এক দফা দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে বিএনপি। আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কৌশল ও গতিপ্রকৃতি নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিক সাফি
দেশ রূপান্তর : মহাসমাবেশ নিয়ে এক ধরনের নাটকীয়তা হলো। শেষ পর্যন্ত অনুমতি পাওয়া গেছে। সমাবেশ কেমন হবে মনে করছেন?
মির্জা আব্বাস : যদি সরকার বাধা না দেয় তাহলে সমাবেশ ভালো হবে। ওরা এখন অজুহাত খুঁজছে যেন সমাবেশ করতে না পারি। আগামীকালের (আজকের) মহাসমাবেশ হবে শান্তিপূর্ণ।
কোনো চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, সহিংসতা করে মহাসমাবেশ নস্যাৎ করা যাবে না। কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান জানাব, আমাদের শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার ব্যবস্থা করবেন। অন্যথায়, দায়ভার বহন করতে হবে সরকার এবং যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের। এ আন্দোলন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন। মানুষের যে উত্থান এটাকে রুখে দেওয়ার জন্য তারা (সরকার) একটা নতুন চক্রান্ত শুরু করেছে। পাল্টা কর্মসূচির মাধ্যমে তারা (সরকার) পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করতে চাইছে।
দেশ রূপান্তর : অনেক ঘটনার পর নয়াপল্টন সমাবেশের সিদ্ধান্ত হয়েছে?
মির্জা আব্বাস : ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ইতিবাচক ভূমিকার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তারা আগামীকাল (আজ) নয়াপল্টনে মহাসমাবেশের নিরাপত্তা বিধানে সহযোগিতা করবেন। একই সঙ্গে আশা করি সমাবেশে আসার পথে জনগণ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের কোনো প্রকার বাধা দেবে না।
দেশ রূপান্তর : বিএনপির পক্ষ থেকে রাজপথ দখলের কথা বলা হচ্ছে? বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন?
মির্জা আব্বাস : সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নানান চেষ্টা করছে। তারা বলে, বিচার মানি কিন্তু তালগাছ আমার। নির্বাচন হবে কিন্তু আমাদের জয়ী হতে হবে। সেটার জন্য তারা প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় রদবদল করছে। তাদের দিয়ে ভোটারবিহীন নির্বাচন করে নেবে। এত সহজ হবে না, জনগণ এটা বারবার মেনে নেবে না। মানুষ তাদের ন্যূনতম অধিকার, ভোটাধিকার আদায়ের জন্য জনগণ যদি রাজপথ দখল করে প্রতিবাদ জানায়, গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপির দায়িত্ব তাদের সমর্থন জানানো। আমরা তা জানাচ্ছি, সবসময়ই জানাব।
দেশ রূপান্তর : সরকারের দাবি আপনারা সংঘাত সৃষ্টি করতে চান?
মির্জা আব্বাস : আপনারা দেখেছেন, দেশবাসী দেখেছে, গত বেশ কয়েকটি কর্মসূচিতে সারা দেশে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে প্রতিহত করে শান্তি মিছিলের নামে বিশৃঙ্খলা করেছে। একজনকে হত্যা ও অনেককে আহত করার মতো ঘটনাও ঘটিয়েছে। বিএনপির নেতাকর্মীরা ১৫ বছর ধরে নিপীড়নের শিকার।
দেশ রূপান্তর : তারা তো বলে আপনারা অগ্নিসন্ত্রাস করেন?
মির্জা আব্বাস : ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনে ১৭৩ দিন হরতাল দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সে সময় যত রকম জ¦ালাও-পোড়াও আছে; ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রেনে আগুন, শেরাটনের সামনে বাসে গান পাউডার দিয়ে ১১ জনকে হত্যাসহ অসংখ্য ঘটনা ঘটিয়েছে। একই ধারাবাহিকতা ২০১৩ থেকে ’১৮ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ আগুন সন্ত্রাস করে বিএনপির নাম দিয়েছে। আওয়ামী লীগই অগ্নিসন্ত্রাসের হোতা, জন্মদাতা।
দেশ রূপান্তর : বিএনপির সমাবেশ, আওয়ামী লীগের তিন সংগঠনেরও সমাবেশ কাল (আজ)। বিশৃঙ্খলা হতে পারে বলে মনে করছেন কি?
মির্জা আব্বাস : আমরা শান্তিপূর্ণ মিটিং-মিছিল করেছি। কোনোরকম গোলোযোগ হয়নি। বরং তারাই গোলযোগ তৈরি চেষ্টা করছে। আমাদেরও প্রশ্ন, কেন? আমরা যেদিন মিছিল-মিটিং করি, আপনারা সেদিন দিয়েন না। আপনারা যেদিন করবেন, আমরা দেব না। আর তা না করে আওয়ামী লীগ আমাদের কর্মসূচির দিনই কর্মসূচি ঘোষণা করে। কেন? এটা আর সহ্য করা হবে না। বিএনপির নেতাকর্মীরা জেল খাটতে শিখেছে, মৃত্যুবরণ করতে শিখেছে, মিছিল করতে শিখেছে। এবার অত্যাচার আর সহ্য করবে না, জবাব দেবে।
দেশ রূপান্তর : মহাসমাবেশের পর আপনাদের কী কর্মসূচি আসছে?
মির্জা আব্বাস : জনগণের গণতন্ত্র, তাদের কথা বলার অধিকার, ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে, দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে, তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনার জন্যই আমাদের আন্দোলন। গাবতলী থেকে রায়সাহেব বাজার মোড়, আবদুল্লাহপুর থেকে রায়সাহেব বাজার মোড় দুটি পদযাত্রা হয়েছে। আমার আগে কখনো এরকম অভিজ্ঞতা ছিল না। সারা বিশ্বে এত বড় মিছিল কেউ কখনো করতে পারেনি। এরপর তারুণ্যের সমাবেশে লাখো মানুষের উপস্থিতি। আগামীতে এমন অনেক শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি থাকবে।
দেশ রূপান্তর : এ আন্দোলনের শেষ পরিণতি কী?
মির্জা আব্বাস : নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন আদায়ে সরকারকে বাধ্য করা ছাড়া এই আন্দোলন শেষ হবে না। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আমি আমার এলাকা থেকে যখন মিছিল বের করি, তখন তার পতন হয়েছিল। এবারও প্রয়োজনে আমার এলাকা থেকে আমার নেতৃত্বে প্রথম মিছিলটি বের হবে। সরকারের শেষ পরিণতি না দেখা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাব।
দেশ রূপান্তর : সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের ওপর বিদেশিদেরও চাপ রয়েছে। বিএনপি কী মনে করছে?
মির্জা আব্বাস : বাংলাদেশ নিয়ে সারা বিশ্ব উৎকণ্ঠিত। এখানে কী হচ্ছে, তা তারা জানতে চায়। ফলে তারাও কথা বলছে। সরকার বুঝতে পারছে চারদিকে থেকে তাদের ক্ষেত্র ছোট হয়ে আসছে। তারা যে চলে যাবে, সরকারের যে পতন ঘটবে, এটা আশঙ্কা করেই তারা কার্যক্রম চালাচ্ছে। অত্যাচার-জুলুম বাড়িয়ে দিয়েছে।
দেশ রূপান্তর : আপনাদের কর্মসূচি কি শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক হবে?
মির্জা আব্বাস : সারা দেশেই আমাদের কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। তবে এটা স্বাভাবিক, সব ক্ষেত্রে রাজধানীই সবার মনোযোগ আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকে। তাই কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানীতেও আমাদের কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এতে অংশ নিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নগরবাসী রাস্তায় নেমে আসছে। তারা বলছে, আমরা এ সরকারকে চাই না।
দেশ রূপান্তর : আপনি কি মনে করেন নিরপেক্ষভাবে বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে সবপক্ষ সহযোগিতা করবে?
মির্জা আব্বাস : আমাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হবে, তার প্রমাণ আমরা বারবার দিয়েছি। এবার জোর দিয়ে বলছি, আজকের সমাবেশ হবে শান্তিপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীর সদস্যদের বলব, আমাদের নিয়ে চিন্তা না করে ক্ষমতাসীনদের পাহারা দেন। ক্ষমতাসীনরা বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করে, মামলা দিয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি বানচাল করতে চায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষ থাকলে, হামলা, মামলা না হলে আমাদের জনসমাবেশগুলো মহাসমাবেশে পরিণত হবে।
দেশ রূপান্তর : যদি সরকার ২০১৪ ও ’১৮ সালের মতো আগামী সংসদ নির্র্বাচন করতে চায়, তখন আপনাদের করণীয় কী হবে?
মির্জা আব্বাস : সর্বশেষ ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে তাদের (আওয়ামী লীগের) ভোট পড়েছে ৮-১০ শতাংশ। বাকি ভোটার ভোট দেয়নি। মানে বাকি ৯০ ভাগ ভোট বিএনপির। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে তারা ১০টি আসনও পাবে না। এজন্যই ওবায়দুল কাদেররা বলেন, সংবিধানের বাইরে তারা একচুলও সরবেন না। খুব ভালো কথা। আপনাদের কথায় স্থির থাকেন। আমরাও বলি, সংবিধানের বাইরে আমরাও এক পা যাব না। তবে খায়রুল হকের (এবিএম খায়রুল হক) সংবিধান না। বাংলাদেশের অখ- সংবিধান, যেটা কাটাছেঁড়া করা হয়নি। যে সংবিধান থেকে মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়নি। ওবায়দুল কাদেরদের বলব, খেলা কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। এই খেলা শেষ করে আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব।
মির্জা আব্বাস
স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি
