সাবেক ফুটবলার পুতুলের বাঁচার আকুতি

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৩, ০১:০৭ এএম

নারী ফুটবলের একেবারে শুরুর গল্পে লেখা রয়েছে তার নাম। তিনি নুরজাহান খন্দকার পুতুল। এক সময় জাতীয় দলে খেলা এই ফুটবলারের এখন নির্ঘুম রাত কাটে মৃত্যুচিন্তায়। মাত্র ৩০ বছর বয়সে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে নিভে যেতে বসেছে তার জীবন প্রদীপ। খেলা ছেড়ে কোচ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা পুতুলের পেটে কয়েক মাস আগে টিউমার ধরা পড়ে। নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে সেটি অপসারণ করতে গিয়ে চিকিৎসকরা দেখতে পান পেটের ভেতরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কুন্ডুলী পাকিয়ে রয়েছে। টিউমার অপসারণ না করেই সেলাই করে তাকে দ্রুত ঢাকায় বড় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে বলা হয়। তবে উন্নত চিকিৎসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দারিদ্র্য। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে প্রয়োজন অনেক টাকার। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে তার উন্নত চিকিৎসা করানো অসম্ভব। তাই বাধ্য হয়েই নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুনের শরণাপন্ন হয়েছিলেন পুতুল। সাবিনাই দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন সাবেক সতীর্থের দুরবস্থার কথা।

নারায়ণগঞ্জের প্রয়াত ফুটবল কোচ মোসলেহ উদ্দিন বিদ্যুতের (বিদ্যুৎ চাচা) হাত ধরে ফুটবলে হাতেখড়ি হয়েছিল ভাতিজি পুতুলের। বিদ্যুতের মেয়ে সুখীও বাংলাদেশ প্রথম জাতীয় দলের অন্যতম স্ট্রাইকার ছিলেন। পুতুল খেলতেন লেফট ব্যাক পজিশনে। ২০১০ এসএ গেমসের দলে ছিলেন তিনি। তবে কাঁধের ইনজুরির কারণে সেই আসরে খেলা হয়নি। পরে অবশ্য সাবিনাদের সঙ্গে জাতীয় দলে খেলেছেন পুতুল। ২০১৩ সালে খেলা ছেড়ে কোচিংকে পেশা হিসেবে নেন। বাফুফেতে এএফসি ‘সি’ লাইসেন্স কোচিং কোর্সও করেন। এরপর সংসারে মনোযোগী হওয়ায় বেশ কিছু বছর কোচিং থেকে দূরে ছিলেন। এর মধ্যে জন্ম নেয় দুই সন্তান। ২০২২ সালে নারী লিগে ফরাশগঞ্জ দলের সহকারী কোচ হিসেবে ফের কোচিং পেশায় ফিরেছিলেন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে চাচার গড়ে তোলা প্রমীলা ফুটবল একাডেমির দায়িত্বও নিয়েছিলেন। ভালোই চলছিল। এর মধ্যেই তার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। ফুটবলার স্বামীর সঙ্গে শুরু হয় সম্পর্কের টানাপড়েন। গত আগস্টে স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এর মধ্যেই শরীরে বাসা বাঁধে জটিল রোগ। দরিদ্র বাবার সংসারে ঠাঁই পেলেও উন্নত চিকিৎসা দূরে থাক, দুই সন্তানকে নিয়ে এখন বেঁচে থাকাই কঠিন পুতুলের জন্য। বিছানায় কাতরাতে কাতরাতে কাতর কণ্ঠে পুতুল দেশ রূপান্তরের কাছে নিজের অবস্থা তুলে ধরেন, ‘আমার জীবনে এরকম অন্ধকার নেমে আসবে ভাবিনি। স্বামীর সঙ্গেও ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। জটিল রোগে আক্রান্ত হলাম। দ্রুত অপারেশন করাতে না পারলে হয়তো বেশিদিন বাঁচব না। কারণ নারায়ণগঞ্জের চিকিৎসকরা আমার বেঁচে থাকা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আমার মায়ের কাছে।’ ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে এই জটিল অপারেশনের জন্য প্রয়োজন প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। এ অবস্থায় চোখে অন্ধকার দেখছেন পুতুল, ‘আমি জানি না এই টাকা কোথা থেকে জোগাড় করব। সুস্থ হতে না পারলে অবুঝ দুটি সন্তানকে কীভাবে মানুষ করব, কীভাবেই-বা বৃদ্ধ বাবা-মার মুখে খাবার তুলে দেব। অনেক দিন পর কোচিং শুরু করেছিলাম, এই অবস্থায় সেটাও করতে পারছি না। আমার বাবার বয়স হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ভিক্টোরিয়া সরকারি হাসপাতালের সামনে একটা ডিমের দোকান ছিল তার। সেটাও এখন সেভাবে চালাতে পারেন না। আমরা কীভাবে বাঁচব আল্লাহই জানেন।’

এ অবস্থায় পুতুল তাকিয়ে আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে, ‘শুনেছি ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর (জাহিদ আহসান রাসেল) মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী দুস্থ, অভাবগ্রস্ত ক্রীড়াবিদদের চিকিৎসা সহায়তা করেন। তিনি যদি আমার চিকিৎসার দায়িত্ব নিতেন, তবে সুস্থ হয়ে আবার মাঠে ফিরতে পারতাম। আর আমি সুস্থ হলে আমার পরিবারটাও বেঁচে যাবে। নইলে...।’

সাবিনাও এক সময়ের সতীর্থের বিপদে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন, ‘পুতুল এক সময় আমাদের সঙ্গে খেলতো। আজ তার এই বিপদের কথা শুনে ভীষণ খারাপ লাগছে। আমি সমাজের ক্ষমতাবান মানুষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি পুতুলের বিপদে এগিয়ে আসুন। আপনাদের একটু সহায়তায় হয়তো একটা জীবন বেঁচে যেতে পারে।’

সাবিনার এই আহ্বানে সাড়া দিলেই হয়তো বেঁচে যেতে পারে পুতুল ও তার অসহায় পরিবার।   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত