গাইবান্ধার সাঘাটায় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে শাতালিয়া গ্রামের ফজলুল করিম (৬৩) পেশায় একজন কৃষক। কিছুদিন আগেও তার পৈতৃক ভিটা, ঘরবাড়ি সব ছিল। কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে সব হারিয়ে এখন তিনি নিঃস্ব। গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে আশ্রয় নিয়েছেন পরিত্যক্ত একটি স্কুলঘরে। শেষ জীবনে এসে বড্ড ক্লান্ত তিনি। অন্যের দেওয়া খাবারে পেট চলছে তার। ফজলুল করিম একা নন, তার মতো প্রায় ২৫টি পরিবার খেয়ে না খেয়ে বসবাস করছে স্কুলঘরে। কপালে জোটেনি সরকারি সহায়তা। খোঁজ নেয়নি কোনো জনপ্রতিনিধিও।
স্থানীয়রা জানায়, গত এক মাস ধরে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার মুন্সিরহাট এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে শতাধিক পরিবার তাদের শেষ আশ্রয়স্থল বসতভিটাটুকু হারিয়েছে। কয়েক দিন আগে মুন্সিরহাট বাজারের অন্তত পাঁচটি দোকান ও তিনটি বাড়ি নদীতে তলিয়ে গেছে। ওইসব দোকান ও ঘরের মধ্যে থাকা টাকাপয়সা মালপত্র কিছুই বের করতে পারেনি তারা। এর আগে ভাঙনের শিকার অনেকে ভিটেমাটি হারিয়ে শুধু ঘরের চালা ও আসবাবপত্র নিয়ে স্কুলঘরে আশ্রয় নিয়েছে। শাতালিয়া গ্রামে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে অর্ধশত পরিবার বাস্তুহারা হয়েছে। আবাদি জমিসহ কয়েকশ হেক্টর জমি, অসংখ্য গাছপালা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি বাঁধের প্রায় ৩০০ মিটার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। উত্তর শাতালিয়া গ্রাম ও মুন্সিরহাট বাজার এলাকায় ঝুঁকিতে রয়েছে ৭০০-৮০০ পরিবার। ঝুঁকিতে রয়েছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও। বেশ কয়েকটি বৈদ্যুতিক খুঁটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো সরকারি ও বেসরকারি স্কুলঘরে আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে নিরুপায় হয়ে ভাঙনকবলিত এলাকার পাশেই স্বজনদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
সরেজমিনে মুন্সিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা গেছে, স্কুল মাঠে বেশ কিছু টিনশেড ঘরের চালা পড়ে আছে। বিদ্যালয়ের একই শ্রেণিকক্ষে চার থেকে পাঁচটি পরিবার গাদাগাদি করে অবস্থান নিয়েছে। কেউ আবার স্কুলের বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছে।
পরিত্যক্ত স্কুলকক্ষে ঠাঁই হয়েছে ফজলুল করিম ও তার স্ত্রী আফরুজা বেগমের। ফজলুল করিম বলেন, ‘হামার কপালে সুখ সয় না। বউটা ব্রেইন স্ট্রোক করছে। শরীরের রক্ত পানি করে বাপ-দাদার ভিটায় ঘর তুলছিলাম। নদী ঘরবাড়ি সরাবারও সমায় দেয় না। ঘরের মধ্যে ধান-চাল, টাকাসহ মেলা জিনিস ছিল। কিছুই নিতে পারি নাই। হাঁড়ি-পাতিলসহ সব চলি গেছে নদীতে। দুদিন পর পেটে ভাত গেছে। চেয়ারম্যান সাব ২০ কেজি চাল দিছে। এরপর আর কেউ খোঁজও নিতে আসেনি।’
এদিকে ভাঙনকবলিতরা শ্রেণিকক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বিদ্যালয়ের পাঠদান সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল শাফি বলেন, ‘দুর্যোগের কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সাময়িকভাবে বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন করা হলে শিগগির পাঠদান শুরু করা হবে।’
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক বলেন, ‘মুন্সিরহাটসহ ব্রহ্মপুত্র নদে ভাঙন রোধে কাজ চলমান রয়েছে। এখন ভাঙন এলাকাগুলোতে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। আরও জিও ব্যাগ প্রস্তুত করা হয়েছে।’
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইসাহাক আলী বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাঙনকবলিত মানুষদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করছি। চিঠি পাঠানো হয়েছে। আশা করি দ্রুতই আমরা তাদের পুনর্বাসন করতে পারব।’
