আকাশের ঠিকানায় তিন খোলা চিঠি

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৩, ১২:১৯ এএম

প্রিয় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

আজ তোমার জন্মদিন। এই বিশেষ দিনে তোমাকে ভালোবাসা জানাতে আমার এই খোলা চিঠি। অফুরন্ত সম্ভাবনাময় এক আলোকিত প্রাণ নিয়ে তুমি জন্মেছিলে এক নারীর গর্ভে, যিনি তোমার মা; আর বর্ধিত প্রাণ নিয়ে তুমি জন্মেছিলে ভারতবর্ষের গর্ভে, যে তোমার দেশমাতা।

‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা আমাদেরই বসুন্ধরা’ গান আমাদের সবার প্রাণের গান হয়ে গিয়েছে। যেকোনো অনুষ্ঠানের শুরুতে তোমার এই গান গেয়ে দেশবন্দনা করে তবেই আমরা অন্য গান-কবিতায় যাই। জানো এই চিন্তা হাজারবার মাথায় এসেছে যদি আমাদের জাতীয় সংগীত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ কোনো কারণে না হতো, তাহলে হয়তো ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ অথবা ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’ গানটি জাতীয় সংগীত হতো।

বর্ণিল জীবন তোমার। তোমার কাজ ও লেখালেখির জগৎ সম্পর্কে যেটুকু জানতে পারি তাতে মনে হয়েছে মানুষের জীবনের মৌলিক প্রয়োজন থেকে তোমার জ্ঞান অর্জন শুরু করেছিলে কৃষিবিদ্যা দিয়ে। তাই তো; কৃষি ছাড়া ভারতবর্ষের সন্তান হয় কী করে! লন্ডনে কৃষিবিদ্যা নিয়ে পড়তেও গিয়েছিলে। তারপর জরিপ ও রাজস্ব নিরূপণ ট্রেনিং, সরকারি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে চাকরি। তুমি স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলে। ১৮৯০ সালে বর্ধমান এস্টেটে সুজামুটা পরগনায় সেটেলমেন্ট অফিসারের দায়িত্ব পালনকালে ছোটলাটের বিরোধিতা করতে কুণ্ঠিত হওনি। বীর তুমি, তোমাকে স্যালুট জানাই। তুমি সাধারণের পক্ষের মানুষ, শোষিতের মানুষ, জনগণের মানুষ, তুমি ক্ষণজন্মা, তুমি বীর জীবন-প্রেমিক। তাই জীবনের ছবি এঁকে সাহিত্যের সব ক্ষেত্রে তোমার বিচরণ দেখি।

আমার ছোটবেলায় তোমার ‘হতে পাত্তেম একটি মন্ত বড় বীর, কেবল গোলাগোলে গোলে আমার মাথা রয় না স্থির’ কবিতাটি পাঠ্য ছিল। কতবার কারণে, অকারণে কবিতাটি পড়তাম। তখন এক রকম বুঝতাম বয়স হতে হতে আরও ভালো করে বুঝেছি। কী হাস্যরসের মধ্য দিয়েই না তুমি বাঙালি জীবনের অদ্ভুত কৌতুককে ধরেছো, কি যে মুনশিয়ানা তোমার লেখার। তারপর অজস্র কবিতা, গান, নাটক কত যে লিখেছো!

জীবনের শেষ ১০ বছর শুধু নাটক লিখেছিলে, পৌরাণিক, সামাজিক, ঐতিহাসিক সব ধরনের নাটক। তুমি কত কথা বলতে চেয়েছো, কত কথা জানিয়ে গেছো আমাদের জন্য। এই অনবরত নাটক লিখে যাওয়া তারই প্রকাশ। তোমার বিপুল জীবনসম্ভারের কতটুকু আমরা নিতে পারলাম তা আমার জানা হলো না। কিন্তু তুমি দিতে চেয়েছিলে উজাড় করে।

গান দিয়ে শুরু করেছিলাম, গান দিয়েই শেষ করব আমার এই চিঠি। তোমার গান বাংলা সাহিত্যে ‘দ্বিজেন্দ্রগীতি’ নামে পরিচিত। কবিতা, গান, নাটক তোমার সব লেখায় দেশ এসেছে বিপুল গৌরবে। এসেছে মানুষ, প্রকৃতি, প্রেম।

নাটকের জন্য লেখা হলেও পরে এগুলো গান হিসেবেও বিপুল জনপ্রিয় হয়। গানের কথা তো আছে, যে সুর তুমি রচনা করেছো, তার ভেলায় চড়ে সব কথা মর্মমূলে পৌঁছে যায়।

‘আমরা এমনি এসে ভেসে যাই, আলোর মতন হাওয়ার মতন, কুসুম গন্ধ রাশির মতন’

image

এই সুর এক অদ্ভুত রকম ভেসে যাওয়ারই অনুভূতি জাগায়, বেদনা জাগায় না। যেন ভেসে যাওয়ার স্রোতের আমিও একটি কণা এই অনুভূতি তোমার লেখা থেকে পাই। বহুভাবে তুমি আমাদের জীবনবোধকে সমৃদ্ধ করেছো। এই সুর এক অপূর্ব আনন্দে ভাসিয়ে রাখে। প্রায় রোজ সকালে এই গানটি আমার শুনতে হয়, শুনতে ভেসে যাওয়ার বেদনা হয় না।

খুব অল্প বয়েসে গান-সুর রচনা শুরু করেছিলে। বিলেত যাওয়ার সময় মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১০৮টি গান নিয়ে প্রথম গীতি সংকলন ‘আর্যগাথা’ (প্রথম পর্ব) ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয়। কী আশ্চর্য! মাত্র ১৭ বছর বয়সে তোমার এই লেখাগুলোর মধ্যে প্রকৃতির মনোরম সৌন্দর্য আর লাবণ্য, জগতের শোক-জরা, দুঃখ-বিষণনতা, ঈশ্বরভক্তি, এবং স্বদেশপ্রেম প্রকাশ পেয়েছে।

তোমার অপূর্ব সব প্রেমের গান ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত ‘আর্যগাথা’য় (দ্বিতীয় ভাগ) স্থান পায়, যা তোমার দাম্পত্য সুখ-মগ্ন অনুভূতির প্রকাশ।

‘আজ যেন সে প্রাণের মতন তাহারে বেসেছি ভালো! উঠেছে মলয় বাতাস ফুটেছে আজ মধুর আলো’

আরেকটি গান ছিল ‘বসি যে কুসুম কাননে/ আর অমল অরুণ উজল আভা/ ভাসিতেছিল সে আননে।’

কীর্তন ঢঙে রচিত গানটি রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় ছিল। ভাবতে খুব ভালো লাগে তোমাকে জীবন অকৃপণভাবে এমন প্রেম দিয়েছিল, আর সেই অনুভূতি প্রকাশে তুমি পূর্ণ করে গেছো সাহিত্যের ডালি।

পরিহাসমূলক গান রচনাতেও সিদ্ধহস্ত ছিল। এ কথা ভেবে একটু অবাকই লাগে, একই চিত্তে এত রূপ!

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে গুরুর কাছে গান তালিম গ্রহণ, পরে বাবার কাছে সংগীতে তালিম নেওয়া এবং বিলেতে পড়তে গিয়েও সেখানকার নাটক এবং গান তথা মিলনসাহিত্যে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে তোমার গান ভারতীয় রাগসংগীতে কাঠামোয় পাশ্চাত্য সংগীত চলের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটায়।

প্রিয় কবি ও লেখক আজকের মতো শেষ করছি চিঠি। তোমার লেখাগুলো যদি আজ আমরা আরও ভালো করে পড়তাম তাহলে আমাদের জীবনের সব বোধ ও মনোভাব আর সুন্দর হতো, যা পেয়েছি তার তুলনা নেই। আমাদের জীবন তোমার কাছ থেকে পাওয়া অনুভূতির সম্ভারে আরও ধনী হয়ে উঠলেই হয়তো আশপাশটা আরও পুষ্পে ভরে উঠত। ইস, কোনো দিন না দেখা এই ভক্তের ভালোবাসা যদি কোনোভাবে তোমার কাছে পৌঁছা তো!

ইতি

তোমার গুণমুগ্ধ

ড. রওশন আরা বেলী

প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ

আমার যখন প্রচণ্ড অসহায় লাগে আমি মাকে চিঠি লিখি, কিন্তু সেই চিঠি কোনোদিন পোস্ট করি না। আজ মায়ের কাছে চিঠি লিখতে গিয়ে আর লেখার কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। তাই ভাবলাম আপনাকে লিখি। আপনি কেমন আছেন স্যারজি? ওহ আমাকে চিনতে পারছেন নাতো? আমি তেমন কেউ না। শুধু এটুকু বলি, আপনার একজন অনুরাগী। আমার প্রজন্মের অনেকেই আপনার অনুরাগী। যদিও নিজেকে খুব ক্ল্যাসি পাঠক প্রমাণ করার চক্করে কেউ মুখ ফুটে বলে না। আমি সম্ভবত ততটা ক্ল্যাসি পাঠক না।

আমি যে রকম সমস্যা জর্জরিত একটা জীবন পেয়েছি, আমি যদি আপনার কাছে হিমু হওয়ার ফিলোসফি শিখে না রাখতাম তাহলে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে পারতাম না। আমার মনে আছে আপনি তখনো বেঁচে, বিভিন্ন জায়গায় মিডিয়াতে আপনার সাক্ষাৎকার দেখে আমরা বন্ধুবান্ধবরা কেন যেন পুরোপুরি খুশির হাসি হাসতে পারতাম না। চিন্তিত হয়ে ভাবতাম, লোকটা বুড়ো হয়ে যাচ্ছে তো, উনি মারা গেলে কীভাবে থাকব আমরা? অথচ, আমরা এখন বড় হয়ে গেছি, বলতে গেলে আমরাই বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। এখন আমরা আমাদের অনেক আপন মানুষের চিরবিদায়ে পরিমিতভাবে কাঁদি। কিন্তু যেদিন আপনি চলে গিয়েছিলেন, আহারে আমাদের কান্না। আহারে, আমরা হিমুরা! মনে আছে, আপনার মৃত্যুর পরদিনই সাহিত্যিক আনিসুল হকের বিশাল লেখা ছেপেছিল একটি জাতীয় দৈনিকে। দেখে আমি একই সঙ্গে অবাক আর ঈর্ষান্বিত হয়েছিলাম। উনি কী সুন্দর দ্রুত চিন্তাভাবনা প্রসেস করে বিশাল এক শোকগাথা লিখেছিলেন। আমরা হিমুরা তখনো ঘোর ডিনাইয়ালে আছি, আমরা সবাই তখনো হাউমাউ করে কান্নার মতো ছেলেমানুষি করছি। আমরা যারা নব্বইয়ের শুরুর দিকে জন্মেছিলাম, যখন বাচ্চাদের হাতে আইপ্যাড না বই ছিল, আমাদের জন্য আপনি ঠিক আত্মীয়ও ছিলেন না, বন্ধুও ছিলেন না, আপনি ছিলেন ‘হিমু’। ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্টের সময় আপনি এসে সবসময় পাশে দাঁড়িয়েছেন, কাঁধে হাত রেখেছেন। দৈনন্দিন দুঃখ-কষ্টের নিরানন্দের জগতের পাশাপাশি আমাদের জন্য ছিল একটা রহস্যময় হুমায়ূনীয় জগৎ। যে জগতে কেউ কাউকে এবিউসিভ বিহেভ করে না!

ছাত্রজীবনে কোনো বন্ধু অন্য স্কুলে চলে যাচ্ছে, কোনো কাজিন অন্য দেশে পড়তে যাচ্ছে, কারও জন্মদিন উৎসব হচ্ছে, সে রকম সব উপলক্ষে আমাদের জেনারেশনের একমাত্র উপহার ছিল, নতুন চকচকে হুমায়ূন আহমেদের বই। কৈশোর জীবনে তখনো আমি বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত নই, তখন আমার মা হয়তো চা নিয়ে ঘরে এসে দেখে গেল, আমি হো হো করে হাসছি, একটু পর চায়ের কাপ নিয়ে যাওয়ার জন্য আবার এসে দেখতে পেল আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি। আম্মুর চোখেমুখে বিরক্ত, ‘এই হতচ্ছাড়া হুমায়ূন আমার মেয়েটার মাথা খেলো!’

এই যে আমাদের মাথা খারাপ যাদের, আমরা দিব্যি কারও বলা মিথ্যা কথা হেসে উড়িয়ে দিতে পারি, কুৎসিত কথা হজম করে নিতে পারি, অসহনশীল সহকর্মীর সঙ্গে দিনের পর দিন নিজের মন্তব্য ব্যক্ত না করে থাকতে পারি। হ্যাঁ, আপনি এভাবে আমাদের মাথাটা কিঞ্চিৎ খারাপ করে রেখে গেছেন বলেই আমরা বেঁচে আছি, সুইসাইড করে ফেলিনি। এই জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

image

আপনার তৈরি করা হিমুদের পরিণতি দেখে যেতে পারেননি! সমাজের তথাকথিত মাপকাঠিতে বিচার করলে হিমুদের বিশেষ কোনো সাফল্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু হিমুদের সাফল্য শুধু অন্য আরেকজন হিমুই দেখতে পায়, খালি চোখে দেখা যায় না। হিমুর সাফল্য দেখতে ওইরকম স্পেশাল ‘হিমু লিটমাস’ লাগে। কিছুদিন আগে এক ভদ্রলোক আমার ওপর খুব রাগ করলেন, আমি তার একটা কাজে সহযোগিতা করিনি বলে। পরিচিত সবাইকে তিনি বলছেন, তিনি নাকি কাজটা আমার স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য দিয়েছেন। মূল বিষয় ছিল, ঐ কাজের জন্য উনি আমারই পরিচিত দুতিনজনকে অনুরোধ করেছিলেন, তারা অপারগতা প্রকাশ করায় তিনি বাধ্য হয়ে আমার ঘাড়ে চাপাচ্ছিলেন। এমন একটা ভাব করছিলেন, উনি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই চিন্তিত! মূলত, উনি এমন পার্সোনালিটির লোক যিনি ‘না’ শুনতে পারেন না! এই যে দ্বৈত আচরণ, এসব থাকত না যদি ওই ব্যক্তি আপনার জগতে ঘুরে আসতেন। এই যে হিমুরা ভান ধরতে পারে না, হিমুরা ভান ধরতে পারে না বলে ওরা তথাকথিত জীবনযুদ্ধে পিছিয়ে পড়ে, কিন্তু ওরা কিন্তু শান্তিতে থাকে, মনের সর্বোচ্চ শান্তি তারা স্পর্শ করতে পারে। তবে হিমুদের সমাজের দৃষ্টিতে জয়ী হওয়া শেখালেন না, এই নিয়ে মাঝেমধ্যে আক্ষেপ হয়! আপনি শিখিয়েছেন আকাশে মেঘের প্রতিশ্রুতি নিয়ে রান্নার আয়োজন করতে, আপনি অবসর কাটাবার জন্য চা খেতে খেতে বিবিধ গল্প-উপন্যাস পড়ার নেশা ধরিয়ে দিয়েছেন, রবীন্দ্রসংগীত অথবা কবিতা আওড়াতে আওড়াতে বৃষ্টিতে ভেজা আপনার কাছে শেখা। আমরা এখনো বৃষ্টি হলেই ভিজি, জ্যোৎস্নাময় রাতে অন্ধকার অনুসন্ধান করি! কিন্তু আমরা জয়ী হইনি, আমরা তো সমাজের মানদণ্ডে মানুষ হিসেবে নিম্ন শ্রেণির হয়ে রয়েছি!

প্রিয় স্যার আপনিই শিখিয়েছেন কীভাবে সীমাহীন মমতার হাত এড়িয়ে দ্রুত চলে যেতে হয়, কীভাবে ভয়ংকর দুঃসময়ে ইস্পাতের মতো শক্ত থাকা যায়। আপনি শিখিয়েছেন প্রিয় মানুষ ছেড়ে চলে গেলে একা হেঁটে যেতে হয়। জি স্যার, আমরা এখনো হেঁটেই যাচ্ছি! যেভাবে আপনি এক অদ্ভুত অস্তিত্ব তৈরি করে দিয়েছেন, তাতে করে আপনার মতো করেই আপনাকে বলছি স্যার, ‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো এক বরষায়........’

ইতি

আপনার অনুরাগী

মদিনা জাহান রিমি
 

প্রিয় কাজী আনোয়ার হোসেন

কাজীদা, আমার পরিষ্কার মনে আছে আপনার সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার দিনটির কথা। ১৯৯২ সালের শরতের এক ঝকঝকে বিকেল ছিল সেদিন। আমি রহস্য পত্রিকার সহকারী সম্পাদক নিয়াজ ভাইয়ের (বিখ্যাত অনুবাদক নিয়াজ মোরশেদ) জন্য লেখা একটি ফিচার নিয়ে যাচ্ছিলাম। দোতলার কাঠের সিঁড়িটি পার হতেই ছলকে উঠল বুকের রক্ত! আপনি বসে আছেন একটি চেয়ারে, কথা বলছেন এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে। (সম্ভবত উনি ছিলেন সেবার রোমান্টিক উপন্যাস লেখিকা রোকসানা নাজনীন) উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রঙের, অন্তর্ভেদী চোখের বাংলা রহস্য সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষকে সেদিন মুখোমুখি দেখে ঘাবড়েই গিয়েছিলাম। নিতান্তই বোকার মতো প্রশ্ন করে বসেছিলাম নিয়াজ ভাই কি আছেন? অথচ আর তিন পা এগোলেই রহস্য পত্রিকার যে টেবিলে বসে নিয়াজ ভাই লেখা সম্পাদনা করেন সেটি নজরে আসে। আলোচনায় বিঘ্ন ঘটায় এবং অযাচিত এ প্রশ্নে আপনার ভ্রু সামান্য কুঞ্চিত হয়ে গিয়েছিল। আপনি মুখ তুলে বলেছিলেন আছেন বোধ হয়। বাঁ হাতখানা তুলে ইঙ্গিত করেছিলেন আমাকে এগিয়ে গিয়ে দেখতে। আমি এগিয়েও গিয়েছিলাম দুই কদম। তারপর ফিরে এসে আবারও বাগড়া দিলাম আপনাদের কথায়। আমি অনীশ দাস অপু। আপনাদের পত্রিকায় লিখি। আপনি বোধকরি বিরক্ত হতে গিয়ে হেসেই ফেললেন আমার নির্বুদ্ধিতায়। বললেন পড়েছি তো আপনার লেখা। আপনি বেশ ভালো লেখেন। প্রিয় কাজীদা, ওই সময় শরতের নীলাকাশের সমস্ত সাদা মেঘ আমার বুকের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছিল। আমি অনীশ দাস অপু, অতি নগণ্য এক লেখক- অনুবাদক, তার লেখা পড়েছেন জীবন্ত কিংবদন্তি কাজী আনোয়ার হোসেন শুধু তাই নয়, তিনি আমার লেখার প্রশংসা করছেন! আমার বুকের ভেতরে শুধু শরতের মেঘমালা নয়, খুশির চোটে গোটা মহাকাশ ঢুকে যাওয়ার কথা! আমি সেদিন নাচতে নাচতে রপ অফিসে ঢুকেছিলাম। আমার বত্রিশ পাটি দাঁত বেরোনো মুখ দেখে নিয়াজ ভাই ভুরু নাচিয়ে জানতে চাইলেন কী ব্যাপার, আজ এত খুশি কেন? আমি তখন শুধুই হাসছিলাম, শুধুই হাসছিলাম। হঠাৎ মনে পড়ল, আরি, কাজীদাকে তো সালাম দেওয়া হয়নি। ছোটবেলায় কোনো শিক্ষককে পথ চলতে দেখলে আদাব না দিলে অপরাধ বোধে ভুগতাম। দৌড়ে গিয়ে সালাম দিয়ে আসতাম। কাজীদাও তো আমার গুরু! আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে সালাম দিতে ভুলে যাওয়াটা আমার কাছে অপরাধই মনে হচ্ছিল। কিন্তু ছুটে গিয়ে দেখি আপনি চলে গেছেন।

প্রিয় কাজীদা, আপনার সঙ্গে আমার দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল ১৯৯৪ সালের নভেম্বর মাসে। আমি সেবা প্রকাশনীতে দুঃস্বপ্নের রাত নামে একটি বইয়ের পান্ডুলিপি জমা দিয়েছিলাম মাস ছয় আগে বইটির তিনটি অধ্যায় লিখে দিয়ে। নিয়ম ওটাই ছিল কাহিনি সংক্ষেপসহ তিন চ্যাপ্টার লিখে জমা দিতে হবে। ওই লেখা পছন্দ হলে তারপর আপনি লেখকদের বাকিটা লিখতে বলতেন। আপনার সঙ্গে এর আগে ফোনে কথা হয়েছিল। আমি তখন তারকালোক পত্রিকায় চাকরি করি। এক দিন দুপুরে আমার একটি ফোন এলো। আমি হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে জলদগম্ভীর একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো যেন মাসুদ রানার বস রাহাত খান কথা বলছেন আমি কাজী আনোয়ার হোসেন বলছি। রাহাত খানের সামনে গেলে অকুতোভয় স্পাই মাসুদ রানার বুক শুকিয়ে যায় আর পেটের ভেতর ফরফর করে প্রজাপতি আর আমি আপনার কণ্ঠ শুনে এমন ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, হাত থেকেই পড়ে গিয়েছিল রিসিভার! আপনি দুঃস্বপ্নের রাত নিয়ে কথা বলতেই ফোন করেছিলেন। আমার পান্ডুলিপিটি আপনার খুব পছন্দ হয়েছিল। আপনি ট্রেসিং পেপারে মুক্তোর মতো সবুজ হস্তাক্ষরে লিখে দিয়েছিলেন লেখকের ভাষা সুন্দর, বর্ণনা সাবলীল। লেখককে যোগাযোগ করতে বলুন। আমি যোগাযোগ করেছিলাম। দুঃস্বপ্নের রাতের গল্পটি আপনি আমার মুখ থেকে শুনেছিলেন আপনার তিনতলার অফিসে বসে, যেখানে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়ে বিরাট একটি অ্যাকুরিয়াম, অজস্র রংবেরঙের মাছ ওখানে খেলা করছে। আমি মুগ্ধ হয়ে আপনার ঘরের চারপাশে চোখ বোলাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম এই সেই স্বপ্নগুরুর ঘর যিনি আমার মতো লাখ লাখ পাঠক সৃষ্টি করেছেন দেশজুড়ে!

image

আপনি একজন মনোযোগী শ্রোতা ছিলেন গল্প শোনার সময়। দুঃস্বপ্নের রাতের প্রকাশের schedule পরের মাসেই রেখেছিলেন। বইটি প্রথম মাসেই সবগুলো কপি বিক্রি হয়ে যাওয়ায় আমি সেবাতে নিয়মিত লিখতে উৎসাহী হয়ে উঠি এবং আপনি কখনো আমার কোনো পান্ডুলিপি ফেলে রাখেননি। বরং সব সময় আমার লেখার প্রশংসা করেছেন। মনে আছে সেবা থেকে বেরোনো আমার প্রথম গল্প সংকলন আতঙ্কের প্রহর পড়ে আপনি আপনার ছোট ছেলে কাজী মাইমুর হোসেনকে বলেছিলেন এত চমৎকার গল্প অনীশ কোথায় পেল! মাইমুর নিজেই আমাকে বলেছিল কথাটা আব্বা, আপনার আতঙ্কের প্রহরের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কাজীদা, সেদিন আবারও মহাকাশটা আমার বুকের গভীরে ঢুকে গিয়েছিল!

প্রিয় কাজীদা, আপনার সঙ্গে আমার ২০১০ সাল পর্যন্ত নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তারপর নানান অসুখে এবং অসুস্থতায় আপনি প্রায় সবার সঙ্গেই যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছিলেন। তত দিনে আপনার বড় ছেলে কাজী শাহনূর হোসেন প্রকাশনীর দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন যদিও নেপথ্যে আপনার ভূমিকাই ছিল প্রধান। যেকোনো বই প্রকাশের আগে আপনার কাছে পান্ডুলিপি চলে যেত এবং আপনার সম্পাদনার magic touch ওতে থাকত। যদিও আমার লেখায় আপনাকে খুব কমই হাত দিতে দেখেছি। তবু যেসব জায়গায় এডিট করেছেন, সব মনে রাখতাম। ওই ভুলের আর পুনরাবৃত্তি হতো না। আজ যেটুকু লেখা বা সম্পাদনা শিখেছি তার পেছনে আপনার অবদান অনেকখানি।

প্রিয় কাজীদা, ২০১০ সাল থেকে আপনার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা না হলেও আপনার প্রতিটি জন্মদিনে, বাংলা নববর্ষে এবং দুই ঈদে আপনাকে শুভেচ্ছা জানাতাম। আপনি শুভেচ্ছার জবাব দিতেন। আজ ১৯ জুলাই আপনার জন্মদিন। আপনার বাংলা লিংকের ফোন নম্বরটি এখনো আমার কাছে আছে কিন্তু ওখানে আর কখনো লেখা হবে না happy birthday, dear qazi da! Many happy returns of the day! আপনিও আর কোনো দিন জবাবে লিখবেন না thank you, anish!! তবে আপনি চিরদিনই বুকের মধ্যে থাকবেন গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসায়

ইতি

আপনার গুণমুগ্ধ ভক্ত পাঠক

অনীশ দাস অপু

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত