সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই ঢাকা সফরের মূল উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট করলেন আফগানিস্তানের কুয়েতি কোচ আব্দুল্লাহ আল মুতাইরি, ‘আমি এখানে এসেছি কেবল বিশ্বকাপ বাছাইয়ের জন্য দলকে প্রস্তুত করতে। প্রীতি ম্যাচ...স্রেফ প্রীতি ম্যাচ। আপনি ১০-০ গোলে জিততে পারেন, আবার ১০-০ গোলে হারতেও পারেন। কিচ্ছু যায়-আসে না। আমি এখানে এসেছি মঙ্গোলিয়া ম্যাচের জন্য খেলোয়াড়দের প্রস্তুত করতে।’ খানিক পরে বাংলাদেশের স্প্যানিশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরারও হাঁটলেন মুতাইরির দেখানো পথে, ‘আমি কোচের (আফগানিস্তান কোচ) সঙ্গে একমত। এ বছর আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি মালদ্বীপের বিপক্ষে দুটি ম্যাচকে। তার আগে কঠিন প্রতিপক্ষের সঙ্গে নিজেদের বাজিয়ে দেখার সুযোগ পাচ্ছি এই সিরিজে।’ আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া দুই ম্যাচ প্রীতি সিরিজ বাংলাদেশের আয়োজন আর আফগানদের খেলতে আসার লক্ষ্যটা অভিন্ন। এটা আসলে অক্টোবরের মূল পরীক্ষার প্রস্তুতি মঞ্চ। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্রথমপর্বে দুটি দলকেই দুই লেগে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে। তাই এই সিরিজ সবকিছু ছাপিয়ে হয়ে উঠেছে দুই কোচের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সিরিজ। আর এই পরীক্ষার-নিরীক্ষার সিরিজ আয়োজনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসে খেরো খাতায় উঠে যাচ্ছে বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনার নাম। দেশের প্রথম এবং একমাত্র ব্যক্তিমালিকানাধীন স্টেডিয়াম পেয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
দুই দলের দুই কোচ যতই এই সিরিজকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মঞ্চ বানিয়ে ফেলুক, ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে যে সম্প্রীতির ছিটেফোঁটাও থাকবে না, তা বলে দেওয়াই যায়। সর্বশেষ সাফে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সটা ভালোই জানা আফগানিস্তান বসের। নেপালকে দীর্ঘ সময় কোচিং করানোর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের গলি-ঘুপচি ভীষণ চেনা মুতাইরির। ২০২১ সাফে তার নেপালের সঙ্গে গ্রুপের শেষ ম্যাচে ড্র করে ফাইনালে খেলা হয়নি বাংলাদেশের। এই সাফে কুয়েতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে শুরুতেই গোল পেয়ে গেলে কিংবা ১০৭ মিনিটে গোল হজম করতে না হলে বাংলাদেশের ফাইনাল খেলাটাই স্বাভাবিক ছিল বিশ্বাস করেন মুতাইরি। তিনি তো বাংলাদেশ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণীও করে দিলেন। ভারতের পর আগামীতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় রাজত্ব করবে, এমন প্রশংসা ঝরেছে তার কণ্ঠে। দায়িত্ব নিয়ে আফগান দলে খোলনলচে বদলে ফেলেছেন এই কোচ। নতুনদের নিয়ে গড়া দলটি কেমন খেলে, সেটা দেখতেই এই সিরিজে পাখির চোখ করেছেন মুতাইরি।
প্রতিপক্ষ কোচের প্রশংসায় অবশ্য ভুললে চলছে না বাংলাদেশকে। সাফে ভালো পারফরম্যান্সের ধারাটা অব্যাহত রাখার চ্যালেঞ্জ স্বাগতিকদের। আর সেটা আফগানদের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে। আফগানরা শক্তি-সামর্থ্যে ও র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে গেছে অনেকটা। ইউরোপপ্রবাসী একঝাঁক ফুটবলার নিয়ে গড়া আফগানরা স্বপ্ন দেখছে ২০২৭ এশিয়ান কাপের চূড়ান্তপর্বে খেলার। তো, সেই আফগানদের ঘরের মাঠে কতটা বাগে আনতে পারবে বাংলাদেশ, সেটা বোঝা যাবে আসছে দুই ম্যাচে। কাবরেরা অবশ্য ভীষণ আশাবাদী, ‘১১টা সেশন করেছি। খেলোয়াড়দের মানসিকতা আর অনুশীলনের মান বেশ ভালো ছিল। আমরা মুখিয়ে আছি মাঠে নামতে। সমর্থকসহ সবাইকে দেখাতে চাই, সাফে যে পারফরম্যান্স করেছি, তা ধরে রাখার মতো দল আমরা।’
কোচের মতো অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়ার কণ্ঠেও নিজেদের প্রমাণের প্রতিশ্রুতি। একই সঙ্গে মালদ্বীপ পরীক্ষার আগে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে জোড়া ম্যাচ খেলে নিজেদের ঝালিয়ে নিতে চান সম্প্রতি আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিভাগ লিগের দলে যোগ দেওয়া এই মিডফিল্ডার, ‘সাফে যে খেলাটা খেলেছি, সেটা ধরে রাখতে হবে। ম্যাচটা আমাদের জন্য মালদ্বীপ ম্যাচের প্রস্তুতির। ম্যাচ দুটি জিততে পারলে র্যাঙ্কিংয়েও আমাদের সামনের দিকে এগোনোর সুযোগ থাকবে।’
সিরিজ শুরুর আগে আফগানদের কোচ মুতাইরি বাংলাদেশের প্রশংসা করে বলেন, ‘আমি মনে করি, সাফ অঞ্চলে বাংলাদেশ পরবর্তী পরাশক্তি। তাদের বিপক্ষে আমাদের বিশ^কাপ বাছাইয়ের আগের ম্যাচ খেলাটা গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি, এই দুই ম্যাচ দুই দলের জন্যই ভীষণ কর্যকরী হবে। একই সঙ্গে আশা করছি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না কে জিতবে। কেননা, আমি এখানে এসেছি কেবল বিশ^কাপ বাছাইয়ের জন্য দলকে প্রস্তুত করতে। আগামীকাল আমরা মাঠে নামব ফুটবল উপভোগের জন্য।’ মুতাইরি প্রতিপক্ষকে যতই প্রশংসায় ভাসাক, যতই এই সিরিজকে প্রস্তুতি মঞ্চ হিসেবে নিক, তিনি নিশ্চয়ই চাইবেন জিতেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে মূল পরীক্ষায় মঙ্গোলিয়ার মোকাবিলা করবেন। আর এখানেই কাবরেরাকে নিতে হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
