একুশ শতকেই ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল উদীয়মান বাজার অর্থনীতির মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। কারণ দেশগুলোর রয়েছে নিম্ন শ্রম খরচ, অনুকূল জনসংখ্যা, বৈশ্বিক পণ্যের চাহিদা এবং প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ। রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গে ২০০৯ সালের ১৬ জুন প্রথম ব্রিক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে চারটি দেশের নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিক অর্থনৈতিক ব্লকে তাদের সদস্যপদ ঘোষণা করেন। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে, দক্ষিণ আফ্রিকাকে এই অর্থনৈতিক ব্লকে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়, যার ফলে ব্রিক থেকে ব্রিকস হয়। ব্রিকস প্রতিষ্ঠার পর থেকেই, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ব্রিকস দেশগুলো স্বতন্ত্রভাবে প্রথম সারির অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, ২০১০ সালে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়। ভারত বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপিতে) দশম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ক্রয়ক্ষমতা সমতা (পিপিপি) এ জিডিপির ক্ষেত্রে চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। ২০১১ সালে ব্রাজিল বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। রাশিয়া বর্তমানে নবম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে স্থান পেয়েছে। ব্রিকসের সদর দপ্তর চীনের সাংহাই প্রদেশে অবস্থিত। এটি গঠনের সময় অনেকেই বলেছেন যে, অর্থনৈতিক জোটটি ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্ব অর্থনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করবে।
ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্র ও দক্ষিণ বিশ্বের কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা চলতি বছরের গত ২ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে এক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) যুক্ত হওয়ার জন্য আলাপ-আলোচনা চলছে সৌদি আরবের সঙ্গে। ব্রিকসে সৌদি আরবকে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে একটি বার্তা দিতে চাওয়া হচ্ছে। তা হলো বৈশ্বিক আর্থিক সংস্থায় পশ্চিমাদের যে একচেটিয়া অবস্থান রয়েছে, তাকে চ্যালেঞ্জ জানানো। এ ছাড়া ধনী দেশগুলোর সংস্থা, যেমন জি-৭-এর বিপরীতে আলাদা একটা জোট গড়ার প্রচেষ্টা এটি। জি-৭-এর মতো জোটকে দক্ষিণ বিশ্ব নয়া উপনিবেশবাদী কাঠামো বলে মনে করে।
সমালোচকরা প্রায়ই বলে থাকেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক দক্ষিণ বিশ্বকে কাঠামোগত দিক থেকে তাদের নীতির আওতায় আনতে চায়। এ দুটি সংস্থা পশ্চিমা পররাষ্ট্রনীতির যে লক্ষ্য, তার সঙ্গে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ। এখন রাশিয়া ও চীন থেকে বৈশ্বিক বিনিয়োগ সংকুচিত হয়ে আসছে। এ পরিস্থিতিতে এনডিবিকে অবশ্যই বিকল্প ব্যবস্থা দিতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে ব্রিকসে সৌদি আরবের অন্তর্ভুক্তি এই বার্তাই দিচ্ছে যে, ব্রিকসের এখনকার ও ভবিষ্যতের সদস্য দেশগুলো বৈশ্বিক সুশাসন ও আর্থিক কাঠামোর ক্ষেত্রে বিকল্প খুঁজছে। পশ্চিমা বিশ্ব সম্ভবত এ ব্যাপারটা লক্ষ করেছে। এ বছর জি-৭ সম্মেলনে তারা ভারত, ব্রাজিল, আফ্রিকান ইউনিয়ন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াকে পর্যবেক্ষক করে। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর মতোই সৌদি আরবও ইউক্রেন সংঘাতে নিরপেক্ষ নীতি নিয়েছে। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই নীতি গ্রহণের পেছনে একটি বিষয় বড়ভাবে কাজ করেছে। সেটা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালের জাতীয় সীমান্ত ও সার্বভৌমত্বের বিশুদ্ধতা নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্য আছে। এ বিষয়ে পশ্চিমাদের দ্বিচারিতায় সবার মধ্যেই হতাশা জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক আগ্রাসনের ফলাফল ছিল বিপর্যয়কর। এই আগ্রাসনের ফলে লাখ লাখ ইরাকি বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। পশ্চিমাদের ভণ্ডামির একটা যন্ত্রণাদায়ক নজির এটি। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর প্রধান পার্থক্যের জায়গা হলো, এই দেশগুলো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলানোর নীতি মেনে চলে। ব্রিকসের দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন শাসনপদ্ধতি রয়েছে কিন্তু কেউ কারও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করে না। রাজনৈতিকভাবে দেখতে গেলে, এটাই ব্রিকস দেশগুলোকে একত্রে ধরে রাখার সুতো। ব্রিকসে সৌদি আরবের যোগ দিতে চাওয়ার ঘটনাটি এই ভূরাজনৈতিক প্রবণতাটিকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।
ওয়াশিংটনের প্রভাব কমার বিষয়টিও মনে করিয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত বছর সৌদি আরব সফরে এসেছিলেন। সৌদি আরব যেন জ্বালানি তেলের উৎপাদন বাড়ায়, সেই উদ্দেশ্য থেকেই তিনি রিয়াদে এসেছিলেন। কিন্তু সৌদি আরব ঠিক বিপরীত কাজটিই করেছে। সন্দেহ নেই যে, সৌদি আরবের এই সিদ্ধান্তে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন লাভবান হয়েছেন। অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব থেকেই রিয়াদ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে চীন ও রাশিয়ার প্রতি ওয়াশিংটন যে আচরণ করছে, রিয়াদের অবস্থান তা থেকে ভিন্ন। এ বছরে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান বলেন, অন্য দেশগুলোতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সৌদি আরব অভিন্ন লক্ষ্য নিয়েছে। গ্রহীতা দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে এই অর্থায়ন সম্পর্কিত হবে। ব্রিকস বৈশ্বিক অর্থনীতির কাঠামো পুনর্বিন্যস্ত করতে চাইছে। সেখানে সৌদি আরব যুক্ত হলে নিঃসন্দেহে জোটের সেই চাওয়া বাস্তবায়নে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে। নিজ দেশে সৌদি আরব অর্থনীতিকে বিচিত্রমুখী করার নীতি নিয়েছে। রাজস্ব খাতের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি খাতে ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরার পরিকল্পনা করেছে তারা। এ প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব বিদেশে অর্থায়নের ক্ষেত্রে নতুন যে নীতি নিয়েছে, সেটা দায়িত্বশীল ও বিচক্ষণ। সৌদি আরবকে ব্রিকসকে আনার ক্ষেত্রে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মার্চ মাসে সৌদি আরব চীনকেন্দ্রিক জোট সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে সংলাপ অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়। সে সময়ে চীনের সঙ্গে তেল-বাণিজ্য ইউয়ানে করতে কার্যকর আলোচনা হয়েছিল সৌদি আরবের।
ব্রিকসে যত বেশি দেশ যুক্ত হবে, ততই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে। এনডিবিকে অন্তত এক দশক রাশিয়ার ওপর আরোপ করা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলতে হবে। ব্রিকস সদস্য যেমন ভারত ও চীনের মধ্যে ভূখণ্ডগত বিরোধ এ জোটের জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ। এনডিবির বিনিয়োগের পরিমাণ এখন পর্যন্ত কম। ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৯৬টি প্রকল্পে ৩৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এনডিবি। অন্যদিকে ২০২২ সালে বিশ্বব্যাংক প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। এ ছাড়া ব্রিকসের সদস্যদেশগুলো একে অপরের থেকে ভৌগোলিকভাবে দূরে অবস্থিত। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিন্নতা আছে। ব্রিকস পুরোপুরি বাণিজ্য সংস্থা নয়, আবার পুরোপরি ভূরাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যও নেই। ব্রিকস সম্প্রসারণের উদ্যোগকে একটি বার্তা হিসেবে দেখা উচিত পশ্চিমা বিশ্বকে। সেটা হলো তারা যখন একচেটিয়াকরণ করছে সে সময় শাসনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা অথবা বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ওকালতি তারা করতে পারে না। কিয়েভ অভিযান শুরুর পর পশ্চিমারা নানান নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল মস্কোর ওপর। ফলে রুশ জ্বালানি তেল আমদানি-রপ্তানিতে ব্যাপক ভাটা পড়ে। তাতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাগামহীন ভাবে বেড়ে যায়। যার বিরূপ প্রভাব প্রায় প্রতিটি দেশেই পড়ে। ফলে, বিশ্ববাসীর কাছে রাশিয়ার মূল্য কতটুকু তা আরও স্পষ্ট হয়। এখন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্রিকসে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে সৌদি এবং রাশিয়া মিলে একত্রে বিশ্বের তেল বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ফলে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজারে পশ্চিমাদের প্রভাব পুরোপুরি হ্রাস পাবে।
সৌদির ক্রাউন প্রিন্স সালমান কতটা প্রখর বুদ্ধির অধিকারী, সেটি তার ব্রিকসে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকেই বুঝা যায়। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ হচ্ছে চীন, ব্রাজিল এবং ভারত। সৌদির ব্রিকসে যোগ দানের মাধ্যমে দেশ তিনটিতে তাদের তেল রপ্তানি আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে মার্কিন ব্যাংকগুলোতে সুদের হার অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে সৌদি তেল বাণিজ্যে মার্কিন ডলার ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু, ব্রিকসে যোগ দিলে সৌদিকে ডলারের পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় মুদ্রার মাধ্যমে তেল বাণিজ্য করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন একটি মুদ্রা ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে। যেটি কিনা ডলারের বিপরীতে সরাসরি কাজ করবে। এক্ষেত্রে পেট্রোলিয়ামসমৃদ্ধ দেশগুলো বেশি প্রাধান্য পাবে। কারণ, বর্তমান বিশ্বে পেট্রোলিয়ামের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। সৌদি-রাশিয়ার মতো দেশগুলোই পারে নতুন একটি মুদ্রাকে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করতে। এমন একটি পরিকল্পনার কথা ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন পুতিন। মার্কিন ডলারের একচেটিয়া রাজত্ব কমিয়ে আনতেই পুতিনের এমন পরিকল্পনা। নতুন মুদ্রা চালু হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে পশ্চিমাদের প্রভাব একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়বে। কারণ, বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির চারটি দেশই ব্রিকসের সদস্য। ফলে নিজেদের মধ্যে ডলার ছাড়া অন্য মুদ্রা দিয়ে লেনদেন করলে বিশ্ববাজারে অনেকটাই ডলারের আধিপত্য হ্রাস পাবে। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, জোটটির নতুন মুদ্রা ডলারের থেকে অধিকতর স্থিতিশীল হবে। ফলে, ডলার-নির্ভর দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত থেকে অনেকটাই রক্ষা পাবে। সেই সঙ্গে সৌদি আরবের ব্রিকসে যোগদান ভূ-রাজনীতির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটবে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
