কৃষি অর্থনীতিবিদ ও খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. গোলাম রসুল। তিনি বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকার অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। বর্ষায় কৃষির প্রস্তুতি, বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দসহ নানা বিষয়ে তিনি দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সহ-সম্পাদক সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : আমাদের কৃষিতে বর্ষার তো বিশেষ অবদান আছে। এবার বর্ষা মৌসুম শুরু হয়েছে। বর্ষাকালীন কৃষির প্রস্তুতি কেমন দেখছেন? কৃষকদের এ সময় যে সহায়তা পাওয়ার কথা সরকারের কি তেমন প্রস্তুতি আছে?
ড. গোলাম রসুল : আমাদের খাদ্য উৎপাদনে অবশ্যই বর্ষার বৃষ্টি একটা বিরাট উপাদান। আমাদের কৃষি তো অনেকটাই প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। এই সিজনে, আউশ ধান যেটা, যদি বৃষ্টি হয় তাহলে আলাদা ইরিগেশন ছাড়াই হয়। এই বছর বৃষ্টি শুরু হয়েছে একটু দেরিতে। আউশের প্রস্তুতি মাত্র শুরু হয়েছে। এখন বীজতলা তৈরি এবং এ সময়ের কৃষিকাজের জন্য সরকারের বিশেষ কোনো প্রস্তুতি তো দেখছি না। সরকারের যেসব সাপোর্ট নরমালি আছে, বিশেষত ইনফরমেশন সার্ভিস সেগুলো চলছে। কিন্তু বিশেষ কোনো উদ্যোগ এখনো চোখে পড়েনি। হতে পারে সবাই ওয়েট করছে বর্ষার গতি-প্রকৃতি বুঝতে। মানে বন্যা-টন্যা হয় কি না। আমাদের নর্থ বেঙ্গলে তো বন্যার আভাস ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে।
দেশ রূপান্তর : কয়েকদিন আগেই সরকারও বন্যার সতর্কীকরণ বার্তা দিয়েছে...
ড. গোলাম রসুল : হ্যাঁ। তবে যেটা বলতে চাইছি, আমাদের আউশের উৎপাদন কিন্তু এখন আগের তুলনায় অনেক কম। আমরা যদি কম্পেয়ার করি আমাদের টোটাল এগ্রিকালচারের যে প্রডাকশন আছে সেখানে আউশ ধান আগে একটা বড় রোল প্লে করত। এখন সেটা অনেক কমে গেছে। আমার মনে হয় সেটা টেন পারসেন্ট হয়ে গেছে এখন। অলমোস্ট ফিফটি পারসেন্ট হয়ে গেছে বোরো উৎপাদন। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে আমন। সেটা অবশ্য পরে আসবে। এখন আমাদের প্রস্তুতিটা হচ্ছে আউশের জন্য। তো, সেই প্রস্তুতিটা আমি মনে করি ইনিশিয়াল স্টেজে আছে।
দেশ রূপান্তর : বর্ষা মৌসুমে কৃষককে সরকার কী ধরনের সহায়তা দিতে পারে?
ড. গোলাম রসুল : বীজ উৎপাদনে সরকারের একটা সহায়তা আছে। ভালো মানের বীজ উৎপাদন ও বিতরণ করা। এক্ষেত্রে বর্ষা মৌসুমের একটা সমস্যা হচ্ছে বন্যা প্রেডিক্ট করা যায় না। দেখা গেল সহসাই বন্যার পানি চলে আসে। এ সময় কৃষকরা সাফার করে মূলত বীজতলা নিয়ে। দেখা গেল কৃষক বীজতলা তৈরি করেছে কিন্তু বন্যার পানি ঢুকে সেটি নষ্ট হয়ে গেল। বীজতলা নষ্ট হলে তো কৃষকের প্রডাকশনটাই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে এই সিজনটা আমাদের জন্য আনসার্টেইন আর কি। এই অনিশ্চয়তার কারণেই কৃষকরা এখন আউশ উৎপাদন থেকে সরে যাচ্ছে। তারা বোরোতে বেশি উৎসাহ পাচ্ছে। কারণ বোরো উৎপাদনে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা যায় বেশি। সেই হিসেবে বর্ষা কৃষকদের জন্য ভালনারেবল সিজনও বটে। একদিকে যেকোনো সময় বন্যা হয়, অন্যদিকে বৃষ্টি কখনো হয় কখনো হয় না। সব মিলিয়ে প্রডাকশনের ক্ষেত্রে সিজনটা অনিশ্চয়তায় ভরা।
দেশ রূপান্তর : এক্ষেত্রে সরকার কী করতে পারে।
ড. গোলাম রসুল : এক্ষেত্রে সরকার এই অনিশ্চয়তা কমিয়ে আনতে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে কৃষকদের সচেতনা বৃদ্ধি ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে সক্রিয় হতে পারে। পাশাপাশি বীজতলা তৈরিতে ও ভালো বীজ সরবরাহ করে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া কৃষকের কাছে বিকল্প কী আছে তা পৌঁছে দেওয়া ও সেটার খোঁজ দিতে পারে সরকার। আমাদের দেখতে হবে বন্যা হলেও যেসব শস্যের ক্ষতি হয় না, এমন কী আছে। সেগুলোর খোঁজ জানাতে হবে কৃষককে। আমার মনে হয় না সরকারের এসব উদ্যোগ আছে।
দেশ রূপান্তর : কিছুদিন আগে বাজেট ঘোষণা হলো। তো এবারের বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ড. গোলাম রসুল : আমরা বলি যে কৃষি আমাদের প্রাইম সেক্টর। মেইন সেক্টর। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের ইকোনমির জন্য, খাদ্য নিশ্চয়তা বলেন আর খাদ্য নিরাপত্তা বলেন, নিউট্রিশন বলেন, আমাদের এমপ্লয়মেন্ট বলেন... যে কোনো দিক দিয়েই বলেন, কৃষির গুরুত্ব আপনি কমাতে পারবেন না। যদিও আমাদের জিডিপিতে কৃষির কন্ট্রিবিউশন কমে আসছে কিন্তু আমাদের টোটাল শ্রমশক্তির এখনও ৪০ শতাংশ এমপ্লয়মেন্ট কৃষিতে। পাশাপাশি কৃষির সামাজিক কন্ট্রিবিউশনও অনেক। কেবল খাদ্য নিরাপত্তা না, নিউট্রিশন বা এমপ্লয়মেন্ট না, কৃষির পরিবেশগত বেনিফিটও আছে। বাংলাদেশের যে কৃষি, এটার বেশিরভাগই ফ্যামিলি ফার্ম এগ্রিকালচার। এখানে পরিবেশগত ক্ষতি কম হয়। মোটামুটি এটা পরিবেশবান্ধব কৃষি। আমাদের ১৭০ মিলিয়ন জনসংখ্যার ছোট একটা দেশ। এত অল্প জায়গায় এতগুলো লোককে খাওয়ানোর জন্য আমাদের কৃষকদের একটা বিরাট অবদান আছে। পাশাপাশি দেখেন সারা বিশে^ই কৃষির প্রতি একটা আলাদা সাপোর্টও নজর দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের এবারের বাজেট যদি আমরা দেখি আমার কাছে একটু হতাশার মনে হচ্ছে।
এবার কৃষিতে বাজেটের অঙ্ক বাড়লেও ভর্তুকি ও প্রণোদনা কমে গেছে। এবার বরাদ্দ হচ্ছে ৪৩৪৮ কোটি টাকা। এটা আমাদের খাতওয়ারি যে বরাদ্দ আছে তার মাত্র ২.১০ হচ্ছে কৃষিতে। আমি এতে একটু অবাকই হলাম।
দেশ রূপান্তর : কারণ কি মনে হয় আপনার?
ড. গোলাম রসুল : আমার মনে হচ্ছে আইএমএফের যে ভর্তুকি কমানোর যে চাপ আছে, সরকার বোধ হয় সেজন্য গত বছরের যে ভর্তুকি ছিল সেটা কাট করার প্ল্যান করছে। এজন্য কৃষি খাতের প্রণোদনা ও ভর্তুকি বরাদ্দ প্রায় ৯১৬০ কোটি টাকার মতো কমে গেছে। এটা আমার কাছে খুবই হতাশার মনে হয়েছে। দ্বিতীয়ত আপনি যদি বাজেটটা দেখেন, বরাদ্দের সিংহভাগই প্রায় ৯৫ শতাংশই হলো অপারেটিং বাজেট। মানে হচ্ছে বেসিক্যালি স্টাফদের বেতন দেওয়াতে ব্যয় হবে। কিন্তু কৃষি সেক্টরকে ট্রান্সফর্ম করার জন্য, ডেভেলপ করার জন্য যে বরাদ্দ দেওয়ার দরকার সেটা খুবই কম। টোটাল এগ্রিকালচার বাজেট হচ্ছে এবার ২১ হাজার কোটি টাকা, এটার টোটাল সেক্টর এলোকেশন হলো তিন ভাগে। এর মধ্যে এডিপি বাজেট হচ্ছে মাত্র ৪৩৪৮ কোটি টাকা। যা গত বছরের চেয়ে কম, আগেই বললাম। এখন টোটাল এগ্রিকালচার সেক্টর যদি আমরা চিন্তা করি এখানে লাইফস্টক, ফিশারিজ ইত্যাদি আছে, সেখানেও বাজেট কিন্তু কমে গেছে। গত বছর যেটা ছিল ৩৫ হাজারের বেশি এবার সেটা কমে বোধহয় ৩০ হাজারের মতো।
দেশ রূপান্তর : সেই করোনার সময় থেকে বিশে^ খাদ্য নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আবার এবারের বাজেটের আগে থেকেই আইএমএফের শর্তে বাজেটে কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানোর কথাও শুনে আসছিলাম। সরকার কি বাজেটে খাদ্য নিরাপত্তার চেয়ে আইএমএফের শর্ত পূরণে বেশি মনোযোগ দিয়েছে?
ড. গোলাম রসুল : আমার তো তাই মনে হচ্ছে। আপনি যদি টোটাল সাবসিডি দেখেন, দেখবেন যে ভর্তুকি কিন্তু বাড়ছে। বিশেষ করে পাওয়ার সেক্টরের কারণে এই সাবসিডি বাড়ছে। কৃষি সেক্টরে গত বছর সাবসিডি বেশি ছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে। কিন্তু কৃষিতে সারা বিশ্বেই কিন্তু সাবসিডি দিচ্ছে। সে আপনি উন্নত বলেন আর অনুন্নত বলেন। পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের কথাই ধরেন। অথবা চীন, জাপান, ভিয়েতনাম দেখেন। প্রতিটি দেশই কৃষিতে ভর্তুকি দিচ্ছে। কৃষিতে সাবসিডি দেওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে এটা একটা রিকগনিশন। সমাজে
কৃষির যে বিরাট অবদান সেখানে এই ভর্তুকিটা একটা হচ্ছে সেই অবদানের একটা স্বীকৃতি দেওয়া। অন্যদিকে কৃষি খাত অন্যান্য খাতের তুলনার একটা ইউনিক চ্যালেঞ্জ ফেস করে। এটা অন্যান্য সেক্টরের মতো না।
দেশ রূপান্তর : কিছুদিন আগেও তো ফুড সিকিউরিটি বড় ইস্যু ছিল, সরকারের ওপর মহল থেকেও খাদ্য নিরাপত্তার কথা জোরেশোরেই বলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে কৃষিতে প্রণোদনা ও ভর্তুকি কমিয়ে খাদ্য নিরাপত্তাকে কম গুরুত্ব দেওয়া হলো না?
ড. গোলাম রসুল : হ্যাঁ, আমার মনে হয় বাজেটে এই খাদ্য নিরাপত্তার ইস্যুটা আরেকটু সতর্কতার সঙ্গে দেখতে পারত সরকার। দেখেন আমাদের যে এখন খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে বিশেষ করে ধান উৎপাদনে আমরা বেশ ভালো করছি। কিন্তু গমে আমরা পিছিয়ে গিয়েছি। আমাদের প্রচুর গম আমদানি করতে হচ্ছে, প্রায় ৯০ শতাংশ। অন্যান্য কৃষিপণ্যের কথাও যদি বলেন, এই যে চিনির বাজার যে এখন এত অস্থির। ঈদের আগে চিনির দাম বেড়ে গেল। ভেজিটেবল অয়েল, ডিম ইত্যাদি মিলিয়ে আমাদের কিন্তু বিরাট পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানি করতে হয়। গত বছর বোধ হয় ১৮ থেকে ২০ লাখ মেট্রিক টন আমদানি করতে হয়েছে। তো এই কৃষিপণ্য আমদানিতে সরকারের বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় হয়। এখন করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সারা বিশে^ই একটা প্রবণতা দেখা গেছে যে নিজের দেশে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে সবাই। আগে যে প্রবণতা ছিল যে ডোন্ট ওরি, টাকা থাকলে কিনে আনা যাবে সেই আইডিয়া থেকে সব দেশই সরে এসেছে। পাশের দেশ ভারতও আত্মনির্ভর
কৃষি অর্থনীতির কথা বলছে। সেটা হচ্ছে আমি যদি আমার উৎপাদন বাড়াতে পারি তাহলে অন্য দেশের ওপর আমার নির্ভরতাটা কমবে। আমার অনিশ্চয়তা কমবে, খাদ্য নিরাপত্তা বাড়বে। এখন বাংলাদেশের মতো বড় জনসংখ্যার দেশে খাদ্যের নিশ্চয়তা বড় অংশে নির্ভর করে আমদানির ওপর। এক্ষেত্রে ধানের পাশাপাশি আরও দুই/তিনটা কৃষিপণ্যে যদি আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারতাম তাহলে ভালো হতো। আমাদের যেটা হয়েছে, কৃষি সেক্টরে কিছু ক্ষেত্রে আমরা উৎপাদনে ভালো করেছি। মাছ, ফলের উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদনের পরের যে অবস্থা, প্রডাকশন থেকে কনজাম্পশনের মাঝখানের যে অবস্থা সেখানে আমাদের অনেক কিছু করা দরকার। স্টোরেজ দরকার, প্রক্রিয়াজাতকরণ দরকার, মার্কেটিং দরকার। কৃষিকে আমরা যদি আরও প্রোডাকটিভ করতে চাই তাহলে আমাদের ফোকাস দিতে হবে উৎপাদনের পরের প্রক্রিয়াগুলোতে, ট্রান্সফরমেশনের দিকে। এই যে এখন আমের সিজন চলছে, আপনি রাজশাহীতে যান, দেখবেন সেখানে যে আম ২৫/৩০ টাকা কেজি, সেটা ঢাকাতে ৮০/৯০ টাকা। এই বাড়তি টাকা কে পাচ্ছে, যিনি আমবাগান করছেন তিনি তো এই দাম পাচ্ছেন না। কারণ কী? আমচাষি মার্কেটিং করতে পারছেন না, ফলে মাঝখানে তৃতীয় পক্ষ সুবিধা নিচ্ছে। আবার আমচাষি যদি তার আম সংরক্ষণ করতে চান, সেখানে স্টোরেজের অভাব। আমজাত পণ্য তৈরির সুবিধাও আমাদের তেমন ডেভেলপ করেনি। ফলে সিজনের পণ্য সিজনেই কম দামে হলেও ছেড়ে দিতে হচ্ছে, মাঝখানে অন্য কেউ লাভ করছে। কিন্তু চাষি মূল্য পাচ্ছে না, আবার জনগণকে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে, সেই লাভটা করছে আরেকজন। ফলে আমাদের এখন উৎপাদন পরবর্তী ডেভেলপমেন্ট বাজেটের দিকে যেতে হবে।
