মাহবুবা রহমান আঁখির প্রসবজনিত ভুল চিকিৎসা এবং নবজাতক ও মায়ের মৃত্যুর জন্য নিজেদের গাফিলতির কথা স্বীকার করেছে সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে হাসপাতালটি।
একই সঙ্গে আঁখি ও তার নবজাতকের মৃত্যুর জন্য ডা. সংযুক্তা সাহা এবং অস্ত্রোপচারের দায়িত্বে থাকা অন্যান্য চিকিৎসককেও দায়ী করেছে সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ।
গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতালে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক ডা. এটিএম নজরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, আঁখির চিকিৎসায় হাসপাতালের অবশ্যই গাফিলতি ছিল। মূল গাফিলতি ছিল ডা. সংযুক্তা সাহার, তারপর ওটির (অস্ত্রোপচার কক্ষ) চিকিৎসকদের। কারণ ওটিতে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা সিনিয়র চিকিৎসকদের ডাকেননি।
প্রসবব্যথা উঠলে গত ৯ জুন মধ্যরাতে কুমিল্লা থেকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে আঁখিকে নিয়ে আসে তার পরিবার। আঁখির স্বামী ইয়াকুব আলীর ভাষ্য, প্রসূতিকে ভর্তির সময় ডা. সংযুক্তা হাসপাতালেই আছেন বলা হলেও আসলে তিনি ছিলেন না। সেই রাতে ওই চিকিৎসকের সহকারীরা প্রথমে স্বাভাবিকভাবে বাচ্চা প্রসবের চেষ্টা করেন। সে সময় জটিলতা তৈরি হলে অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুটি ওইদিনই মারা যায়। সংকটাপন্ন অবস্থায় আঁখিকে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত রবিবার দুপুরে তার মৃত্যু হয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি : ‘ভুল চিকিৎসায়’ মা ও নবজাতক মৃত্যু ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। সেন্ট্রাল হাসপাতালে যে ঘটনা হয়েছে, যার জন্য আমরা খুবই দুঃখিত। রোগী মারা গেছেন, শিশু মারা গেছে। তাদের পরিবারের প্রতি আমরা সমবেদনা জানাই। সেখানে যদি কোনো চিকিৎসক অনিয়ম করে থাকেন, তাহলে আমাদের দেশে যে আইনি ব্যবস্থা আছে, তা প্রয়োগ করা হয়েছে এবং প্রয়োগ করা হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা অন্যায়কে কখনো প্রশ্রয় দেব না। যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, তার জন্য ব্যবস্থা রয়েছে। ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব দুটোই আমরা খতিয়ে দেখব। এরই মধ্যে আমাদের একটি সাত সদস্যের টিম গঠন করা হয়েছে। তারা সেন্ট্রাল হাসপাতালে আবারও যাবেন। ঘটনার পূর্ণ রিপোর্ট দেবেন। চিকিৎসকের কী ভুল ছিল, অন্যান্য যারা কাজ করেছেন, তাদের কী ভুল ছিল, প্রতিষ্ঠানের কী ভুল ছিল সেই বিষয়ে রিপোর্ট করবে। খুব দ্রুত আমরা রিপোর্ট দিতে বলেছি। রিপোর্ট পাওয়ার পর আমরা যা যা ব্যবস্থা নেওয়ার নেব।
ডা. সংযুক্তা সাহাকে দায়ী করল হাসপাতাল : ডা. এটিএম নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, রোগীদের আকৃষ্ট করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে প্রচার মাধ্যম বানিয়ে প্রথমত ডা. সংযুক্তা সাহা মেডিকেল ইথিকস পরিপন্থী কাজ করেছেন। পাশাপাশি হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে না জানিয়ে তিনি সেদিন রোগী রেখে চলে গেছেন। যার ফলে এত বড় একটি ঘটনা ঘটেছে।
এ কর্মকর্তা বলেন, একমাত্র ডা. সংযুক্তা সাহার কারণেই এ ঘটনাটি ঘটল। তিনিই তো এত বেশি রোগী দেখেন। সংযুক্তা সাহা হাসপাতালে আছেন কি নেই, বিষয়টি যদি শুরুতেই পরিষ্কার করে দেওয়া হতো, তাহলে এ বিষয়টি হতো না। রোগী হয়তো আমাদের হাসপাতালের অন্যান্য সিনিয়র কনসালট্যান্টের অধীনে ভর্তি হতেন। অথবা অন্য কোনো হাসপাতালে চলে যেতেন।
তিনি আরও বলেন, ডা. সংযুক্তা সাহা ওইদিন হাসপাতালে থাকবেন না সেটি আমাদেরও জানাননি। আমরা যদি জানতাম তিনি কর্মস্থলে নেই, তাহলে তার রোগীদের জন্য আমরা বিকল্প চিকিৎসকের ব্যবস্থা রাখতাম। কিন্তু তিনি হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে না জানিয়েই দেশের বাইরে চলে গিয়েছিলেন। সুতরাং এ ঘটনাটি আমরা মনে করি তার জন্যই হয়েছে। এমনকি যারা রোগীদের ইনফরমেশন দিয়েছেন, তারা হাসপাতালের স্টাফ নন। তারা ডা. সংযুক্তা সাহার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। সুতরাং এর দায় সম্পূর্ণ সংযুক্তা সাহার।
ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। সাত কর্মদিবসের মধ্যে এর তদন্ত প্রতিবেদন আসার কথা। ইতিমধ্যে পাঁচ দিন চলে গেছে আর বাকি আছে দুদিন। আশা করছি এ সময়ের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা সম্ভব হবে। তদন্তকাজ শেষ হলেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ কর্মকর্তা আরও বলেন, নিজেদের প্র্যাকটিস বাড়ানোর লক্ষ্যে যোগাযোগ মাধ্যমকে প্রচারণার হাতিয়ার বানিয়ে রোগী বা তাদের অভিভাবকদের আকর্ষণ করা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও মেডিকেল ইথিকস পরিপন্থী। কিন্তু ডা. সংযুক্তা সাহা সেই কাজটি নিয়মিত করেছেন। বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পর বাকি সব চিকিৎসককে এ বিষয়ে হাসপাতালের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে যদি কোনো চিকিৎসক এ ধরনের কোনো কার্যকলাপ করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।
এ হাসপাতালে সিনিয়র ডাক্তারদের বদলে জুনিয়র ডাক্তাররা রোগী দেখেন এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ডা. নজরুল বলেন, এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের তদন্ত চলছে। যদি আমাদের হাসপাতালে এরকম ঘটনা ঘটে থাকে, নিশ্চয়ই এর পেছনের কারণগুলোও বের হয়ে আসবে।
চালু করেছে আইসিইউ : গত ১৬ জুন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও জরুরি সেবার মান সন্তোষজনক না হওয়ায় অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেই ঘোষণার দুদিন পর গতকাল আইসিইউ চালু করে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের ভাইস চেয়ারম্যান এবং পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এমএ কাশেম এক অফিস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, কর্র্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তক্রমে সেন্ট্রাল হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের সব কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে তিনি এ বিষয়ে সবাইকে সহযোগিতা করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন।
অবশ্য আইসিইউ চালু করলেও এখনো এ হাসপাতালের সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. শেখ দাউদ আদনান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, অধিদপ্তর আইসিইউ বন্ধের নির্দেশ দেয়নি। বলেছিল আইসিইউ ও জরুরি সেবার মান সন্তোষজনক না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকবে। এখনো সে নির্দেশনা বহাল আছে।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের আইসিইউ আজ (গতকাল) সকাল থেকেই খুলে দেওয়া হয়েছে। আমাদের ওটিতেও যথেষ্ট ফ্যাসিলিটি আছে। আমাদের পাঁচটা ওটি একদম মডার্ন ইকুইপমেন্ট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। যেহেতু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অপারেশন থিয়েটার বন্ধ করেছে, আমরা আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যে আবার সেটি চালু করতে পারব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চালু করে দিয়ে যাবে।
