মৎস্য আহরণ এবং বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদনই হাওর অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবন ধারণের প্রধান অবলম্বন। হাওর অঞ্চল বর্ষাকালে থাকে পানির নিচে। সেই সময় অধিকাংশ কৃষক মাছ ধরেন। কিন্তু যখন হাওরে মাছের আকাল থাকে, তখন কৃষক চোখে অন্ধকার দেখেন। গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের মৌসুমি বেকারত্ব আরও জাপটে ধরে। তারা দিশেহারা হয়ে পড়েন, যখন দেখতে পান খোদ হাওরেই চলছে মাছের সংকট। কিশোরগঞ্জের হাওর শুধু না, দেশের অন্যান্য হাওরের অবস্থাও প্রায় একই ধরনের। সেখানেও মাছের সংকট। অবশ্য এই সংকটের শুরু হয়েছে অনেক আগে। বর্তমানে তা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের হাওরে চায়না জালের ব্যবহার, পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন, সেচ দিয়ে মাছ শিকার ও জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারই তৈরি করেছে মাছের আকাল। এই জেলার ১৩ উপজেলার ৮টিই হাওরঘেরা।
এসব অঞ্চলের হাজার হাজার মৎস্যচাষি হাওরে মাছ না পাওয়াতে, স্বাভাবিকভাবেই মুষড়ে পড়েছেন। হাওরে মাছ হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কারণগুলো চিহ্নিত করারও তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। যদিও পাশেই ময়মনসিংহে রয়েছে দেশের প্রথম কৃষি বিশ^বিদ্যালয়। সেখান থেকে হাওরে কৃত্রিমভাবে মৎস্য চাষ পদ্ধতির ব্যাপারে অনেক গবেষকই সহযোগিতা করতে পারেন। তবে এর আগে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন, হাওরে কেন মাছের প্রজনন হ্রাস পাচ্ছে?
হাওরবাসীর জীবন নিশ্চিন্ত করতে মৎস্য গবেষকদের এগিয়ে আসা দরকার। একইসঙ্গে স্থায়ী অভয়াশ্রম না থাকা, হাওরে ক্ষতিকর চায়না জালের ব্যবহার, পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন, ইজারা প্রথা, সেচ দিয়ে মাছ শিকার, জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার ও হাওর পানিশূন্য হয়ে পড়ায় ক্রমেই এ মৎস্যভা-ারে মাছের উৎপাদন কমছে। আশঙ্কাজনক এমন বার্তায় হাওরাঞ্চলে মৎস্যজীবীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা।
দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে- কিশোরগঞ্জের ৬৪ হাজার ৩০৬ হেক্টর আয়তনের ১২২টি ছোট-বড় হাওর থেকে প্রতি বছর মিলত বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ২২ হাজার টন মাছ। এ ছাড়া প্রচুর শামুক-ঝিনুক উৎপন্ন হতো এ হাওরাঞ্চলে, যা ছিল প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ। কয়েক বছর ধরে হাওরের মাছ দিন দিন কমছে। আর এবার পানি এলেও এখনো দেখা মিলছে না মাছের। সংশ্লিষ্টরা প্রতি বছরই মাছের পরিমাণ কমে যাওয়াকে আশঙ্কাজনক হিসেবেও দেখছেন।
এ হাওরগুলোতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে দেড় হাজারের মতো জেলে পরিবার। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে জেলেরা দিনরাত হাওরে মাছ ধরেন। কেউ ডিঙি নৌকা নিয়ে কেউ ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে মাছ ধরেন। তবে দিন দিন হাওরে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় চিন্তিত তারা। এতে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন অনেকে। এক্ষেত্রে জেলেদের দাবি মতো মাছের প্রজাতির বিলুপ্তি ঠেকাতে ও উৎপাদন বাড়াতে অবশ্যই পোনা এবং ডিমওয়ালা মাছ নিধন বন্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে ক্ষতিকর চায়না জালের ব্যবহার, ইজারা প্রথা, সেচ দিয়ে মাছ শিকার, জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। না হলে একসময় হাওর হবে মাছশূন্য।
শুধু কিশোরগঞ্জ না, দেশের বিভিন্ন জেলার হাওরগুলোয় কীভাবে মাছের প্রজনন বৃদ্ধি করা যায় এবং মৎস্যচাষিদের উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা করে মাছের বংশবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনে নতুন আইন করা যায় সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চিন্তা করা দরকার। পরিবেশগত কারণে হাওরে মাছের প্রজননে সমস্যা হচ্ছে। যে কারণে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়েছে। আরও অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, সেচে মৎস্য নিধন, নির্বিচারে পোনা মাছ নিধন করার ফলে হাওরে মাছ উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।
এ ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ জেলার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবশ্যই অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।
