বন্ধের দিনের গণতন্ত্র এখন খোলার দিনে

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৩, ০৯:২৮ পিএম

রাজনৈতিক বড় দুই শক্তির তোড়ে গণতন্ত্র, জনগণ, আন্দোলন ধরনের শব্দগুলো এখন একেবারেই আপেক্ষিক। তারা যে যা করেন সেটাই গণতন্ত্র। আবার এক দলের কাছে যেটি গণতন্ত্র, অন্যের কাছে সেটি স্বৈরতন্ত্র। একপক্ষের কাছে যা আন্দোলন, অন্যপক্ষের কাছে সেটি সন্ত্রাস-নৈরাজ্য। নিজস্ব সুবিধা মতো শব্দার্থ ও উদাহরণ বের করে নিতে পারছেন তারা। এক্ষেত্রে ব্যাকরণ-অভিধানও অসহায়। তাদের কাছে ‘জনগণ’ শব্দের অর্থও পাল্টে গেছে। জনগণ বলতে তারা নিজ দলের কর্মী-সমর্থকদের বোঝেন। কথিত এই জনগণকেও তারা এই বুঝে অভ্যস্ত করে নিয়েছেন। দল যা বলে তাই সমর্থন করে এই জনগণেরা।

গণতন্ত্র, গণদাবি, জনগণ ইত্যাদির দোহাই দিয়ে সব এস্তেমালের সুযোগ কেবল রাজনীতিতেই খাটে। সেইসঙ্গে সংবিধানের অজুহাত। ক্ষমতার রাজনীতিতে তা বেশি লাগসই-টেকসই। জনভোগান্তি যেন না হয়, সংবিধানের এ ধারা রক্ষায় কদিন আগেও বিরোধী দলের কর্মসূচির অনুমতি মেলেনি। এক পর্যায়ে ছুটির দিনে কর্মসূচির অনুমতি দিয়ে সংবিধান রক্ষা করা হয়েছে। বিরোধী দলের কর্মসূচিগুলো হয়েছে শুক্র-শনিবার। বন্ধের দিনের গণতন্ত্র এখন খোলার দিনেও চলে এসেছে। তাও আবার পাল্টাপাল্টি। বিরোধী দল সভা-সমাবেশ ডাকলে সেদিন সরকারি দলও ডাকছে। এটিও গণতন্ত্রের সৌন্দর্য-চমৎকারিত্ব। পুলিশের দিক থেকে অনুমতিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। জনদুর্ভোগের প্রশ্নও অবান্তর। লক্ষণীয় হচ্ছে, এ ব্যাপারে দুদলের মধ্যে বেশ মিলমিশ। রবিবার রাতে একটি টেলিভিশন টক শোতে কথা হচ্ছিল এ নিয়ে। জনদুর্ভোগ স্বীকার করে বিএনপি দলীয় আলোচক সাবেক এমপি হারুনুর রশীদ বলছিলেন, সৃষ্টির কিছু বেদনা থাকেই। তার কাছে সৃষ্টি মানে সরকারের পতন ঘটিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় করা। আর আওয়ামী লীগ নেতা শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের যুক্তি- তারা এত এত উন্নয়ন করেছেন তা জানান দিতে সমাবেশ করা লাগছে। আর সমাবেশে উপচেপড়া মানুষ রাস্তায় চলে আসায় কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছে। তা সহনীয়-বরণীয়।

জনদুর্ভোগ নিয়ে তাদের এমন যুক্তির সঙ্গে টক শোর অংশীজন হিসেবে আমি যোগ করলাম নির্বাচন একই দিনে হবে। দুদলের জন্য আলাদা দিনে নির্বাচন হবে না। সেই বিবেচনায় তারা একই দিনে সমাবেশকে জনগণের জন্য তেমন দুর্ভোগ না ভাবলে, সেই ভাবনার স্বাধীনতা তো তাদের আছেই। দেশের জনগণ তো তারা তারাই। বাদবাকিরা কি আর জনগণের আওতায় পড়েন? আমার কথা তাদের বেশ মনে ধরেছিল বলে তাৎক্ষণিক মনে হয়েছে। এটাই বাস্তবতা। দুর্ভোগ আর স্বস্তির অর্থও তারা ঠিক করে দেওয়ার হিম্মত রাখেন। পারেন গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতেও। গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি মীমাংসায় আসা। যার যার প্রয়োজন বা চাহিদা দৃষ্টে তা তারা করে চলছেন। দাঙ্গা-হানাহানিকেও ‘আন্দোলন-কর্মসূচি’ নামকরণের অধিকার-ক্ষমতা সবই রাখেন। তারা যা করেন সবই শান্তি আর গণতন্ত্রের চর্চা। ক্ষমতা আয়ত্ত করতে জনতাও তাদেরই কব্জায়।

তাদের দফারফাও মিলে যায়। রকমফেরটা নিজেদের মতো। আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা মানেই শান্তি-উন্নয়ন। আর বিএনপিরও ক্ষমতায় আসার নমুনা মানে গণতন্ত্র কায়েমের লক্ষণ। তা কারও পদযাত্রায়, কারও শান্তিযাত্রায়। আওয়ামী লীগ অবিরাম ক্ষমতা নিশ্চিত রাখতে চায়, বিএনপি সেই নিশ্চয়তা আর দিতে চায় না। তাদের এই চাওয়াই গণতন্ত্র। আর ভেতরের বেদনা অন্যরকম। বিএনপির চুন খেয়ে মুখ পুড়ে আছে। এ সরকার দই দিলেও তাদের কাছে চুনই মনে হবে। এর বিপরীতে আওয়ামী লীগের শঙ্কা বিএনপি কোনোভাবে ক্ষমতায় চলে এলে তাদের কচুকাটা করবে। বিপদে পড়বে আওয়ামী লীগের জনগণ। তাই নিয়তির ওপরে সব ছেড়ে দেওয়ার অবস্থা নেই কারোরই। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা ক্ষমতাহীন বিএনপি কোনোটিই আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামও নয়। ঘরদোর ছেড়ে চিল্লায় চলে যাওয়ার দল তাবলিগও নয়। দেশপ্রেম-দেশসেবাসহ তাত্ত্বিক নানা কথা বলা হলেও ক্ষমতাই তাদের কাছে মুখ্য। ক্ষমতা ছাড়া অন্য কিছু গুরুত্বহীন তাদের কাছে। ক্ষমতামুখী দলের ধর্মই হচ্ছে, মসনদে থাকলে একমাত্র চিন্তা টিকে থাকা এবং তাদের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা। আর ক্ষমতাহীন থাকলে ক্ষমতাসীনকে হটিয়ে গদিনশীন হওয়া। সেইক্ষেত্রে টানা সোয়া এক যুগ ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি কিছুদিন আগে আর রাখঢাক না রেখে এক দফার কথা জানিয়ে দিয়েছে। আর সেই দফাটি হচ্ছে, ক্ষমতাসীনদের হটানো। যার আরেক অর্থ নিজে ক্ষমতাসীন হওয়া। সেই ক্ষমতাটাও কার্যকরভাবে জনতানির্ভর হলে আশা থাকে। আর জনতানির্ভরতার অর্থ নির্বাচন। ২০১৪ বা ১৮ স্টাইলের নির্বাচন না হলে ক্ষমতার গ্যারান্টি পাচ্ছে না আওয়ামী লীগ। আবার ২০১৪-১৮’র মতো নির্বাচন ঠেকাতে না পারলে সেই গ্যারান্টি থাকে না বিএনপির। মূল সমস্যা সেখানেই। 

বিএনপি নিজেরা মনে করে এবং জনগণকেও মনে করাতে চায়, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ দশটির বেশি সিট পাবে না। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ক’দিন বেশি বেশি করে বলছেন, এ ভয়েই আওয়ামী লীগ নির্বাচন দেবে না। এর জবাবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলে যাচ্ছেন, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ উন্মুখ হয়ে আছে শেখ হাসিনাকে আবারও ভোট দিয়ে ক্ষমতায় রাখতে। বড় ইন্টারেস্টিং দুদলের এমন অঙ্কশাস্ত্র। উভয়েরই দাবি কেবল তারাই দেশপ্রেমিক। আর অন্যরা দেশ ধ্বংসকারী। যার যার দলীয় জনতাও এমনই ভাবে। ভাবাতেও চায়। নিজস্ব যুক্তি-শক্তিতে তারা বড় কড়া। সংখ্যায় তাদের দফারও বেশ মিল। সরকারের পতন বনাম সরকারের থেকে যাওয়ার এক দফার মধ্যে ডেঙ্গু মহামারী বা নিত্যপণ্যের দরদাম নিয়ে কারোরই দফা নেই। এ প্রশ্নে বেশ মিল তাদের। গণমাধ্যমের নিউজ ভ্যালুতেও ডেঙ্গুতে হালি-হালি মৃত্যুর চেয়েও দুদলের বড় নেতাদের বক্তব্যের ওজন বেশি। ক্ষমতার এ দাপটের কাছে জনতা কী চায়, সেটা মোটেই মুখ্য নয়। জনতার ক্ষমতার প্রতি তাই আস্থা না থাকলেও চলে। চলছে। তাদের দুর্ভোগ বিবেচনার বিষয়ই নয়। পুলিশের কাছেও জনদুর্ভোগ এখন আর সাবজেক্ট-অবজেক্ট নয়। রাজধানী কেন, গোটা দেশ স্থবির হয়ে গেলেও জনতার দুর্ভোগ ‘জনদুর্ভোগ’ শব্দটি গত ক’দিন যেন তাদের অভিধান থেকে উঠে গেছে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে জনগণকে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা জানানো হয় নিজেদের সুবিধা মতো। গণতন্ত্রের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘জনতার ক্ষমতা’, ‘নাগরিক শাসন’, ‘জনগণের শক্তি’র কথাও শোনানো হয়। গণতন্ত্রকে এই মডেলে নিয়ে আসার কৃতিত্বে কে বেশি আগোয়ান, তা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। তবে, কেউ যে কারও চেয়ে কম নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতার বাইরের অনেকে গণতন্ত্র ও আন্দোলনের এ মডেলের নাটাই হারিয়ে এখন নিজেরাই ঘুড়ির পাকে পড়ে গেছেন। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নাটাই চলে গেছে বিদেশে। জনতার ক্ষমতাকে অবিরাম উপেক্ষা করার এ ফল তাদের এখন কেবল খেতেই হচ্ছে না, হজমও করতে হচ্ছে। যার এক চিলতে সম্প্রতি দেখতে হয়েছে ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে। টেনেটুনেও ভোটার খরা আড়াল করা যায়নি। ৩ লাখ ২৫ হাজার ২০৫ জন ভোটারের মধ্যে ৩৭ হাজার ৩৭ জন ভোট দিয়েছেন। নির্বাচনের এ আচানক শো প্রদর্শন হলো দেশের কূটনৈতিক পাড়ায়। দেশের নামিদামি এ নির্বাচনী এলাকার প্রায় ৮৯ শতাংশ ভোটার ভোটই দেননি। মোট ভোটের ৮ শতাংশে (২৮ হাজার ৮১৬ ভোটে) জিতেছে আওয়ামী লীগ প্রার্থী। আলোচিত হিরো আলম পাঁচ হাজার ৬০৯ ভোট। আর বোনাস হিসেবে বাংলা মাইর। ঢাকার বিদেশি কূটনীতিক এবং সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলও দেখলেন-জানলেন। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য অংশীদারত্বমূলক নির্বাচনের জন্য বিদেশিরা যখন বাংলাদেশের ওপর অবিরাম চাপ বাড়াচ্ছেন তখন যেনতেন এক প্রার্থীকেও সহ্য করতে না পারা এবং তার ওপর ন্যক্কারজনক হামলার মধ্য দিয়ে জনতার ভ্যালু স্পষ্ট। ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব জনতারাই বা সেদিন গেলেন কোথায়? জনতার এই মন-মননকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ক্ষমতাকে টপ প্রায়োরিটি দিয়ে জনতাকে উচ্ছিষ্টের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার লাগামে দেশি-বিদেশি যেই টানই পড়ুক, চমৎকার ভেবে এতে অমত কার? বলার একটুও অপেক্ষা রাখে না যে, এ সুযোগটাই দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাচ্ছেন বিদেশি কূটনীতিকরা। তাদের কূটনৈতিক শিষ্টাচার মানার ছবক দেওয়া এত সহজ নয়, যত সহজে নানান কিছু বোঝানো যায় জনতাকে। এই জনতাকে অন্ধকারে রেখে ক্ষমতা নিষ্কণ্টক রাখায় সক্ষমতা আর বিদেশি পেশাদার কূটনীতিকদের বুঝ দেওয়া এক বিষয় নয়। সামনে বা আড়ালে এর ফয়সালা না হলে সূচি আর কর্মসূচি যতই চলুক, সামনে ভিন্ন কোনো দৃশ্যপট রোখা অসাধ্য হয়ে উঠতে পারে। তা বুঝতে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ হওয়া জরুরি নয়।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত