মুক্তপ্রাণ নাট্যপুরুষ

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৩, ১০:৫৩ পিএম

মামুনুর রশীদ। বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব। মুক্তিযোদ্ধা, কর্ণধার আরণ্যক নাট্যদল। টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলার পাইকড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই মানুষটি একাধারে অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক এবং সংগঠক। কী নন তিনি? ছিলেন, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের চেয়ারম্যান। ১৯৮২ সালে প্রত্যাখ্যান করেছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। অর্জন করেছেন একুশে পদক। এই আলোকিত মানুষটি এসেছিলেন দেশ রূপান্তর অফিসে। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুনের রুমে এক পশলা আড্ডার পর, ডিজিটাল স্টুডিওতে শুরু হলো জমজমাট আড্ডা। ছিলেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, সিনিয়র সাব-এডিটর মোহসীনা লাইজু, হেড অব ইভেন্টস অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং শিমুল সালাহ্উদ্দিন এবং সহ-সম্পাদক এনাম-উজ-জামান বিপুল। ক্যামেরার বাইরে ছিলেন ডিজিটাল প্রযোজক লিটু হাসান। দীর্ঘ সময় নিয়ে শুরু হলো আড্ডা। গ্রন্থনা তাপস রায়হান

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আপনার দীর্ঘ পথচলা আমরা জানি। অভিনয় অঙ্গনে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আপনার কী অবদান, তাও আমরা আন্তরিকভাবে অনুভব করি। আপনার লেখালেখির সঙ্গেও আমরা পরিচিত। কিন্তু শুরুটা করতে চাইছি, শৈশব-কৈশোর থেকে।

মামুনুর রশীদ : আমার জন্ম মাতুলালয়ে। টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলার পাইকড়া গ্রামে। এটা ১৯৪৮ সালের কথা। তখন একটা রেওয়াজ ছিল কোনো নারী সন্তানসম্ভবা হলে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হতো বাবার বাড়ি। মার বয়স তখন খুবই কম। হাসতে হাসতে বললেন আমার সঙ্গে মায়ের বয়সের পার্থক্য মাত্র ১৪/১৫ বছর। এরপর তো আমাদের আরও ৮ ভাইবোন হয়েছে। বিদেশে অনেকে বলেন, তোমরা কয় ভাইবোন? আমি বলি ৯। তখন তারা বিস্মিত হয়ে বলেন, ওয়ান মাদার! এক মায়ের এতগুলো সন্তান! হা হা হা...। আসলে এটা তো তখন ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। আমরা দেখেছি এক মায়ের ঘরে ১৬ সন্তানও হয়েছে। আমার পৈতৃক ভিটা হচ্ছে, পাশের উপজেলা ঘাটাইল। সেখানেও আমরা যেতাম। পাহাড়ের পাদদেশে ছিল আমাদের বাড়ি। অসম্ভব সুন্দর জায়গা। পাহাড়ে থাকত মান্দি আদিবাসীরা। ওরা অনেকেই আমার বন্ধু ছিল। তখন কিন্তু সেই পাহাড়ে বাঘ, জংলি শূকর, বানরসহ অনেক প্রাণী ছিল। এখন তো সেই পাহাড় নেই। সব কেটে ফেলা হয়েছে। সেই পাহাড়ই কিন্তু গাজীপুরেরটা। তখন আমাদের ওখানে চমৎকার একটা সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল। যাত্রাপালা, থিয়েটার, গান কত ধরনের যে অনুষ্ঠান! আহা...। এর মধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনার বাবা কোন পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন?

মামুনুর রশীদ : বাবা ছিলেন পোস্ট মাস্টার। যে কারণে বিভিন্ন জেলায় ঘুরতে হতো। আমার পড়াশোনা শুরু হয়, ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলা থেকে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : অভিনয় জীবন শুরু হলো কবে থেকে?

মামুনুর রশীদ : স্কুল জীবনেই। ‘বিজয় সিংহ’ নাটকে। অবশ্য নারী ভূমিকা বর্জিত নাটক ছিল সেটি (প্রাণ খুলে হাসলেন)। সেই সিংহলের রাজপুত্র বিজয় সিংহের ছোট ভাই সুমিত্র সিংহের ভূমিকায়। এরপর হলো কি, নাটকে আমার বড় ভাই বিজয় সিংহের বিরুদ্ধে একটা বিদ্রোহ করার চেষ্টা করেছিলাম। যদিও সেটা ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু সামনে অনেক দর্শক দেখে আমি ঘাবড়ে যাই। ডায়ালগ বেশি না। কিন্তু সামনে অনেক কালো কালো মাথা দেখে, কোনোমেেত ডায়ালগ বলে মঞ্চ থেকে পালিয়ে এলাম। হা হা হা। কিন্তু আনন্দের জায়গা হচ্ছে, মায়ের শাড়ি পরে কিন্তু তখন ধূতি বানিয়েছিলাম। এরপর শরীরে রাজপুত্রের পোশাক। মেকাপ দিয়েছিলেন, আমাদের গৌর দা। তিনি যাত্রাদলে নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন। আমার মুখে এমন কড়া মেকাপ দিয়েছিলেন, সেটা জামা-গেঞ্জিতে লেগে যায়। সেভাবেই আমি গ্রামে ঘুরতাম। চাইতাম, কেউ জিজ্ঞাসা করুক ঐখানে দাগ কেন? যাতে বলতে পারি নাটকে অভিনয় করেছি! হা হা হা হা হা হ...। (সব আড্ডাবাজ হেসে উঠলেন)

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কিন্তু সিরিয়াসলি অভিনয়ের সঙ্গেই জীবন জড়িয়ে নেবেন সেটা ভাবলেন কবে?

মামুনুর রশীদ : বাল্যকালেই আমি অনেক যাত্রাপালা দেখতাম। সেখানে অভিনেতাদের যে শক্তি ছিল, সেটা কল্পনা করা যায় না। আমার একটা প্রেরণার জায়গা আছে। একবার সোহরাব-রুস্তম যাত্রাপালা দেখতে গেছি। ওটার শেষ দৃশ্যে দেখা যায় সোহরাব পিতার উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। কিন্তু ঘটনাক্রমে রুস্তমের সঙ্গে যুদ্ধ লেগে গেল। তো সোহরাবের মা, তার শরীরে একটা মাদুলী বা বাজুবন্দ পরিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল তোমার বাবার সঙ্গে কখনো দেখা হলে বলবে, এটা আমার মা দিয়েছে। যাত্রার দৃশ্যে দেখা গেল তাদের মল্লযুদ্ধ হচ্ছে। একজন এসেছে ইরান থেকে আরেকজন তুরান। মল্লযুদ্ধে রুস্তম নিচে পড়ে গেল। সোহরাব ভাবল একজন  বয়স্ক লোক, তাকে একটা সুযোগ দিই। দ্বিতীয় দিন যখন আবার যুদ্ধ হয়, তখন সোহরাব নিচে পড়ে গেল। কিন্তু রুস্তম তাকে খঞ্জন দিয়ে হত্যা করে। একসময় সে সোহরাবের হাতে সেই মাদুলী দেখতে পায়। মনে পড়ে, তার স্ত্রীর কথা। পরিষ্কার হয় সব। এ যে তারই সন্তান! তখন তিনি চিৎকার করে বলছেন আকাশ তুমি বিদীর্ণ হও, মাটি তুমি দুভাগ হয়ে যাও। বাতাস তুমি রুদ্ধ হও। সেই দৃশ্যটা এত চমৎকার! মিউজিক, লাইট, বিবেকের গান সব মিলিয়ে একটা করুণ আবহ। তখন ভোর হয়ে গেছে। দর্শক সব কাঁদছে। একসময় পালা শেষ হলো। কিন্তু আমার কৌতূহল হলো, এত লম্বা-চওড়া বীর এদের আমি দেখব। মেকাপ রুমে গিয়ে দেখি, তারা দুজনে পোশাক খুলে গেঞ্জি পরে বিড়ি খাচ্ছে। একজন হচ্ছে ৫ ফুট ৪ আরেকজন ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি। কিন্তু মঞ্চে মনে হচ্ছিল একেকজন ৬ ফুট লম্বা। তখন আমার মাথার মধ্যে একটা বিষয় ঘুরপাক খেতে থাকল। বাস্তব জীবনে তারা কত সাধারণ। কিন্তু তারা যখন মঞ্চে উঠছে, কী অসাধারণ! যা বলছে, তাই বিশ^াস করছি। কখনো হাসাচ্ছে, কখনো কাঁদাচ্ছে। অথচ বাস্তব জীবনে কত সাধারণ মানুষ! তখনই আমি অভিনয়ের শক্তি সম্পর্কে টের পেলাম। পাশাপাশি মনে হলো, এটা লিখেছেন কে? পেছনের শক্তি তো তিনিই। তখন একদিন বাবাকে বললাম বাবা, নাটকের বিভিন্ন বই আমি পড়তে চাই। তখন বাবা কলকাতা থেকে কিছু বই এনে দেন। পড়তে পড়তে অনেকক্ষণ ভাবলাম। একসময় মনে হলো, আমিও নাটক লিখব।

মোহসীনা লাইজু : সেই সময় আপনার কত বয়স?

মামুনুর রশীদ : সম্ভবত এইট-নাইনে পড়ি। কিন্তু তখন লিখিনি। যখন ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি, তখন কলেজ বার্ষিকীতে প্রথম নাটক লিখি। একজন শিক্ষক এটা পরিচালনা করলেন। নাটকটা খুব জনপ্রিয় হলো। নামটা ছিলমহানগরীতে একদিন। মনে হলো, আমিও নাটক লিখব। এরমধ্যেই টেলিভিশন এলো। তখন এটা বিশাল বিষয়। এরপর তো পলিটেকনিকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং। তারপর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ করি। টেলিভিশনের নাটকে লেখা শুরু করলাম ১৯৬৮ সাল থেকে। ডিআইটিতে, আব্দুল্লাহ ইউসুফ ইমাম নামের একজন প্রযোজক ছিলেন। তিনি এসেছেন চলচ্চিত্র থেকে। তখন আব্দুল্লাহ আল-মামুন, মুস্তাফা মনোয়ার, কেরামত মাওলা, মহিউদ্দিন ফারুকসহ অনেকে ছিলেন। রাত-দিন তাদের সঙ্গেই থাকি। তখন আব্দুল্লাহ আল মামুন একদিন ভাবলেন, শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’ উপন্যাস তিনি প্রযোজনা করবেন। আমাকে নাট্যরূপ দিতে হবে! বয়স তখন আর কত, ২১/২২?  তখন তো শহীদুল্লা কায়সার আমার কাছে একজন স্বপ্নের মানুষ। তখনো কিন্তু উপন্যাসটা পড়িনি। একদিন শহীদুল্লা কায়সারের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। দেখলাম, ছোটখাটো একজন মানুষ। এরপর আবার জহির রায়হান! সেই কায়েৎটুলির বাসায় গিয়ে দেখলাম, অতি সাধারণ একজন মানুষ। যা ভেবেছিলাম, একবারেই তার উল্টো। তখন তিনি দৈনিক সংবাদের যুগ্ম বার্তা সম্পাদক। কিছুদিন আগেই জেল খেটে এসেছেন। আমার দিকে তাকালেন। হাত নাচিয়ে বললেন করো, দেখি...। এরপর তো নাটক হলো। একদিন তিনি এলেন, টেলিভিশনে। বললেন বাহ, নাটকে তোমরা এইরকমও পারো! এরপর তো নতুন করে আবার বিটিভিতে হয় এই নাটক। তখনো প্রযোজক ছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। সংশপ্তক নাটকে তখন আমি অভিনয় করি। এরপর একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার উদ্দেশে আগরতলা হয়ে কলকাতায় চলে যাই। সেখানে যুক্ত হই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কাদের পেলেন, সেখানে?

মামুনুর রশীদ : সৈয়দ হাসান ইমাম, মুস্তাফা মনোয়ার, কামাল লোহানী, বাদল রহমান, আশরাফুল আলম, আলী যাকের, অজিত রায়, শাহীন সামাদ, আব্দুল জব্বারসহ অনেককেই পেলাম।

তাপস রায়হান : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কী ধরনের কাজ ছিল?

মামুনুর রশীদ : নাটক লিখতাম, প্রযোজনা করতাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্বাধীন বাংলায় প্রচারিত আপনার লেখা কোনো নাটকের নাম মনে আছে?

মামুনুর রশীদ : হ্যাঁ। মৃত্যুহীন প্রাণ, চাঁদের তলোয়ার। আর মুক্তির ডায়েরি তো সিরিয়াল। শেষ হয়নি। এরমধ্যেই দেশ স্বাধীন হয়ে গেল। তখন কলকাতার নাটক দেখে আমরা বিমোহিত হলাম। উৎপল দত্ত, শম্ভু মিত্র অভিনীত নাটক দেখতে দেখতে ভাবলাম, দেশে গিয়েও আমরা এমন করব। অস্থির হয়ে উঠলাম এই ভেবে যে, দেশ কবে স্বাধীন হবে? একসময় দেশ স্বাধীন হলো। সঙ্গে পেলাম বন্ধু আলী যাকেরকে। যিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ইংরেজি সংবাদ পাঠ করতেন। আলী যাকেরকে আমি বলতাম দোস্ত।

তাপস রায়হান : স্বাধীন বাংলাদেশে আপনারাই তো প্রথম নাট্যদল গড়ে তোলেন?

মামুনুর রশীদ : হ্যাঁ। স্বাধীন দেশে এসেই আমরা নাটকের রিহার্সাল শুরু করলাম। মুনীর চৌধুরীর লেখা ‘কবর’। তখন কোন নাট্যদল থেকে হবে, কোথায় মঞ্চায়ন হবে কিছুই ঠিক হয়নি। কথায় কথায় টেলিভিশনে একদিন আবদুল্লাহ আল-মামুনকে নাট্যদলের বিষয়টা বললাম। তিনি বললেন- ‘আরণ্যক’ নাম দাও। সেটাই চূড়ান্ত হলো। ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স  ইনস্টিটিউটে মঞ্চস্থ হলো কবর। নির্দেশনায় ছিলাম আমি। মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করলেন আলী যাকের। আমিও অভিনয় করলাম। এটাই ছিল আরণ্যকের প্রথম মঞ্চায়ন। 

তাপস রায়হান : অনেকেই বলেন, বর্তমানে মঞ্চ আন্দোলন আগের মতো নেই। একইসঙ্গে বলতে হয় গ্রুপ থিয়েটারেও একটা অস্থিরতা চলছে। এই সংগঠনে আপনি একসময় চেয়ারম্যান ছিলেন। এ বিষয়ে কিছু জানতে চাইছি।

মামুনুর রশীদ : আমাদের দেশে দীর্ঘদিনের নাট্যঐতিহ্য আছে, নাট্য আন্দোলনের ইতিহাস আছে। আমাদের আন্দোলনের ফলেই কিন্তু নাটক থেকে সেন্সর প্রত্যাহার হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকে নাটকের বিষয় সন্নিবেশিত হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগ হয়েছে। থিয়েটার কমপ্লেক্স হয়েছে। মনে রাখতে হবে, কোনো প্রতিষ্ঠানে যখন নির্বাচন প্রথা চালু হয়, তখনই সৃষ্টি হয় বিভাজনের। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনও এটার থেকে মুক্ত নয়। সমস্যা হচ্ছে, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের যিনি চেয়ারম্যান তিনিই আবার শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক। এটা তো হয় না। তিনি সরকারের সঙ্গে কোনো বার্গেনিং করতে পারবেন না! এটা তাকে কোনোভাবেই বোঝানো যাচ্ছে না। ফলে নাট্যকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। আমাদের অনেক ধরনের দাবি-দাওয়া আছে। অভিনয়কে পেশা করার জায়গায় আমরা যেতে পারছি না। এটা করা খুব জরুরি। এর জন্যে শুধু লিয়াকত আলী লাকী নন, সমস্ত ব্যবস্থায়ই দায়ী। নাট্যকর্মীদের বিভিন্ন সংগ্রামে তাকে আমরা পাশে পাচ্ছি না!   

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : একদিকে লিয়াকত আলী লাকী শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক আবার বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের মহাসচিব। তিনি তাহলে সরকারের সঙ্গে বার্গেনিং কীভাবে করবেন? আর এই বিষয়টি আপনারা মেনে নিয়েছেন?

মামুনুর রশীদ : না না, মানিনি তো (হাসি)। মানিনি বলেই সমস্যা। তরুণ নাট্যকর্মীরা সম্মিলিতভাবে যেভাবে চাইবে, সেভাবেই হবে। আমরা যারা সিনিয়র আছি, তারা তাদের সঙ্গে একমত।

এনাম-উজ-জামান বিপুল : মূল সমস্যাটা কোথায়?

মামুনুর রশীদ : আসলে ফেডারেশনের ব্যাংক সিগ্নেটরি থাকেন ৩ জন। কিন্তু তিনি এবং অর্থ সম্পাদক মিলে অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচুর পরিমাণে টাকা তুলেছেন। প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এর কোনো হিসাব নেই। এটা আবার চেয়ারম্যান জানেন না। একইসঙ্গে বিস্ময় লেগেছে, তাহলে ঐ ১ বছর চেয়ারম্যান কী করলেন? এটা কী করে হয়! 

তাপস রায়হান : আপনার কি মনে হয়, আমাদের সমাজে একটি সাংস্কৃৃতিক প্রতিবিপ্লব হয়েছে?

মামুনুর রশীদ : আমাদের দেশের অভ্যুদয় হয়েছে, সুদীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে। এর একটা দর্শন আছে। এর সঙ্গে গভীরভাবে মিশে রয়েছে সাংস্কৃতিক চেতনা। এটা কিন্তু সেই ভারত ভাগের পরই শুরু হয়েছে। প্রথম হচ্ছে, ভাষা আন্দোলন। এটা শুধু ভাষার আন্দোলন ছিল না, আমি যে বাঙালি এবং এর মধ্যে কত বিস্তৃত বিষয় যে রয়েছে সেটা উপলব্ধি করা। সেই ১৯৫২ থেকে ষাটের দশক, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ এ সমস্ত রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি একেকটা প্রবল সাংস্কৃতিক আন্দোলনও ছিল। যে কারণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন বাংলাদেশ একটি সাংস্কৃতিক রাষ্ট্র। সেই সাংস্কৃতিক রাষ্ট্রের চর্চা ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। ফলে কী হলো? এইসময়ে আমরা দেখতে পাই- আমাদের সংস্কৃতিচর্চা মানে  জলসা, ওয়াজ মাহফিল, বোরখা-হিজাব এবং গ্রামে গ্রামে ইসলামি জলসা। কোথায় গেল আমাদের যাত্রাপালা, গান? ধর্মীয় বিষয়কে আমি অস্বীকার করছি না। অবশ্যই এগুলোও হবে। অনেক সময় তো ঈদ-শারদীয় পূজা একসঙ্গে হতো। কই, তখন তো কোনো সমস্যা হয়নি! স্কুলে মিলাদও হতো, সরস্বতী পূজাও হতো। এই যে সব ধর্মের সমন্বয়, সেটাই তো বাঙালিত্ব। সেই বাঙালিত্বের জায়গাটা গৌণ হয়ে গেছে। প্রেক্ষাপট ভিন্ন এবং বর্তমানে সেটা প্রকাশ্যে। 

এনাম-উজ-জামান বিপুল : কোনো ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন?

মামুনুর রশীদ : অবশ্যই। এটা তো প্রকাশ্যে। সব দেখা যাচ্ছে, কী হচ্ছে?

তাপস রায়হান : আচ্ছা। আবার অভিনয়ে আসি। আপনি মঞ্চে একরকম অভিনয় করেন, টিভি নাটকে একরকম আবার চলচ্চিত্রে আরেক রকম। নিজেকে আর কত ভাঙবেন?

মামুনুর রশীদ : (মুচকি মুচকি হাসছেন) বললেন দেখো, গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে সবগুলোর মধ্যেই একটা ঐক্য রয়েছে। অভিনয় তো একটা শিল্প। এটা শিখতে হয়। অভিনয়ে বৈচিত্র্য থাকবেই। আমার প্ল্যাটফর্ম আলাদা। রীতিই তো অন্যরকম। মঞ্চে যেমন অভিনয় করব, সেটা ক্যামেরার সামনে করব না। 

এনাম-উজ-জামান বিপুল : আপনার অভিনীত অধিকাংশ নাটকের মধ্যে বারবার শ্রেণিসংগ্রামের বিষয়টি প্রকটভাবে দেখা দেয়। ব্যক্তি আপনিও কি তাই?

মামুনুর রশীদ : অবশ্যই দর্শনটা আমার। সেই যে প্রাচীন কথা সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। এটাকেই আমি ধারণ করি। আমার শিল্প যদি মানুষের কাজেই না লাগে, তাহলে করে কী লাভ?

মোহসীনা লাইজু : নতুন নাট্যকারদের নিয়ে কিছু বলবেন?

মামুনুর রশীদ : আজাদ আবুল কালাম, মাসুম রেজা, রতন সিদ্দিকী অনেক দিন থেকে কাজ করছেন। এরা তো নতুন না। আনন জামান, শুভাশিষ সিনহাসহ অনেকেই ভালো করছেন। সবার নাম মনে পড়ছে না।

তাপস রায়হান : আপনি অভিনেতা আলী যাকেরের খালু আবার তার বন্ধু। বিষয়টা একটু পরিষ্কার করবেন?

মামুনুর রশীদ : হা হা হা হা। পরিষ্কারের কী আছে? হ, আমি তার খালু! অর খালারে বিয়া করছি  হা হা হা। না না, বিষয়টা হইলো, অর মার কাজিনকে আমি বিয়ে করেছি।

এনাম-উজ-জামান বিপুল : কতদিন বেঁচে থাকতে চান?

মামুনুর রশীদ : অনন্তকাল। হা হা হা। 

তাপস রায়হান : আপনি একুশে পদক পেয়েছেন। কিন্তু বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন। কেন?

মামুনুর রশীদ : আসলে তখন নাটকে সেন্সরপ্রথা ছিল। তার প্রতিবাদে করেছিলাম।

মোহসীনা লাইজু : ব্যক্তিজীবন কিছুই জানা হলো না!

মামুনুর রশীদ : আমার এক ছেলে, এক মেয়ে। আর আছে স্ত্রী। এই তো সংসার। আমার মা কিন্তু এখনো বেঁচে আছেন।

এরপর মামুনুর রশীদ আবৃত্তি এবং অভিনয় করলেন। আমরা শুনছিলাম তন্ময় হয়ে। ততক্ষণে রাত হয়ে গেছে। সাঙ্গ হলো আড্ডা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত