বাজারভিত্তিক সুদহারের অগ্রগতি জানতে চেয়েছে আইএমএফ

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৩, ১২:০৩ এএম

চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণে বেঁধে দেওয়া ৯ শতাংশের সীমা তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বিপরীতে ইন্টারেস্ট রেট করিডর বা বাজারভিত্তিক সুদহারের মাধ্যমে ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো ইন্টারেস্ট রেট করিডর কীভাবে বাস্তবায়ন করছে তা সম্পর্কে জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ।

গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এক বৈঠকে এই বিষয়টি জানতে চায় আন্তর্জাতিক এই ঋণদাতা সংস্থা। গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার, ডেপুটি গভর্নর কাজী সায়েদুর রহমানসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, চলমান মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন, নীতি সুদহারের করিডর প্রথা, সুদহারের সীমা প্রত্যাহার করে ইন্টারেস্ট রেট করিডর প্রথা ও ডলারের একক দাম বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন আইএমএফের কর্মকর্তারা। আজ সোমবার বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের হিসাবায়ন, তারল্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আবারও বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এটি আইএমএফের নিয়মিত সফরের অংশ। তারা মুদ্রানীতির বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চেয়েছে। আমরা নতুন করে ইন্টারেস্ট রেট করিডরে গিয়েছি। এটা কী পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করব বা এর প্রভাব কী হবে তার বিষয়ে আলোচনা করেছে। এছাড়া তারল্য ব্যবস্থাপনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এই শীর্ষ কর্তা।

তবে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এর আগে গত ১৮ জুন নতুন অর্থবছরের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে নীতি সুদহারের করিডর প্রথা, সুদহারের সীমা প্রত্যাহার, ডলারের একক দাম, রিজার্ভের প্রকৃত হিসাবায়নসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্তের মধ্যে ছিল। ফলে পুরো মুদ্রানীতিটি হয়েছে আইএমএফের ছক অনুযায়ী। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি রোধে মুদ্রা সরবরাহনির্ভর নীতি থেকে সরে এসে সুদহার লক্ষ্য করে মুদ্রানীতি প্রণয়ন শুরুর ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

২০২০ সালের এপ্রিলে ব্যাংকঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুদহার সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। কিন্তু চলতি অর্থবছর থেকে সুদহারের সীমা তুলে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে জানানো হয়, ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় হারের সঙ্গে ব্যাংকগুলো ৩ শতাংশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ৫ শতাংশ সুদ যুক্ত করতে পারবে। এটাই হবে সুদের সর্বোচ্চ হার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলে গড় সুদ ছিল ৭ দশমিক ১০ শতাংশ। সে হিসেবে আগস্টে ব্যাংকঋণের সুদের হার ১০ দশমিক ১০ শতাংশ আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তা ১২ দশমিক ১০ শতাংশ নির্ধারিত রয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) ও ভোক্তা ঋণের তদারকি খরচের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও ১ শতাংশ বেশি সুদ আরোপ করতে পারবে। ক্রেডিট কার্ডের সুদহার আগের মতোই ২০ শতাংশ থাকবে।

এদিকে আইএমএফের প্রতিনিধিদল দেশের তারল্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। ঋণ কেলেঙ্কারি, গুজব ও মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সাধারণ মানুষ আমানত তুলে নেওয়ায় দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে। এ সংকট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কী উদ্যোগ ও ঋণ কেলেঙ্কারি রোধে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তাও জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক এই দাতা সংস্থা।

গত ৬ আগস্ট আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসে। তারা বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছে। সফরের অংশ হিসেবে আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পুনরায় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া ১৬ ও ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এবং ২২ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক শেষে ফিরে যাবেন।

বাজেট বাস্তবায়ন ও দেশের আর্থিক সমস্যা সমাধানে গত বছরের ২৪ জুলাই ঋণ চেয়ে আইএমএফের কাছে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ। এতে পরিমাণের কথা উল্লেখ ছিল না। পরে ১২ অক্টোবর ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণসহায়তার কথা উল্লেখ করেন। এরপর চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এই ঋণের প্রথম কিস্তি ইতিমধ্যে ছাড় করা হয়েছে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত আইএমএফের কর্মসূচি চালু থাকার কথা রয়েছে।

আইএমএফের ঋণের সঙ্গে দেওয়া বেশ কিছু শর্ত বাংলাদেশ এরই মধ্যে পূরণ করেছে এবং আরও কিছু শর্ত পূরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে আইএমএফের শর্ত পূরণ নিয়ে দেশে নানা আলোচনা-সমালোচনাও রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত