‘উবাচ’ শব্দের অর্থ বলেছিলেন। সংস্কৃত ভাষায় সেটি পরোক্ষ অতীত। গত সোমবার অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া ঢাকা-১৭ উপনির্বাচনে হিরো আলমের ওপর হামলা প্রসঙ্গে শব্দটি মনে পড়ল। মনে হচ্ছে আমরা গণতন্ত্র, সহিষ্ণুতার বয়ানে যে রাষ্ট্র গঠন করে চলেছি তার পরোক্ষ ইতিহাস জমা থাকছে হিরো আলমের নামে। এখানে রুচির আলাপে ক্ষমতা বা সিস্টেম যেভাবে কাজ করে সেটাও খোলাসা হচ্ছে।
প্রথমে সিস্টেম বা ক্ষমতা কাঠামোর দিকে তাকাই। ভোটের মাঠে হিরো আলমের নিগৃহীত হওয়া নতুন নয়। তবে সর্বশেষ সোমবার ঢাকা-১৭ উপনির্বাচনে তার ওপর হামলার ঘটনায় ইসির বক্তব্য এর আগের, মানে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হাতপাখার প্রার্থীর রক্তাক্ত হওয়ার ঘটনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) চেয়ে ভালো। এটাকে হিরো আলমের অর্জন বলা যেতে পারে, আবার সেই মন্তব্যের পর তৈরি প্রতিক্রিয়ার ফলে সিইসির ক্ষমা চাওয়ার ধারাবাহিকতা থেকেও হতে পারে। বরিশালের ঘটনায় সিইসি সাংবাদিকদের পাল্টা প্রশ্ন করে বসেন ‘উনি (প্রার্থী) কি ইন্তেকাল করেছেন?’ এবার আর তেমন মন্তব্য আসেনি কমিশন থেকে। হিরো আলমের ওপর হামলার ঘটনাটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে হয়েছে দাবি করে নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ঢাকা-১৭ উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণই ছিল। তিনি বলেছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর ওপর হামলার বিষয়ে কিছু তথ্য আমরা জেনেছি, প্রকৃত চিত্র পাইনি। দেশের প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমের ফেসবুক পেজে ঘটনার ফুটেজ থাকার পরও ‘ঘটনার চিত্র’ কীভাবে তারা পান না?
ভোটকেন্দ্রের বাইরের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কার? পুলিশকেও দেখা গেল হিরো আলমকে ভোটকেন্দ্রের বাইরে ছেড়ে দিতে, যেখানে তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। প্রসঙ্গত, এই উপনির্বাচনে পুলিশ শতভাগ নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে বলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেছিলেন, এ নির্বাচনে পুলিশ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করলে কমিশনার হিসেবে নাকে খত দিয়ে দায়িত্ব ছেড়ে চলে যাব। আমরা জানি না, নির্বাচনের পরিবেশ রক্ষা কেবল ভোটকেন্দ্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কি না। আর, ভোটকেন্দ্রের বাইরে হামলার ঘটনায় নির্লিপ্ত থাকা উপনির্বাচনে পুলিশ শতভাগ নিরপেক্ষতার নজির কি না সেটাও জানি না। তবে ডিএমপি কমিশনার নাকে খত দেননি, তা জানি।
এবার রুচির আলাপে ক্ষমতার প্রশ্নে হিরো আলম কেন ও কীভাবে বারবার প্রসঙ্গ হচ্ছেন সেদিক একটু তাকানো যেতে পারে। রুচি প্রশ্নটিকে নিরীহ আর কলাকৈবল্যবাদ দিয়ে বিচারের কথা বলে এর সহিংস রূপ ও ক্ষমতার প্রসঙ্গটি আড়ালে রাখা যায়। এটি দোকানে গিয়ে লাল বা হলুদ রঙের শার্ট কেনার মতো নিরীহ নয়। অথবা, কে পপ ভালো না লাগলে পল্লীগীতিতে শিফট করে যাওয়ার স্বাধীনতা পর্যন্ত আটকে থাকে না। দোকানে ঢুকে ফ্রিডম অফ চয়েস বা আর্টের প্রশ্নে শিল্পোত্তীর্ণ হওয়ার শর্তে হিরো আলমকে বিচার করায় সমস্যা আছে। যেমন সমস্যা আছে নিউ মিডিয়া যেভাবে সেলিব্রেটি ও তার ভোক্তা শ্রেণি তৈরি করে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি তৈরি করে। আর এই জনপ্রিয়তা ক্ষমতা কাঠামোকে অ্যাড্রেস করে, আর্টের প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখে।
হিরো আলম প্রশ্নে রুচির কথা ঘুরেফিরে আসছে। যতদূর মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘রুচির লড়াই শেষকালে বাহুবলে গিয়া ঠেকে’। হিরো আলম রুচির প্রশ্নে জনপ্রিয়তার নিরিখে ক্ষমতা কাঠামোতে নাক গলাতে গিয়ে কি সেই ‘বাহুবলের’ মোকাবিলা করছেন না? রাজনীতিতে পেশাজীবী হিসেবে শিল্পীদের অংশগ্রহণ যেমন আছে, তেমন আছে চিকিৎসক, শিক্ষক, ক্রীড়াক্ষেত্রের ব্যক্তিত্বদের। হিরো আলমের ক্ষেত্রে তার যেসব নাটক, সিনেমা, গান বা কর্মকা- সেগুলোর অনুমোদন দিচ্ছে না আমাদের প্রতিষ্ঠিত কলা ও কৈবল্যবাদ, শিল্পী সমাজ ও তার রুচির মানদ-। কিন্তু জনপ্রিয়তার জায়গায় তার ভিউয়ের হিসাব তাকে একই সঙ্গে শক্তি জোগাচ্ছে। নিউ মিডিয়ার দৌরাত্ম্য বলি আর প্রভাব, যাই বলি না কেন, এর প্রভাবে হিরো আলমের মতো ‘প্রবলেম চাইল্ড’ আমাদের ক্ষমতা কাঠামোর সমস্যাগুলোকে প্রকট আর বীভৎসভাবে আগামীতে আরও বেশি করে প্রকাশ করে ইতিহাসের অংশ হবে। হোক সেটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে।
নির্বাচন তো যে কেউ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হচ্ছেন তা নিশ্চিত করে বলার সময় এখনো আসেনি। তবে কে হচ্ছেন না, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। এ তালিকায় রয়েছেন র্যাপার কেনি ওয়েস্ট। এবারের নির্বাচনে ১৬ কোটি ভোটের মধ্যে মাত্র ৬০ হাজার ভোট পাওয়া কেনি ওয়েস্ট অবশ্য হাল ছাড়ছেন না। ২০২৪ সালেও তিনি প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন বলে এরই মধ্যে টুইটার পোস্টের মধ্য দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন। তবে তার প্রার্থিতার খবর বিনোদন পাতা পার হয়ে নিয়মিত খবরে জায়গা পায়নি। আমাদের হিরো আলম প্রধান শিরোনামে উঠে এসেছেন। তিনি অন্য ধরনের বার্তা ও বয়ান নিয়ে হাজির হয়েছেন।
এই উপনির্বাচনে তিন লাখ ভোটারের মধ্যে হিরো আলম পেয়েছেন মাত্র ৫,৬০৯ ভোট। জয়ী প্রার্থী পেয়েছেন ২৮,৮১৬ ভোট। প্রাপ্ত ভোটের গড় হিসেবে হিরো আলম তেমন প্রতিদ্বন্দ্বী নন এখানে। কিন্তু হিরো আলমকে কেন মার খেতে হলো? তার এই নিগৃহীত হওয়ার পেছনে সিস্টেমের আক্রোশ কতটা আর নির্বাচনী সহিংসতা কতটা? এখানে জয়ী প্রার্থী ক্ষমতাসীন দলের হলেও নির্বাচন বয়কট করা দেশের প্রধান বিরোধী দল হিরো আলমের ওপর হামলার ঘটনায় যে বক্তব্য দিয়েছে, সেখানেও তুচ্ছতাচ্ছিল্য স্পষ্ট। ফলে দেশে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো আছে, সেখানে সরকারি দল এবং বিরোধী দল রুচির প্রশ্নে হিরো আলমের প্রতি একই মনোভাব পোষণ করে।
রবীন্দ্রনাথকে দিয়েই শেষ করি। পল্লী সমাজে তিনি বলেছেন, ‘আমরা এক দেশে আছি, অথচ আমাদের এক দেশ নয়।’ হিরো আলমকে আমাদের দেশে স্বাগতম।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক
