আইপিও আনতে পারছে না মার্চেন্ট ব্যাংক

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৩, ১২:৪০ এএম

মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রধান কাজ হচ্ছে পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা। কিন্তু এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারের তুলনায় বাংলাদেশে মার্চেন্ট ব্যাংকের সংখ্যা বেশি থাকার পরও ভালো মানের আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) তালিকাভুক্ত হয়নি। এমনকি পুঁজিবাজারে এলে কোম্পানি কী সুবিধা পাবে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণাও দিতে পারছে না মার্চেন্ট ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন ব্যর্থতায় বাজারের গভীরতাও বাড়ছে না।

গতকাল সোমবার পুঁজিবাজারে কোম্পানি তালিকাভুক্ত সংক্রান্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এক আলোচনায় মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর এমন দুর্বলতার তথ্য জানিয়েছেন বক্তারা। ‘মার্চেন্ট ব্যাংকারদের সঙ্গে তালিকাভুক্তি সংক্রান্ত সমন্বয় সভার’ আয়োজন করে ডিএসই। ডিএসই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) এম. সাইফুর রহমান মজুমদারের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্টক এক্সচেঞ্জটির চেয়ারম্যান ড. হাফিজ মুহম্মদ হাসান বাবু। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট মো. ছায়েদুর রহমান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডিএসইর চেয়ারম্যান ড. হাসান মুহম্মদ হাসান বাবু বলেন, এশিয়ার অন্যান্য স্টক এক্সচেঞ্জের তুলনায় বাংলাদেশে মার্চেন্ট ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক বছর ধরে পুঁজিবাজারে ভালো মানের আইপিও তালিকাভুক্ত হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৮টি মার্চেন্ট ব্যাংক কাজ করছে। কিন্তু নতুন আইপিও আনার অনুপাত অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবই কম। ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে ২১৬টি মার্চেন্ট ব্যাংক আছে এবং সেখানে ২ হাজার ২১৩টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত। ভারতের মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো গড়ে ১০টির বেশি কোম্পানি তালিকাভুক্ত করেছে। পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জে ১৩টি মার্চেন্ট ব্যাংক ৫২৪টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত করেছে। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর কোম্পানি তালিকাভুক্তির গড় হার ৪০ এর বেশি। বোরসা মালয়েশিয়ার ও কলম্বো স্টক এক্সচেঞ্জে ইস্যু ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি অনুযায়ী গড় তালিকাভুক্ত কোম্পানি যথাক্রমে ২৪ এবং ১২টি। সেখানে বাংলাদেশে গড় মাত্র ৫টি।

ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, উদ্যোক্তাদের মানসিকতা, আমলাতন্ত্র, সঠিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া, আইপিওর দীর্ঘসূত্রতা, বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে মূল দেশ থেকে তহবিল প্রাপ্তি, রাজস্ব গোপন করার প্রবণতা, নীতির অসামঞ্জস্যতা, কর বৈষম্য, ব্যাংক এবং নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজে ঋণের সুযোগসহ কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব বাধা কাটিয়ে উঠতে আমরা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করব। এ ছাড়াও অঞ্চলভিত্তিক রোড শো আয়োজনের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের তাদের ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্ত করতে উৎসাহিত করব। তিনি আরও বলেন, দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়নের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আর এজন্য পলিসি সাপোর্টের দিকে না তাকিয়ে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে।

প্রাইভেট বন্ড সম্পর্কে ড. হাসান বাবু বলেন, ১৬ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা মূল্যের ৪২টি প্রাইভেট বন্ড এটিবি প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ছোট পুঁজির প্রয়োজনে এসএমই প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কীভাবে পুঁজিবাজারমুখী করা যায় এবং কীভাবে পরামর্শ সেবা দেওয়া যায় সেটা নিয়ে আমরা যৌথভাবে কাজ করতে চাই।

বিএমবিএ প্রেসিডেন্ট মো. ছায়েদুর রহমান বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে যখন প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হলে তাদের লাভ কি সে বিষয়ে জানতে চায়। কিন্তু মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো তাদের লাভের বিষয়ে বলতে পারে না। কারণ মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোই জানে না যে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানিগুলোর কি লাভ হবে। বাজারে তালিকাভুক্তি ও বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) সঙ্গে অনেকবার কথা হয়েছে এবং তাদের বেশ কিছু বিষয় বুঝানো হয়েছে। দীর্ঘদিন বুঝানোর ফলে এসইসি অনেক কিছু আমলে নিলেও এনবিআর এখনো কোনো বিষয় আমলে নেয়নি। ফলে তালিকাভুক্ত হলে কোনো লাভ হবে না দেখে কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হারের ব্যবধান বাড়ানোর বিষয়টি এনবিআরকে আবারও বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, বর্তমানে কোম্পানিগুলো ব্যাংকনির্ভর। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে কোম্পানির এক-দেড় বছর সময় লাগে। কিন্তু ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে সময় লাগে দুই থেকে তিন মাস। সেক্ষেত্রে সরকারের পলিসি থেকে উদ্বুদ্ধ করানো না যায়, তাহলে তালিকাভুক্ত বাড়ানো যাবে না। সরকারি হিসেবে কোম্পানি আছে ২ লাখের বেশি, যার মার্কেটে আছে ৩৫০টি কোম্পানি যা ২ শতাংশের কম। কারণ তাদের তালিকাভুক্ত হওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

অনুষ্ঠানে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর জন্য সময়োপযোগী ব্যবসায়িক  মডেল তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ  করেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ডিএসইর প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা খাইরুল বাশার আবু তাহের মোহাম্মদ, মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ডিভিশনের সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক মো. ছামিউল ইসলাম, লংকা বাংলা ইনভেস্টমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইফতেখার আলম প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত