শরণার্থী প্রশ্নে ইউরোপ কতটা মানবিক?

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৩, ১০:৩৩ পিএম

অনেক বছর ধরে শরণার্থীদের ঢল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ২০১৫ সালে মূলত সিরিয়া যুদ্ধের কারণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ইউরোপে প্রবেশ করার পর থেকে ইইউ দিশাহারা হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগর উপকূলবর্তী দেশগুলোর জন্য সে সংকট বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অথচ শরণার্থীদের প্রশ্নে ইইউ এখনো কোনো সাধারণ নীতি সম্পর্কে ঐকমত্যে আসতে পারেনি। পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশ শরণার্থীদের বিরোধিতা করে আসছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও সুইডেনের মতো দেশ একাই শরণার্থীর বোঝা কাঁধে নিতে চাইছে না। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের রুটে ২০২১ সালের চেয়ে ২০২২ সালে ১১ শতাংশ বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। ২০২২ সালে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের সমুদ্র ও স্থল রুটে ৩ হাজার ৭৮৯ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মারা যাওয়ার তথ্য তারা নথিভুক্ত করেছে। আইওএমের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আঞ্চলিক পরিচালক ওথমান বেলবেইসি বলেন, অঞ্চলটির বিভিন্ন রুটে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের এই উদ্বেগজনক মৃত্যুর বিষয় তাদের নিরাপত্তা-সুরক্ষা বাড়াতে অবিলম্বে মনোযোগের পাশাপাশি সমন্বিত প্রচেষ্টার দাবি রাখে। ভূমধ্যসাগর ক্রমেই হতে চলেছে সলিলসমাধির সাগর। আইওএম জানায়, ২০১৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ২০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন।

১৪ জুন গভীর রাতে গ্রিসের উপকূলে আবারও ডুবেছে প্রায় সাড়ে ৭০০ শরণার্থী বোঝাই একটি জাহাজ। উদ্ধার করা গেছে মাত্র ১০৪ জনকে। সাগরে সলিলসমাধি ঘটেছে পাঁচ শতাধিক মানুষের। এ ঘটনার পর গ্রিসে তিন দিন রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা আর ইউরোপের কিছু নেতার লোক দেখানো দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আর কিছু শোনা গেল না।  এর ঠিক এক সপ্তাহ আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউরোপে শরণার্থীদের প্রবেশের বিষয়ে কড়া আইন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইইউ সদর দপ্তর থেকে বরাবরের মতো এ ঘটনার জন্য মানব পাচারকারীদের শায়েস্তা করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই শরণার্থীরা কেন তাদের দেশ ছেড়ে বিপৎসংকুল পথ পাড়ি দিচ্ছেন, সেই উত্তর তারা খুঁজছে না। সেই ১৫০০ শতাব্দীর শেষ দিক থেকেই ইউরোপীয়রা নিজেদের অর্থনৈতিক দৈন্যদশা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় খুঁজতে সমুদ্রপথের পথিক হয়েছিলেন। বণিকের বেশে প্রবেশ করে অপরের ভূখণ্ডের মালিক হয়েছিলেন। আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা সব মহাদেশেই তারা ব্যবসা করেছেন আর অঢেল মুনাফার পাহাড় গড়ে নিজেদের দেশের চাকচিক্য বাড়িয়েছিলেন। আজ প্রায় ৫০০ বছর পর বিপরীত পৃথিবীর দারিদ্র্য, নিপীড়িত, যুদ্ধ-দাঙ্গাপীড়িত অভাবী অর্ধাহারে থাকা মানুষেরা স্বাবলম্বী মহাদেশের মানুষের কাছে একটু স্বপ্ন দেখতে চাইছেন, একটু আশ্রয় খুঁজছেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন, সেই আশ্রয়ের সলিলসমাধি ঘটছে ইউরোপের সর্বদক্ষিণে ভূমধ্যসাগরের লোনাজলে। এই মানুষদের ইউরোপে আসা রুখতে তারা নিত্যনতুন আইন তৈরি করছে।

জাহাজটি যাত্রা শুরু করেছিল মিসর থেকে। জাহাজটির বেশির ভাগ যাত্রী ছিল সিরিয়া, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের। গ্রিসে রাষ্ট্রীয় রেডিওতে কোস্টগার্ডের একজন মুখপাত্র বলেছেন, বেশির ভাগ যাত্রী সময়মতো জাহাজটি ছাড়তে পারেননি। প্রায় ১০০ শিশুসহ অনেক নারী ডেকের নিচে অবস্থান করেছিলেন। বেশির ভাগ যাত্রীর কোনো লাইফ জ্যাকেট ছিল না। বেঁচে যাওয়া ১০৪ জনকে আপাতত দক্ষিণ গ্রিসের বন্দর কালামাতায় তাঁবুতে রাখা হয়েছে। ৯ মিসরীয়কে জাহাজটির নাবিক ও মানব পাচারকারী সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রিসের বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপ্রাস গ্রিসের কোস্টগার্ডের আচরণ নিয়ে সমালোচনা করেছেন। বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি ঘটনার পরের দিন কালামাতা বন্দরে উদ্ধারকৃত শরণার্থীদের তাঁবু পরিদর্শনের সময় বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ডুবে যাওয়ার আগে সাহায্যের জন্য ডাকাডাকি করলেও উদ্ধারের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। জার্মানির ডের স্পিগেল পত্রিকাটি উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, জাহাজটি ডুবে যাওয়ার আগে সবাই চিৎকার করছিল এবং একে অপরকে ধরে রাখার চেষ্টা করছিল। ঘটনার এক দিন পরেই গ্রিসের রাজধানী এথেন্স এবং বন্দর শহর থেসালোনিকিতে অসংখ্য মানুষ ইইউ অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন মানুষ হত্যা করছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এ ঘটনায় জড়িত করার সময় এসেছে। কারণ হিসেবে তারা বলেছে, ইইউ মানবাধিকারের প্রসঙ্গে সব সময় কথা বললেও বছরের পর বছর এ ঘটনা ঘটছে।

শরণার্থীদের প্রশ্নে মূল সমস্যা অগোচরে রেখে তারা ইউরোপে নতুন শরণার্থী আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। ৮ জুন লুক্সেমবার্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো শরণার্থীদের জন্য ইউরোপে আরও কড়া নিয়ম করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ইইউ কমিশনার ইভা ইয়োহান্সসনের মতে, এই ঐকমত্য ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। তার মতে, ইইউভুক্ত দেশগুলো এখন থেকে একসঙ্গে কাজ করলে ইউরোপে আগত শরণার্থীদের সমস্যা মানবিক অথচ কঠোর পন্থায় সামলানো যাবে। শরণার্থী বিষয়ে ইইউর দেশগুলোর এই অভিন্ন সিদ্ধান্ত কতটা মানবিক, তা তাদের মুখ্য সংস্কার নীতিটি জানলেই বোঝা যাবে। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের কোনো একটি দেশের সীমান্তে কোনো শরণার্থী রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করলে প্রথমে আশ্রয়প্রার্থীকে ১২ সপ্তাহের জন্য সীমান্তবর্তী আশ্রয়শিবিরে রাখা হবে। সেখানে সেই রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন যাচাই-বাছাই করা হবে। অর্থাৎ ইইউ ঠিক করবে কোন দেশটি সমস্যাপূর্ণ বা সংকটবহুল এবং আদৌ তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার যোগ্য কি না। নয়তো ১২ সপ্তাহ পর তাকে ফেরত পাঠানো হবে।

ইউরোপের পথে সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান বা আফ্রিকার দেশগুলো থেকে কেন এত শরণার্থী জীবন বাজি রেখে নিজের জন্মভূমি ফেলে দুর্গম সাগর বা সড়কপথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপের পথে পা বাড়াল, সেই আলোচনা ইউরোপে খুব কম। এই দেশগুলোর মানুষকে বাস্তুহারা করার পেছনে ইউরোপের অনেক দেশ, আমেরিকা আর ন্যাটো জোট তাদের ভুল যুদ্ধনীতি অস্বীকার করতে পারবে না। যুদ্ধের কারণে আজকের যে মানবিক সমস্যা, তাতে তাদের দায়ভারের কথা তাদের ভাবতে হবে।

ভয়ংকর এই স্বপ্নযাত্রায় সর্বস্ব বিক্রি করে দালালদের হাতে তুলে দিচ্ছেন টাকা-পয়সা শেষ সম্বল। কেউ কেউ অবৈধ পথে স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছাতে পারলেও অধিকাংশই হন ভাগ্যাহত। ভাগ্য সহায় হলে অনেকের জায়গা হয় কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। বাকিদের কারও কারও সলিল সমাধি হয় নৌকাডুবিতে। কেউ প্রাণ হারায় অনাহারে-অর্ধাহারে, নানা রোগ-শোকে। তারপরও জীবনবাজি রেখে মৃত্যুকে হাতে নিয়ে এক মরীচিকার পেছনে ছুটছে হাজার হাজার বাংলাদেশি তরুণ। শুধু বাংলাদেশি নয়, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে শরণার্থী অভিবাসীদের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ গ্রিস। জাতিসংঘের তথ্য অনুসারে, প্রায় ৭২ হাজার শরণার্থী ও অভিবাসনপ্রত্যাশী এ বছর ইতালি, স্পেন, গ্রিস, মাল্টা ও সাইপ্রাসে গিয়েছেন। এদিকে ইউরোপের অনেক জাতিরাষ্ট্রই এখন মুখের ওপরে দরজা বন্ধ করে দিতে উদ্যত। শরণার্থীদের চাপে তাদের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে, এই ছুতো দেখিয়ে তারা চায় না কোনো শরণার্থী ইউরোপে প্রবেশ করুক। অথচ তারা নিজেদের মানবাধিকারের দর্পণ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায় বিশ্ববাসীর কাছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়ে নিজেরা মানবাধিকার ও উন্নয়নের বুলি আওড়াতে ব্যস্ত।

অথচ এসব দেশগুলোর মূল সমস্যার পেছনে ইউরোপীয়রাই দায়ী। তারা একদিকে আফ্রো-এশিয়ার এসব দেশগুলোতে অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি করে। তারপর এসব দেশ থেকে মূল্যবান খনিজ ও অন্যান্য সামগ্রী লুট করতে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে। আবার এদের কাছেই অস্ত্র বিক্রি করে নিজেরা লাভবান হয়। এশিয়া ও আফ্রিকার এসব অঞ্চলে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে বহু বছর ধরে। আজ এক দেশ তো কাল অন্য দেশ। এসব যুদ্ধের শিকার নিরীহ আদম সন্তানেরা। নিজ দেশেই তারা আজ পরবাসী। জীবন বাঁচাতে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিচ্ছে। ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকায় নিজের প্রাণ বাজি রাখে একটু শান্তিতে বাঁচার আশায়। শরণার্থী সমস্যাটি এখন আর ইউরোপীয় নয়। এ সমস্যাকে গুরুতর বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে আমলে নিয়ে সমাধানের জন্য দ্রুত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত