বাবুর্চির বৃক্ষপ্রেমে সবুজ ক্যাম্পাস

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১২:৪৭ এএম

বর্ষা মৌসুম। তবুও সূর্যের তীব্র তাপপ্রবাহ চারদিকে। এমন তাপপ্রবাহে বর্ষার বৃষ্টিস্নাত স্নিগ্ধতায় বটবৃক্ষের সবুজ পল্লবের ছায়ায় বসে আছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। সেই বৃক্ষের চারপাশে বৃত্তাকার ঢিবিতে খোশগল্পে বিভোর তারা। বটবৃক্ষের বয়স বেশি নয়। বড়জোর ১০ বছর। অথচ কী দারুণ স্নিগ্ধ তার ছায়া। ভাষাশহীদ আবদুস সালাম হলের সামনে এই বটবৃক্ষ। এমন করে আরও কয়েকটি স্থানে রয়েছে বট, অর্জুন, ঝাউ ও কৃষ্ণচূড়াগাছের সারি। রয়েছে আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, পেয়ারা, জলপাই, তাল, জামরুল, কাঠবাদাম, চালতাসহ প্রায় ১৫ প্রকার ফলদ বৃক্ষ। ক্যাম্পাসজুড়ে দেড় হাজারের বেশি বনজ ও ফলদ বৃক্ষে সুশোভিত। আর এ কাজটি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন বাবুর্চি। 

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ভাষাশহীদ আবদুস সালাম হলে বাবুর্চির পদে চাকরি করা হারুন অর রশিদ এসব বৃক্ষ রোপণ করেছেন।

মো. হারুন অর রশিদের বয়স ৫৪। হালকা-পাতলা শারীরিক গড়নের এ মানুষটি বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে এখন নোবিপ্রবির সবার কাছেই পরিচিত। নিজের সামান্য বেতনে চাকরির বেশিরভাগ অর্থই তিনি ব্যয় করেন বৃক্ষ রোপণ ও পরিচর্যার কাজে। নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্বের পাশাপাশি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ইতিমধ্যেই লাগিয়েছেন দেড় হাজারেরও বেশি ফলদ ও বনজ বৃক্ষ। নিয়মিত পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণও করছেন নিজেই। শান্ত সুনিবিড় প্রাকৃতিক পরিবেশে পাখিদের অভয়ারণ্য, মানুয়ের জন্য শীতল ছায়া, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং পুষ্টির চাহিদা পূরণের আশায় এমন মহতী উদ্যোগ নিয়েছেন। 

২০০৭ সালের কথা। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টাররোলে (কাজের ভিত্তিতে মজুরি) বাবুর্চির কাজে যোগ দেন হারুন অর রশিদ। যোগ দেওয়ার প্রায় ৭ বছর পর ২০১৪ সালে তিনি বাবুর্চি পদে স্থায়ী হন। সেই থেকে তিনি বিশ^বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা হল, ভাষাশহীদ আবদুস সালাম হল, মসজিদ, মন্দির, শান্তিনিকেতন, বিবি খাদিজা হলসহ বিভিন্ন হল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সড়কের পাশে পাঁচ শতাধিক তালের আঁটি রোপণ করেছেন। এরপর তিনি বনজ গাছের চারার পাশাপাশি ফলদ বৃক্ষ রোপণ শুরু করেন।

হারুন অর রশিদ বলেন, ‘২০০৭ সালে কাজে যোগ দেওয়ার পর আমি ভাষাশহীদ আবদুস সালাম হলের উত্তর কোণে একটি জামরুলগাছের চারা রোপণ করি। ধীরে ধীরে সেই চারাগাছ বৃক্ষে পরিণত হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই ফলন আসে। এ গাছে অনেক ফলন হয়। লক্ষ করি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী অনেকেই ওই গাছ থেকে জামরুল খান। অনেক পাখপাখালিও এ ফল খায়। এ গাছের ফলন ও সবার আগ্রহ দেখে আমি উৎসাহিত হই আরও বৃক্ষ রোপণের।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ স্টাডিজ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যত গাছ রোপণ করা হয়েছে, তার বিশাল অংশ হারুন মামার। একটা সময় হারুন মামা থাকবেন না, কিন্তু এই গাছগুলো থাকবে।’

বৃক্ষপ্রেমী হারুন আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যার, কোষাধ্যক্ষ স্যার, প্রভোস্ট স্যার, ছাত্রছাত্রীসহ সবাই আমার এ কাজে খুশি। সবাই আমাকে উৎসাহ দেন। তাসলিমা সুলতানা ম্যাম আমাকে শতাধিক গাছ কিনে সহযোগিতা করেছেন। যত দিন এখানে আছি, তত দিনই গাছ রোপণ করে যাব।’

নোবিপ্রবি অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘অনুরোধ করব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই অবদানের জন্য তাকে সম্মানিত করাতে।’

ভাষাশহীদ আবদুস সালাম হলের প্রভোস্ট ড. মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘ওনার কাছে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।’

নোবিপ্রবি ট্রেজারার অধ্যাপক ড. নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর বলেন, ‘তার এমন কাজে আমরা সবাই খুশি। আর্থিক সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও মানুষের অদম্য ইচ্ছা যদি থাকে যেকোনো কঠিন কাজ সহজ করা যায় এমন উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন হারুন অর রশিদ। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জানাই। সহযোগিতা চাইলে বিশ্ববিদ্যলয়ের পক্ষ থেকে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত