গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ী ইউনিয়নের মিটালু গ্রামে বসবাস করেন টঙ্গীতে নিহত শ্রমিক নেতা শহিদুল ইসলামের স্ত্রী ও নাবালক দুই ছেলে। তার স্ত্রী কাজলী বেগম ক্যানসার আক্রান্ত। বড় ছেলে সাদিকুল ইসলাম (১৬) এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। আর ছোট ছেলে ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ (৫) প্রথম শ্রেণিতে পড়ে স্থানীয় একটি স্কুলে। প্রায় তিন মাস ধরে স্ত্রী ক্যানসার আক্রান্ত। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন শ্রমিক নেতা শহিদুল ইসলাম। তার মৃত্যুর পর দুটি সন্তান নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কাজলী বেগম। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, তাদের লেখাপড়া, ভবিষ্যৎ আর নিজের চিকিৎসা নিয়ে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত পুরো পরিবারটি। নিহত শহিদুলের বড় তিন ভাইয়ের মধ্যে দুজন স্থানীয় এসিআই কোম্পানিতে স্বল্প বেতনে চাকরি করেন। বড় ভাই বয়সের ভারে ন্যুব্জ। বর্তমানে তারাই দেখাশোনা করছেন শহিদুলের স্ত্রী-সন্তানদের। শহিদুলের নিজেদের ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনো জমি নেই। আয় উপার্জনেরও নেই কোনো পথ।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে শ্রীপুরের রাজাবাড়ী ইউনিয়নের মিটালু গ্রামে শহিদুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ক্যানসার আক্রান্ত অসুস্থ কাজলী বেগম বিছানায় শুয়ে আছেন। দুই ছেলে মায়ের পাশে বসে আছে। সাংবাদিক আসার কথা শুনে উঠে বসেন।
কাজলী বেগম জানান, ২৫ জুন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে স্বামী শহিদুল কাঁঠালের পিঠা ও আম খেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান। রাত ৮টার দিকে স্বামীকে ফোন দিলে তিনি তাকে জানান, টঙ্গীতে একটি কারখানায় আছেন এবং সেখানে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে সমস্যা হয়েছে। বাসায় ফিরতে একটু দেরি হবে। তখন অনেক মানুষের কোলাহল শোনা যাচ্ছিল। পরে রাতে তিনি তার স্বামীর মৃত্যুর খবর পান। কাজলী জানান, ২০০২ সালে শহিদুলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তখন তারা ঢাকায় মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় বসবাস করতেন। কাজলী বেগমও আগে পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। তিনি বাংলাদেশ মুক্ত গার্মেন্টস ফোডারেশনের সদস্য ও কোষাধ্যক্ষ ছিলেন।
কাজলী বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার স্বামীকে হারিয়ে সংকটের অথৈ সাগরে পড়েছেন। নিজে তিনটি কেমোথেরাপি দিয়েছেন। আরও দুটি বাকি আছে। তাকে দিতে হবে ২৫টি রেডিওথেরাপি। এর খরচ বহন করার মতো সামর্থ্যও তার নেই। এমনকি তার ছেলেদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মতো অবস্থাও নেই। স্বামীর মতো তিনিও মৃত্যুর দিকে যাচ্ছেন।
কাজলী জানান, তার স্বামী নিহত হওয়ার পরদিন অনেকেই তার বাড়িতে এসেছিলেন। এরপর থেকে কেউ তার খোঁজখবর নিচ্ছে না। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি কল্পনা আক্তার খোঁজখবর রাখছেন। তাকে বিভিন্নভাবে সান্ত¡না দিচ্ছেন। প্রশাসন, কারখানা মালিকপক্ষ বা দলীয় কোনো লোকজন তাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন না। নিহত শহিদুল ইসলাম রাজাবাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ২ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
কাজলী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তার স্বামী হত্যা বিচার দাবি করেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও স্বজনহারা, তিনি বোঝেন স্বজনহারা মানুষের কী ব্যথা।
এদিকে শ্রমিক নেতা শহিদুল ইসলাম হত্যাকা-ের ঘটনায় একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মামলার বাদী বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি কল্পনা আক্তার। তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতেই শহিদুলকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যার ঘটনায় কামরুল ইসলাম নামে একজনকে আসামি করতে চেয়েছিলাম। পুলিশ সে নামটি বাদ দিয়েছে। পুলিশ তখন বলেছিল, কামরুলকে আসামি করা হলে মামলা অন্যদিকে মোড় নেবে। অথচ যে কারখানায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে শ্রমিকদের অধিকার আদায় করতে গিয়ে শহিদুল ইসলামকে খুন হতে হলো, সে কারখানায় ঝুটের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন কামরুল ইসলামের ছোট ভাই আমির হোসেন ও ম্যানেজার হানিফ। পুলিশ চাইলেই তাদের গ্রেপ্তার করতে পারে। কিন্তু এরপরও আর কোনো আসামি ধরা পড়ছে না। আসামি ধরার ব্যাপারেও থানা পুলিশের তৎপরতা হতাশাজনক।
ঈদের আগে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা না দেওয়ায় গত ২৫ জুন রাত সাড়ে ৯টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীর সাতাইশ বাগানবাড়ী এলাকার ‘প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার লিমিটেডে’ যান শহিদুল। সেখানে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে কারখানা থেকে বেরিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর তার ওপর হামলা হয়। গুরুতর আহত শহিদুলকে গাজীপুরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই রাতেই তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় ২৬ জুন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি কল্পনা আক্তার বাদী হয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় ছয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও সাতজনকে আসামি করা হয়।
মামলায় প্রধান আসামি করা হয় মো. মাজাহারুল নামে একজনকে। মামলার পর ওইদিন রাতেই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মাজাহারুল বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের টঙ্গী পশ্চিম থানার সাধারণ সম্পাদক। এ মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রিপন ওই শ্রমিক সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক। মামলায় সোহেল, রাসেল ও আকাশ নামে সংগঠনটির আরও তিন নেতাকেও আসামি করা হয়েছে। তাদের বাইরে ‘ম্যানেজার হানিফ’ নামে একজনকে আসামি করা হয়। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয় পাঁচ-সাতজনকে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও কারখানার শ্রমিক সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন রাত ৯টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের শান্ত করে কারখানা থেকে বের হন শহিদুল ও তার সঙ্গের নেতারা। কারখানার মূল ফটক থেকে একটু সামনে যেতেই হানিফের সঙ্গে দেখা হয় শহিদুলের। তাদের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে কথা হয়। এরপর কিছুক্ষণের মধ্যেই হানিফ লোকজন ডেকে তার ওপর হামলা চালান।
পুলিশ ও শ্রমিক নেতাদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ : শহিদুল হত্যাকা-ের ঘটনায় পুলিশ ও শ্রমিক নেতারা পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক উৎপল কুমার বলেন, শহিদুল শ্রমিকদের পক্ষে কাজ করার জন্য ওই কারখানায় গেলে বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের নেতাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এর জেরে শহিদুলের ওপর হামলা চালানো হয়।
পুলিশের এ কথা মানতে নারাজ বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের নেতারা। ওই সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি তুহিন চৌধুরী বলেন, দুই সংগঠনের মধ্য কোনো বিরোধ নেই। আমরা সবাই শ্রমিকদের অধিকারের জন্য কাজ করি। এখানে কোনো ক্ষমতার বিরোধ নেই।
শহিদুল হত্যাকা-ের ঘটনার পর টঙ্গী পশ্চিম থানায় সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি কল্পনা আক্তার বাদী হয়ে যে মামলাটি করেন সেখানে আসামি হিসেবে যে ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের পাঁচজনই বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন নামে অন্য একটি শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে মামলার প্রধান আসামি মো. মাজাহারুল বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের টঙ্গী পশ্চিম থানার সাধারণ সম্পাদক। আকাশ আহমেদ একই সংগঠনের গাজীপুর জেলার সহসভাপতি। রিপন ওই শ্রমিক সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক। সোহেল ও রাসেল এ সংগঠনেরই কর্মী।
কল্পনা আক্তার অভিযোগ করেন, ওই হামলাকারীরা মালিকপক্ষের ভাড়াটে সন্ত্রাসী। তারা যে পরিচয়েই হোক, মালিকপক্ষের হয়েই শহিদুলের ওপর হামলা চালিয়েছেন। শহিদুলের হত্যার পর পুলিশের ভূমিকায় তিনি অসন্তুষ্ট। তিনি বলেন, ভূমি ব্যবসায়ী মো. কামরুল ইসলামের কাছ থেকে জমি কিনে তাতে পোশাক কারখানাটি গড়ে তোলেন মো. সাইফ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি। কামরুলের ভাই আমির হোসেন ওই কারখানার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। শহিদুল হত্যা মামলায় কারখানার মালিক সাইফ উদ্দিন ও কামরুলের নাম নেই। তবে কল্পনা আক্তার বলেছেন, মালিকপক্ষের যোগসাজশেই শহিদুলের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। কিন্তু পুলিশ সেদিকে নজরই দিচ্ছে না।
বকেয়া বেতনের বিষয়টি নিয়ে মধ্যস্থতা করতে যাওয়া শহিদুলসহ তিন শ্রমিক নেতার ওপর হামলায় নেতৃত্ব দেন ‘হানিফ ম্যানেজার’ নামে এক ব্যক্তি। তিনি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কামরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
এ ব্যাপারে কামরুল ইসলাম বলেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ মিথ্যা। হানিফ নামে তিনি কাউকে চেনেন না বলেও দাবি করেন। তিনি বা তার কোনো লোক ঝুট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন। মালিক-শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে সমস্যা হয়েছে। এখানে তার কোনো ভূমিকা নেই। তিনিও শহিদুল হত্যার বিচার দাবি করেন।
কারখানার মালিক মো. সাইফ উদ্দিন জানান, শহিদুলের মৃত্যুর ঘটনায় তার কারখানার কেউ জড়িত নন। তার প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও খ্যাতি নষ্ট করার জন্য কোনো অসাধু চক্র বা কুচক্রী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঘটনাটি ঘটিয়ে থাকতে পারে। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি মো. শাহ আলম বলেন, এ ঘটনায় কারখানার মালিক সাইফ উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, এ হামলার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তাছাড়া কামরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে ছিলেন না, তিনি কারখানার সঙ্গে যুক্ত নন। মামলার বাদী আসামি হানিফের নামও জানতেন না। পুলিশই হানিফের নাম তাদের জানিয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। পুলিশের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। আশা করি শিগগিরই সব আসামি ধরা পড়বে।
