্তাফিজ মাত্র ১ ওভার বল করলেও শফিউল বোলিংয়ের সুযোগই পাননি। তাছাড়া হাথুরুর সময়েই লেগ স্পিনার হিসেবে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ৬ ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন জুবায়ের হোসেন লিখন। যিনি কিনা এখন জাতীয় দলের ত্রিসীমানাতেও নেই।
এক টেস্টে মাত্র একজন পেসার নিয়ে খেলা এই হাথুরু এবার আক্রমণ সাজাতে চাইছেন চার পেসার দিয়ে! কাল সংবাদ সম্মেলনে বলছিলেন, ‘অবশ্যই (পেস বোলিংয়ের শক্তি)। আমরা সবাই এখন জানি বাংলাদেশের লাইন-আপে সাত, আটজন পেসার আছে, যাদের যে কোনো সময় টেস্টের মূল একাদশে নেওয়া যাবে। এই গ্রুপটা আমি আসার আগে থেকেই এইচপি হোক, বাংলাদেশ টাইগার্স হোক বা জাতীয় দলে যে কাজ করেছে সবাই সেরা কষ্টটাই করেছে। এজন্য সবাই লাফিয়ে-লাফিয়ে উন্নতি করেছে। আমি বিশ্বাস করি কাল (আজ) আমরা তিনজন পেসার খেলাই বা চারজন- যে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি- সবাই কিন্তু একাদশে থাকার জন্য তৈরি।’
ইংল্যান্ড সিরিজ দিয়ে বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের মতো কাজ শুরু করেন হাথুরু। বাংলাদেশ যে আগে থেকেই ভয়ডরহীন ক্রিকেটীয় ব্র্যান্ডে তৈরি হতে চাচ্ছে, সেই মানসিকতার সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে ফেলেছেন। তাই আয়ারল্যান্ড টেস্টের আগে ফলাফল বাদ দিয়ে সেরা ব্র্যান্ডের ক্রিকেট খেলার দাবিটা রেখেছিলেন শিষ্যদের কাছে। এখন আর স্পিনিং উইকেট তৈরি করে নয়, সবুজ ঘাসে মোড়ানো স্পোর্টিং উইকেট দিয়ে সেরা ব্র্যান্ডের ক্রিকেটটা দেখাতে চান হাথুরু, ‘আয়ারল্যান্ডের সিরিজের আগেই আমরা এ ব্যাপারে কথা বলেছি। ফলাফলের চিন্তা বাদ দিয়ে আমরা একটা নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ক্রিকেট খেলতে চাই। খেলা শেষে অবশ্যই একটা রেজাল্ট আসবে। কিন্তু আমরা দেখতে চাই বিভিন্ন কন্ডিশনে আমাদের স্কিল কেমন, কী শিখতে পারি এবং মাঠে কী দেখাতে পারি। সেটা আমরা টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার সময় বিভিন্ন কন্ডিশনে ব্যবহার করব। এই ম্যাচটা আমাদের সেই অভিজ্ঞতা দিতে পারে। কারণ এখানে আমরা স্পোর্টিং উইকেটে খেলব। দুই দলের জন্যই সমান সুবিধা থাকবে।’
মানসিকতা বদলে হাথুরু এখন এক জায়গায় বসে থাকতে নারাজ। আগে হোম কন্ডিশন ব্যবহার করে শুধু স্পিন ফ্রেন্ডলি উইকেটই বানাত বাংলাদেশ। স্পিনাররাই ছিলেন বোলিং আক্রমণের ভরসা। এখন ভালো উইকেটে শিষ্যদের শেখাতে চাইছেন হাথুরু। যেন এমন টেস্টে শিখে বিদেশের মাটিতে ভালো করতে পারেন বোলার-ব্যাটাররা, ‘টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচ বা এক টেস্টের সিরিজ, যাই হোক। আমরা সঠিক পথে এগোতে চাই। সেটা হলো বিভিন্ন দলের সঙ্গে বিভিন্ন কন্ডিশনে খেলা শেখা। ঘরের মাঠে আমাদের সেরা খেলার ধরনটা আয়ত্ত করতে হবে। একইসঙ্গে বিদেশে কোনটা আমাদের জন্য সঠিক সেটাও শিখতে হবে।’
এ বছর ২৮ নভেম্বর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হোম সিরিজের টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তৃতীয় চক্র শুরু করবে বাংলাদেশ। কোচ হাথুরুসিংহের জন্য তার আগে আয়ারল্যান্ড ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে দুই টেস্টে শিষ্যদের নিয়ে নতুন মানসিকতায় থিতু হওয়ার সুযোগ থাকল। হাথুরু খুবই আগ্রহী নতুন ব্র্যান্ডের বাংলাদেশের সঙ্গে মিশে যেতে। এই টেস্টে বাংলাদেশের জয় তার এই বদলে যাওয়া মানসিকতাটা প্রতিষ্ঠিত করতে করতে বড় নিয়ামক হয়ে উঠবে।
