পাহাড়, সমুদ্র আর নদীঘেরা বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। ২০০০ সালের স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখা যায় চট্টগ্রাম মহানগরীর কৈবল্যধাম বিশ্ব কলোনির উত্তরে নন্দন হাউজিংয়ের পুরো এলাকাটি পাহাড়ি আর সবুজ বনানীতে ছাওয়া ছিল। কিন্তু এখন সেখানে উঁচু-নিচু অসংখ্য ভবন। নৈসর্গিক এ নগরীর পরিবেশ-প্রতিবেশের সুরক্ষার পাশাপাশি আধুনিকায়নের জন্য ৬৪ বছর আগে ১৯৫৯ সালে গঠন করা হয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (সিডিএ)। দুঃখের বিষয় স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখা সবুজ বনানী ধ্বংস করে এলাকাটিতে গড়ে ওঠা সব ভবন এই সিডিএর অনুমোদন নিয়েই গড়ে উঠেছে। মহানগরীর ভেতরে ও আশপাশের পাহাড়-জঙ্গল এলাকায় এখন যত আবাসিক বা বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে, সবগুলোর ক্ষেত্রেই একই ঘটনা। কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েই পাহাড়-জঙ্গল সাবাড় করে বানানো হচ্ছে কংক্রিটের ভবন। ভরাট হচ্ছে নদী-জলাশয়। কদিন আগেই সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় হাবুডুবু খেয়েছে এই নগরী।
নিয়ম অনুসারে সিডিএ প্রতি ২০ বছর পরপর একটি করে মাস্টারপ্ল্যান করে সে অনুযায়ী বন্দরনগরীর উন্নয়ন সাধন করবে। বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘আইনি মোড়কে সর্বনাশা সিডিএ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নগরবাসীর অর্থ দিয়েই করা হয় সিডিএর মাস্টারপ্ল্যান। ২০২০-৪১ মেয়াদের জন্য মাস্টারপ্ল্যান করতে খরচ ধরা হয়েছে ৩৩ কোটি টাকা। এত টাকা খরচ করে তৈরি হয় মাস্টারপ্ল্যান, তবু কেন এত দুর্দশা-ভোগান্তি চট্টগ্রামবাসীর? অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নগরীর এই পরিবেশ বিধ্বংসী পরিস্থিতির নেপথ্যের খলনায়কের মুখোশ। রক্ষক সংস্থা সিডিএই করেছে এ সর্বনাশ। আইনের মধ্যে থেকেই প্রচলিত আইন ব্যবহার করে, আইনের সংশোধনীর সুযোগ নিয়ে, আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে বের করে, কখনো-বা নিজস্ব ক্ষমতাবলে বিশেষ সিদ্ধান্ত নিয়েই উন্নয়নের অজুহাতে প্রকৃতি ধ্বংসের অনুমোদন দিয়ে গেছে সিডিএ। সিডিএ নিজেও সড়ক নির্মাণের নামে বিধি লঙ্ঘন করে সারি সারি পাহাড়-বনানী, জলাশয় সাবাড় করেছে বা চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে সাহায্য করেছে। শুধু চট্টগ্রাম মহানগরীতে গত ৪০ বছরে হারিয়ে গেছে ১২০টি পাহাড়। গত ১৫ বছরে হারিয়ে গেছে তিন হাজার পুকুর ও জলাশয়।
বিগত দিনের কোনো মাস্টারপ্ল্যানই বাস্তবায়ন না হওয়ায় এমন বেহাল দশা বলছেন নগর পরিকল্পনাবিদ। দুর্ভাগ্য হচ্ছে মাস্টারপ্ল্যান কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তা কখনো অডিট হয় না। সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণও দায়ী। অনুসন্ধানে মনে হয়েছে, সিডিএ হলো সেই হাতুড়ে ডাক্তারের মতো, যে কিনা ভুল চিকিৎসা দিতে দিতে রোগীর ক্যানসার বানিয়ে ফেলে এখন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে জ্বর মাপার কাজে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংস্থা, সিটি করপোরেশন, রেলওয়ে, বন্দর কর্র্তৃপক্ষ, ওয়াসা নিজস্ব মাস্টারপ্ল্যানগুলো সিডিএর মাস্টারপ্ল্যানে যুক্ত করতে হবে। বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে। কেবল সিডিএ নয়, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, ওয়াসা, গণপূর্ত অধিদপ্তর, গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষ, রেলওয়ে, পুলিশ এবং বিভিন্ন শিল্প গ্রুপও পাহাড়, জলাশয়, পরিবেশ বিনাশ করেছে। পরিবেশ ভবনটিই গড়ে উঠেছে পাহাড় ধ্বংস করে। এছাড়া, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সহায়তায়ই পাহাড়-জলাশয় পরিবেশের বিনাশ হচ্ছে। এজন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে এবং পরিবেশ রক্ষায় রাজনীতিকদের সদিচ্ছা দেখাতে হবে।
মাস্টারপ্ল্যান করলেই হবে না, তার বাস্তবায়ন করতে হবে। কোথাও পরিকল্পনায় ছিল এক ধরনের ভূমি ব্যবহার, বাস্তবে হচ্ছে অন্য ধরনের। পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে ‘প্ল্যানিং বডি’ (পরিকল্পনা সংস্থা) থাকতে হবে। মাস্টারপ্ল্যানের গাইডলাইনের আলোকে প্রকল্প গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দক্ষ জনবলও প্রয়োজন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সে ধরনের জনবল কাঠামো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেই। অনেক কষ্ট করে এবং অর্থ খরচ করে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন হতে যাচ্ছে। এই প্ল্যানটি যাতে বাস্তবায়ন হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
