রাজনীতির সঙ্গে কূটনীতিও উথাল-পাথাল। আউলা-ঝাউলা অবস্থা সবখানে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, ক্ষমতাহীন বিরোধী দল বিএনপি, সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি থেকে জামায়াত-হেফাজত সব দলই মাথা দিয়েছে এ উত্তাল কূটনীতিতে। ইনু-মেনন থেকে নূর-হিরো আলমও বাদ নেই। বাংলাদেশের স্থানিক রাজনীতি আর বৈশ্বিক কূটনীতির স্বভাব-বৈশিষ্ট্য অনেকটা সমান্তরালে চলে এসেছে। শত্রু-মিত্রের সংজ্ঞা বদলে গেছে। সকালের বন্ধু বিকেলে শত্রু হয়ে যাচ্ছে। সময়ে সময়ে বদলে যাওয়া কথা ও পরিস্থিতির পক্ষে যুক্তিরও অভাব থাকছে না। ‘স্নায়ুযুদ্ধের সময় সব জায়েজ’ পুরনো তত্ত্বের নতুন সংস্করণে র’, মোসাদ, আইএসআই, সিআইএ মিলিয়ে বাজিকরী কাণ্ডকারখানা। যে যেখানে পারছেন মাথা ঢুকিয়ে সুবিধা হাতাচ্ছেন। কে যে কাকে ফাঁসাচ্ছেন। নিজের বেলায় দাওয়াত, অন্যের ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্রের অপবাদ।
বছর কয়েক আগেও নির্বাচন ঘনিয়ে এলে নেতাদের পীর-মুর্শিদ, মাজার-দরগায় যাতায়াত বাড়ানোর প্রবণতা ছিল। মাঝেমধ্যে মসজিদে ছুটে যাওয়া, কবর জিয়ারতসহ মানুষের সঙ্গে মোলাকাত, হাসিমুখে গাল কাত করার ক্রিয়াকলাপও চলত। মানুষ বুঝে নিত নির্বাচন আসন্ন। এবার সেখানেও ভিন্নতা। পীর-মুর্শিদ, মাজার-দরগা, মসজিদ-কবরের বদলে বিভিন্ন দলের নেতারা ছুটছেন বিভিন্ন দূতাবাসে। বিদেশি মান্যবরদের সিডিউল না পেলেও তাদের দুয়ারে-উঠানে ঘুরছেন। সাক্ষাৎ পেলে মোলাকাত করতে ধরলে হাত আর ছাড়েন না। সম্ভব হলে সেটার ছবি ধারণ করে নানান জায়গায় তা দেখিয়ে নিজের ওজন বাড়ানোর চেষ্টা।
এই আজব অবস্থার মধ্যে দেশীয় ঘটনা বা ইস্যুর চেয়ে আন্তর্জাতিক বিষয়াদির ভ্যালু বাড়বাড়ন্ত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বা চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং বাংলাদেশ নিয়ে কী ভাবছেন সেই খবর রচনাও বাদ যাচ্ছে না। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকেও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। মুখে একটু আওয়াজ দিলেই হয়ে যাচ্ছে। একদা নকল মালামালের মোকাম কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরার প্রোডাক্টের মতো রমরমা অবস্থা। বাজারে ছাড়লেই মুড়ি-মুড়কির মতো চলতে থাকে। জিঞ্জিরার সেই নকল মালের অপবাদ ঘুচে ঘুরে দাঁড়িয়েছে যদিও। তবে যখন সেই অপবাদ ছিল তখন মালে ভেজাল-নকল জানার পরও এর খরিদদারে কমতি হতো না। সেই অবস্থা এখন দেশে রাজনীতির ইস্যুর বাজারের। হোক তা স্থানিক বা আন্তর্জাতিক। বাংলাদেশকে জড়িয়ে বা প্রাসঙ্গিক রেখে ছাড়তে পারলে সুপার-ডুপার হিট। মানুষ গিলবেই। কম-বেশি বাজার পেয়েছে সেন্টমার্টিন ইস্যুও। এ নিয়ে রাজনীতি মোটামুটি জমেছে। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সেন্টমার্টিন নিতে চায় মর্মে তুড়িটা প্রথম মেরেছিলেন এ সরকারের রাজনৈতিক মিত্র, ওয়াকার্স পার্টির নেতা সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। সংসদে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি ‘রেজিম চেঞ্জের’ কৌশলের অংশ উল্লেখ করে বলেন, তারা সেন্টমার্টিন চায়, কোয়াডে বাংলাদেশকে চায়। বর্তমান সরকারকে হটানোর লক্ষ্যে তারা সব কিছু করছে।
মেননের কথায় তেমন জমেনি। পরে প্রধানমন্ত্রীর মুখ দিয়ে প্রকাশ পাওয়ায় এর ভ্যালু বেড়ে যায়। তিনি বলেন, ‘বিএনপি গ্যাস বিক্রি করার মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। এখন তারা দেশ বিক্রি করবে, নাকি সেন্টমার্টিন দ্বীপ বিক্রি করার মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসতে চায়? আমি দেশের কোনো সম্পদ কারও কাছে বিক্রি করে ক্ষমতায় আসতে চাই না। সেন্টমার্টিন দ্বীপ বা আমাদের দেশ কাউকে লিজ দিয়ে ক্ষমতায় থাকতে চাইলে, আমাদের কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু আমার দ্বারা সেটা হবে না’।
বর্তমান নাজুক সময়ে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধকালীন বিভক্ত পৃথিবীর স্নায়ুর উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সেখানে সেন্টমার্টিনও সাবজেক্ট। স্থানীয়রা একে ডাকে নারিকেল জিঞ্জিরা নামে। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সেন্টমার্টিনে হাজার দশেক মানুষের বাস। টেকনাফ উপজেলা ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের আয়তন ১ হাজার ৯৭৭ একর।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেন্টমার্টিন দ্বীপে নেভাল বেস স্থাপন করবে বলে মিডিয়ায় প্রচার আছে। যদিও বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস তা অস্বীকার করেছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপ আদৌ নৌঘাঁটি স্থাপন করার উপযোগী কি না তা নিয়েও কথা উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব এবং পশ্চিম উপকূল জুড়ে ৪০টিরও বেশি নৌঘাঁটি আছে। সেন্টমার্টিনের আয়তন ও অবস্থান সেগুলোর ধারেকাছেও নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌঘাঁটিতে যে পরিমাণ ভূমির প্রয়োজন হয় এবং জনবল সার্বক্ষণিক কাজ করে তার তুলনায় সেন্টমার্টিনের ১৯৭৭ একরের প্রবাল দ্বীপ নিতান্তই অপ্রতুল।
এরপরও সেন্টমার্টিন দ্বীপ নিয়ে রাজনীতির ভূত কাঁধে চেপেছে কি না তা আগামী দিনগুলোতে বোঝা যাবে। বছর কয়েক আগে রাজনীতির মাঠে বিএনপির তোলা আওয়াজ ছিল, বাংলাদেশের ফেনী পর্যন্ত ভারত নিয়ে যাবে। সেই আওয়াজও মাঠে মারা পড়েছিল। এখন সে রকম আওয়াজের আইটেম কক্সবাজারের নারিকেল জিঞ্জিরা। কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা পর্যন্ত আসেনি। যুক্তি তত্ত্ব দিয়ে ছাড়তে পারলে বাজার পেতেও পারে।
ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের উচ্চতা অনেক বেড়েছে সত্য। তাই বলে দেশকে সেই জিঞ্জিরা পর্যায়ে নামিয়ে আনা কতটা শোভন, প্রশ্ন থেকে যায়। যেখানে বাংলাদেশ এখন বিশ্ব কূটনীতির শরিক, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে চীন, পাকিস্তানসহ আশপাশ উত্তাল। সেখানে আমরা দেশকে টেনে নিচ্ছি কোন তলানিতে। মার্কিন ও ভারতীয় কর্মকর্তারা মোদির এ সফরকে উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেছেন, যা মার্কিন-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উন্নতির পরিবেশ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের কাছেও চীন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। চাইনিজ মাল জিঞ্জিরার মালের মতো কম টিকলেও এ অঞ্চলে ফ্যাক্টর। যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতকে চীনের সঙ্গে মোকাবিলা করতে একটি ভূ-রাজনৈতিক প্রয়োজনের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। চীনকে নিয়ন্ত্রণে নিতে যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টার কমতি করছে না। কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের কূটনৈতিক তত্ত্বে বাংলাদেশ আছে বা থাকতে চায় সবদিকেই। এ চেষ্টা করতে গিয়ে কখনো কখনো তালগোল পেকে যাচ্ছে। চীনও বাংলাদেশকে পাশে রাখতে চায়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের উন্নয়নের বন্ধুত্ব। আবার বিএনপিকেও এক দম খারিজ করে দেয় না। পাত্তা দেয় দুদিকেই।
চীন তার কূটনীতির চিকন পথে ঢাকায় দূতাবাসের মাধ্যমে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ফল, স্ন্যাক্স ও বিস্কুট উপহার পাঠিয়েছে। এর আগে ২০২০ সালে খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে ঢাকার চীনা দূতাবাস শুভেচ্ছা জানিয়ে উপহার সামগ্রী পাঠিয়েছিল। ওই সময়ে উপহার সামগ্রী দেওয়ার পাশাপাশি দূতাবাস কর্মকর্তারা বিএনপি চেয়ারপারসনের আরোগ্যও কামনা করেন। খালেদা জিয়াকে উপহার পাঠিয়ে নুতন কী বাতা দিল চীন? এ প্রশ্ন ঘুরছে বিশেষ বিশেষ জায়গায়। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে উপহার পাঠানো যায় কি না এ প্রশ্নও রয়েছে। এ প্রশ্নের জবাবও আছে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চীনের সোনার নৌকা উপহার পাঠানোর মধ্যে। বাস্তবতা হচ্ছে, প্রোডাক্ট ঠুনকো হলেও বাংলাদেশের জন্য চীন খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। জ্ঞান অর্জনের জন্যও চীন যেতে হয়। তা তারা আমাদের মহান স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার ঐতিহাসিক সত্যতার পরও। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বীকৃতি না দিলেও। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের বদান্যতায় সদস্যপদ লাভ করে প্রথম যে ভেটো দেয় তার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ যাতে সদস্যপদ না পায়। এরপর ১৯৭৩ সালে আরেকবার ভেটো দিয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ রুখে দেয় চীন।
১৯৭৪ সালে ভারত থেকে বন্দি পাকিস্তানি সেনারা ও বিশেষ করে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী ফিরে যাওয়ার পরই কেবল চীন জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তিতে ভেটো দেওয়া থেকে বিরত থাকে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ৩১ আগস্ট চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। খন্দকার মোশতাকের সরকারের প্রতি আস্থার স্বীকৃতি দিতেও সময় নেয়নি। পরে ভিন্ন উচ্চতায় বন্ধুত্ব হয় জিয়াউর রহমান ও বিএনপির সঙ্গে। এজন্য সব সময় ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ার আগুন চক্ষু মোকাবিলা করতে হয় বিএনপিকে। এর বিপরীতে গত দশকে বিস্ময়করভাবে বেনিফিশিয়ারি আওয়ামী লীগ। করোনার পর চীনা সরকারের দেওয়া সহায়তার প্যাকেটে লেখা থাকত ‘ভালোবাসার নৌকা পাহাড় বইয়া যায়’। এর আগে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূত ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর সোনার নৌকা নিয়ে ছুটে যান শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানাতে। সেখানে হালে ছন্দ-তাল-লয়ে হেরফেরের কিঞ্চিৎ নমুনা। সেই দৃষ্টে কেবল চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া নয়; উগান্ডা-ঘানার আশীর্বাদ খুঁজতেও কার্পণ্য হচ্ছে না বাংলাদেশের নানাজনের।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
