আকাশের মতো ঔদার্য, ক্লান্তিহীন বায়ুর মতো কর্মীদের প্রেরণা এবং পাহাড়ের মতো উচ্চতা নিয়ে যিনি মাথা উঁচু করে বেঁচে ছিলেন তিনিই হচ্ছেন অহিংস বর্ণবাদবিরোধী দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট Enlightened & Legend নেলসন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষ তাকে ভালোবেসে ‘মাদিবা’ নামে ডাকে।
সাদা-কালোর মৈত্রীর সেতুবন্ধনকারী, শান্তি আর সম্প্রীতি স্তম্ভের বিশ্ববরেণ্য নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। আজ নেলসন ম্যান্ডেলার জন্মদিন। ২০১০ সালে জাতিসংঘ আজকের দিনটি নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস (১৮ জুলাই) হিসেবে নানা আয়োজনের সঙ্গে পালন করে। আমাদের দেশও পালন করছে। ১৯১৮ সালে ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার উমটাটায় কৃষ্ণাঙ্গ রিজার্ভ ট্রান্সকিই শহরের রাজধানীতে মুভিজোর নামক গ্রামে পিতা হেনরি গাডলা ও মাতা নোসিকেনি দম্পতির ঘরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ম্যান্ডেলার বাবার মৃৃত্যুর পর দালিন্দ্যেবো তাকে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। সেখানেই তিনি আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠেন। ম্যান্ডেলা ছিলেন তার পরিবারের প্রথম সদস্য, যিনি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। স্কুলে পড়ার সময় তার শিক্ষিকা এমদিনগান ম্যান্ডেলার ইংরেজি নাম রাখেন নেলসন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ম বর্ষের শেষে ম্যান্ডেলা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ছাত্র সংসদের ডাকা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। এরপর তাকে ফোর্টস হেয়ার থেকে চলে যেতে বলা হয়। শর্ত দেওয়া হয়, কেবল ছাত্র সংসদে নির্বাচিত হতে পারলেই তিনি সেখানে ফেরত আসতে পারবেন। জীবনের পরবর্তী সময়ে কারাগারে বন্দি অবস্থায় তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকা দূরশিক্ষণ কার্যক্রমের অধীনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ইউনিভার্সিটি অব উইটওয়াটার্সরান্ডে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শুরু করেন। ছাত্র অবস্থায় সাদা-কালোর ভেদাভেদ তাকে মানসিকভাবে উৎপীড়িত করত। সাদারা পরিধান করত দামি কাপড় আর খেত দামি খাবার। কালোদের দৈন্য অবস্থা জরাজীর্ণ পোশাক আর দীনহীন জীবনমান দেখে এক ধরনের আক্রোশ জন্ম নিয়েছিল তার মনের ভেতরে। শ্রমজীবী মানুষের দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও পুলিশের হয়রানি নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি বলতেন, ‘সংগ্রামই আমার জীবন। আমি স্বাধীনতার জন্য আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাব।’ তার জীবন ছিল জনগণের জন্য
উৎসর্গীকৃত। ১৯৫৮ সালের ১৪ জুন উইনি ম্যান্ডেলাকে বিয়ে করেন। ঐ বছর ১ আগস্ট তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয় প্রিটোরিয়ার আদালতে। ১৯৬২ সালের ৫ আগস্ট রবিনসন দ্বীপ কারাগারে পাঠানো হয় তাকে। বন্দি জীবনের অধিকাংশ সময় ছিলেন রোবন দ্বীপে। ১৯৬৪ সালের ১২ জুন বর্ণবৈষম্যবিরোধী সংগ্রামে সক্রিয় আন্দোলন, অন্তর্ঘাতসহ নানা অপরাধের দায়ে জাতিসংঘের রায় বিবেচনায় এনে ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হয় তাকে। পরবর্তী সময়ে দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে, কারাগার থেকে কারাগারে নির্যাতন ও কারাদ- ভোগ করেন। তরুণ ম্যান্ডেলা দীর্ঘ ২৭ বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি এবং কঠোর নির্মম নিঃসঙ্গ কয়েদি জীবনযাপন করলেও বর্ণবাদের সঙ্গে কখনো আপস করেননি। শুধু ম্যান্ডেলাকেই নয়, তার স্ত্রী উইনি ম্যান্ডেলাকে বেশ কয়েকবার কারাগারে এবং কন্যাদ্বয়কে শ্বেতাঙ্গ সরকার কর্তৃক স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে নানা রকম বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট এফ ডাব্লিউ ডি ক্লার্ক ১৯৮৯ সালে বর্ণবৈষম্য নীতির অবসান ঘটান। ১৯৯০ সালে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় এবং দীর্ঘ ২৭ বছর পর অবশেষে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি মুক্তি পান। মুক্তির পরদিন ১২ ফেব্রুয়ারি এক ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, ‘আমাদের সংগ্রাম চূড়ান্ত পর্যায়ে আমি স্বপ্ন দেখি এমন এক সমাজের যেখানে সমঅধিকার নিয়ে সবাই সম্প্রীতিতে বসবাস করবে। বর্ণবাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এই বর্ণবাদের অবসান ঘটাতে হবে। এই দেশ সাদা-কালোর দেশ। আমাদের আন্দোলন ছিল সাদাদের বিরুদ্ধে নয়, তাদের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে।’ পরবর্তী সময়ে তিনি তার দলের পক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নেন। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান ঘটে এবং এরই ধারাবাহিকতায় সব বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে ১৯৯৪ সালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ম্যান্ডেলা ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন এবং উপরাষ্ট্রপতি হন শ্বেতাঙ্গ নেতা পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতি ডি-ক্লার্ক। ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক উপদেষ্টারা বললেন, আমরা শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ক্ষমতায় এসেছি। আর এখন তাদেরই ক্ষমতায় বসানো হচ্ছে। উত্তরে তিনি বলেন, ‘সাদারা অনেক দিন ক্ষমতায় ছিল। দেশ পরিচালনায় তারা অনেক অভিজ্ঞ। আজ দেশের স্বার্থে তাদের অভিজ্ঞতাগুলো প্রয়োজন। ব্যক্তিগত বিদ্বেষ যতই থাকুক না কেন।’ তিনি ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব পালন করে রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, যারা তাকে রাজদ- দিয়েছিল আবার তারাই তাকে সম্মানিত করেছেন! ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মার্গারে থেচার ম্যান্ডেলার মুক্তির ৯ বছর আগে দম্ভোক্তি করে বলেছিলেন ‘কেউ যদি ভেবে থাকে এএনসি কখনো দক্ষিণ আফ্রিকায় সরকার গঠন করতে পারবে তবে সে এক অন্ধকার অলীক রাজ্যে বাস করছে।’ কিন্তু ৯ বছর পর থেচারকেই তা দেখতে হয় ।
কিন্তু সেই রানীর সঙ্গে নৈশভোজের আগে ম্যান্ডেলা রানীকে স্মরণ করিয়ে দেন, তিনি গাঁয়ের ছেলে। ব্রিটেন সমাজের সব দরজা খুলে দেওয়ার জন্য এবং সকালে তার বাগানে পায়চারী করতে দেওয়ায় রানীকে ধন্যবাদ জানান। তার সংস্পর্শে রানীও যেন সেদিন প্রাণ খুঁজে পান।
তার জন্ম, ত্যাগ, ধৈর্য, আন্দোলন, সংগ্রাম এবং চূড়ান্ত সাফল্য তাকে জীবনের পরিপূর্ণতায় ভরে দিয়েছে এবং মহান বিশ্ববরেণ্য নেতায় পরিণত করেছে। তিনি যাদের কাছ থেকে নির্যাতন সহ্য করেছেন, কিন্তু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নীতি গ্রহণ না করার জন্য পৃথিবীর সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছেন। তার অসীম সাহস, দক্ষ নেতৃত্ব ও নিঃস্বার্থ নীতির জন্য সারা বিশ্বের মানুষ তার প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। বিশ্বব্যাপী একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্যরকম উচ্চতায়। শান্তির সপক্ষে কাজ করা এবং আফ্রিকার নবজাগরণে ভূমিকা রাখার জন্য গত চার দশকে তিনি ২৫০টিরও অধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার পান। এছাড়াও মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট সদস্যদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে মর্যাদাপূর্ণ কংগ্রেশনাল স্বর্ণপদক প্রদান করা হয় এই নেতাকে। ১৯৯৩ সালে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্মান, নোবেল শান্তি পুরস্কারে ম্যান্ডেলাকে ভূষিত করা হয়। ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর তার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। কোনো প্রকার লোভ প্রবঞ্চনা ও প্রতারণায় নিজেকে জড়াননি। এমন মহামানবের জন্মদিনকে ‘আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে মানব সভ্যতারই জয়গান করা হয়েছে। তিনি বেঁচে থাকবেন, সাধারণ মানুষের হৃদয়ে- বিপ্লবের প্রতীক হয়ে, ভালোবাসার প্রতীক হয়ে- মানবতার প্রতীক হয়ে। বিশ^প্রাণ ভালোবাসার মৃত্যু নেই। মৃত্যু নেই ম্যান্ডেলার। জন্মদিনে এই মহান নেতার প্রতি থাকল, সংগ্রামী অভিনন্দন।
লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
