বাংলাদেশ থেকেই নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে উড়াল দিয়েছেন রশিদ খান। মেজর লিগ ক্রিকেটে মুম্বাই ইন্ডিয়ানস নিউ ইয়র্ক দলের হয়ে খেলবেন আফগান লিগস্পিনার। শেয়ারবাজারের সূচকের মতো আইসিসির প্রকাশিত টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিং দেখে অনেক সময় সঠিক ছবিটা পাওয়া যায় না। কোন দল টি-টোয়েন্টিতে কতটা ভালো, সেটা বোঝার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে বৈশ্বিক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে তাদের ক্রিকেটারদের ব্যালান্স শিট। এ ক্ষেত্রে ইংল্যান্ড এবং আফগানিস্তান যে বাংলাদেশের অনেক ওপরে, সেটা নিশ্চয়ই নতুন করে বোঝানোর দরকার নেই।
জস বাটলার, রশিদ খান, জেসন রয়, মুজিব-উর-রহমান...নামগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে বিশে^র বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের খেলোয়াড় তালিকায়। কখন কোন দলের হয়ে খেলছেন, এসব হয়তো তাদেরও মনে রাখাটা কঠিন। সেই তুলনায় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বৈশ্বিক লিগে চাহিদা নেই বললেই চলে। দুই-একজন যাও-বা সুযোগ পান, বেঞ্চে বসেই কাটে বেশিরভাগ সময়। তাই ইংল্যান্ড এবং আফগানিস্তানের মতো টি-টোয়েন্টির মারকুটে দলকে যখন বাংলাদেশ ঘরের মাঠে সিরিজের সবগুলো ম্যাচে হারিয়ে দেয়, তখন অনেক হিসাব-নিকেশই বদলে যায়। প্রথাগত সূত্রে অঙ্ক মেলে না।
বছর দুই আগে, এমনই এক বর্ষাকালে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডকে টি-টোয়েন্টি খেলতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বাংলাদেশ। করোনাকালীন ভ্রমণ সতর্কতা আর বিশ^কাপের আগে বিশ্রামের ছুতোয় অস্ট্রেলিয়ার মূল দলের বেশিরভাগ সদস্য আর নিউজিল্যান্ডের কেউই আসেননি বাংলাদেশে। টি-টোয়েন্টিতে টেস্টের পঞ্চম দিনের মতো উইকেট বানিয়ে ৫ ম্যাচের দুটি সিরিজ ৪-১ আর ৩-২ ব্যবধানে জিতে র্যাঙ্কিং বাড়িয়েছিল বাংলাদেশ আর সে সময়কার কোচ রাসেল ডমিঙ্গো বাড়িয়েছিলেন চাকরির মেয়াদ। তবে নকল করে পাসের মতো সেই সাফল্য ধোপে টেকেনি, ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ফলটা হয়েছিল খারাপ। পরের বছরও খুব একটা উন্নতি নেই, উইন্ডিজ এবং জিম্বাবুয়ের কাছে সিরিজ হারের সঙ্গে যোগ হয় এশিয়া কাপেও গ্রুপপর্বে দুই ম্যাচেই হেরে সুপার ফোরে উঠতে না পারার ব্যর্থতা। গোটা বছরটাই ছিল হতাশার, ২১ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে বাংলাদেশের জয় মাত্র ৬ ম্যাচে। অথচ ২০২৩ সালে এসে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে আমূল পরিবর্তন। এ বছর ৮টি টি-টোয়েন্টি খেলে ৭টিতেই জিতে গেছে বাংলাদেশ। জিতল খেলা তিনটি সিরিজই। তবে এই জয়রথ এগিয়ে নেওয়ার আর খুব একটা সুযোগ নেই। কারণ চলতি বছরে আর কোনো টি-টোয়েন্টিই নেই বাংলাদেশের। বছরটা যে ওয়ানডে বিশ্বকাপের, সামনে তাই বেশ কিছু ৫০ ওভারের ম্যাচ। এশিয়া কাপ, দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে তিন ম্যাচের সিরিজ আর ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ, একেবারে ঠাসবুনোট সূচি। বিশ^কাপের পর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট দিয়ে বাংলাদেশ পা রাখবে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তৃতীয় চক্রে। টি-টোয়েন্টিতে ভালো খেলার লয়টা কেটে যাওয়ায় অধিনায়ক সাকিব আল হাসান কিছুটা হতাশ, ‘ছন্দটা এখন ভালো আছে। কিন্তু বড় বিরতিও আছে। এরপর যে কবে টি-টোয়েন্টি খেলব, জানি না। হয়তো জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে, বিপিএলের পরে। আশা করি, বিপিএলে ছেলেরা ভালো করবে। সেটা পরে আমাদের কাজে লাগবে।’
বাংলাদেশ দলের টি-টোয়েন্টিতে ভালো করার পেছনে এবারের বিপিএলের অবদান কম নয়। তৌহিদ হৃদয়, নাজমুল হোসেন শান্তরা তো বিপিএলে ভালো করে পাওয়া আত্মবিশ্বাসটাই কাজে লাগিয়েছেন জাতীয় দলে; শামীম হোসেন আর রনি তালুকদাররা তো দলেই ফিরলেন বিপিএলের পারফরম্যান্সের জোরে।
টি-টোয়েন্টির পরের বিশ্বকাপ ২০২৪ সালে। তার আগে দলটাকে নিয়ে আরও অনেক কাজ করার আছে বলেই জানিয়েছেন সাকিব, ‘বিভিন্ন কন্ডিশনে আমাদের সামনে আরও অনেক চ্যালেঞ্জ আসবে। সেরা সমন্বয়টা খুঁজে পেতে এখনো অনেক কিছু বাকি। তবে যেভাবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি তাতে আশা করা যায়, সামনে ভালো কিছু অপেক্ষা করছে।’ বিশেষ করে দলের খেলোয়াড়দের ব্যাটিং পজিশন নিয়ে আরও অনেক কাজ করার বাকি বলেই জানিয়েছেন টি-টোয়েন্টির অধিনায়ক, ‘ফ্লেক্সিবিলিটিটা থাকলে দলের জন্য খুব ভালো হয়। টি-টোয়েন্টিতে একজন উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানকে যে কাজটা করতে হতে পারে, সাত নম্বর ব্যাটসম্যানকেও সেই একই কাজটা করতে হতে পারে। কোনো ঊদ্বোধনী ব্যাটসম্যান যদি ১৫ ওভার পর্যন্ত ব্যাটিং করে, তাহলে শেষ ৫ ওভার তাকেই ব্যাট করতে হতে পারে। সবাই যদি সব জায়গায় ব্যাটিং করতে পারে, মানিয়ে নিতে পারে, তাহলে যখন কঠিন পরিস্থিতি গুলো আসবে, তখন তারা জানবে তাদের কী করতে হবে।’
আফগানদের ইংরেজ কোচ জনাথন ট্রটের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে। ট্রট হেসেই বললেন, ‘ভালো সম্ভাবনা দেখি; তবে খুব বেশি ভালো না!’ রসিকতার অংশটুকু বাদ দিয়ে ট্রট বলেছেন, ‘বাংলাদেশ বেশ ভালো একটা দল, যারা কঠিন প্রতিপক্ষ হতে পারে। সাকিব আছে, দলের সিম বোলিং এবং পেস বোলিং বিভাগ বেশ ভালো। এবাদত-তাসকিনের গতি আছে, তরুণ বামহাতি পেসার (শরীফুল) বেশ ভালো বল করেছে। স্পিন বিভাগও শক্তিশালী।’
ট্রট ব্যাটিং বিভাগের নামটা নেননি। নেওয়ার কথাও নয়। দুই টি-টোয়েন্টিতেই বাংলাদেশের ব্যাটিং পারফরম্যান্স মাঝারি। কোনো হাফসেঞ্চুরি নেই। ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও ৩ টি-টোয়েন্টিতে মাত্র দুজন হাফসেঞ্চুরি করেছেন নাজমুল হোসেন শান্ত ও লিটন দাস। পাওয়ার প্লেতে রান তোলা, শেষদিকে দ্রুত রান তোলা...এমন অনেক দুর্বলতা রয়ে গেছে। তবে এটা সত্যি যে টি-টোয়েন্টি খেলাটায় নিজেদের শক্তির জায়গা, নিজেদের কার্যকর কৌশলগুলো অবশেষে খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে সফলতা এলো এমন সময়, যখন সামনে টি-টোয়েন্টি নয়, ওয়ানডের বিশ^কাপ। ক্যানভাসটা ২০ নয়, ৫০ ওভারের।
