বেসরকারি খাতের প্রভিডেন্ট ফান্ডের আয়ের ওপর সাড়ে ২৭ শতাংশ করপোরেট কর আরোপ করার নতুন নিয়ম নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে আলোচনা-সমালোচনা। সম্প্রতি কয়েকটি সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বেসরকারি খাতের প্রভিডেন্ট ফান্ডের মুনাফার ওপর এই কর আরোপ করেছে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তরফ থেকে কোনো বক্তব্য বা ব্যাখা পাওয়া যায়নি।
সরকারি চাকরিজীবীদের বাদ দিয়ে কেবল বেসরকারি খাতের প্রভিডেন্ট ফান্ডের মুনাফার ওপর এই নিয়ম আরোপ করাকে 'বৈষম্যমূলক' হিসেবে বর্ণনা করছেন অনেকে।
শুধু প্রভিডেন্ট ফান্ড নয়, কয়েক বছর আগে বেসরকারি চাকরিজীবীদের গ্র্যাচুইটি ফান্ড নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসে। সেখানে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতের গ্র্যাচুইটি ফান্ড নিবন্ধিত না হলে কর্মীদের কাছ থেকে ট্যাক্সের টাকা কেটে নেওয়া হবে। অথচ ফান্ড নিবন্ধন করার জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। সেটি না করে পুরো বিষয়টি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে কর্মীদের ওপর।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নতুন করে প্রভিডেন্ট ফান্ডের আয়ের ওপর উচ্চহারে কর ধার্য করায় আয় যেমন কমে যাবে, তেমনি বেসরকারি চাকরি করা ব্যক্তিদের ওপরও এর প্রভাব পড়বে।
'এক দেশে দুই আইন'
২০১৬ সালের আগ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি কোনো খাতের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডকে আয়কর দিতে হতো না। ২০১৬ সালের পর থেকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের মুনাফার ওপর উৎসে কর হিসেবে ৫ থেকে ১০ শতাংশ কর কেটে রাখা হতো। সম্প্রতি অনুমোদিত আয়কর আইন ২০২৩-এ প্রভিডেন্ট ফান্ডের ওপর কর আরোপের নতুন বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী এই অর্থবছর থেকেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে অর্জিত আয়ের ওপর কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে। একই সঙ্গে প্রফিডেন্ট ফান্ডের অর্থ কোথাও বিনিয়োগ করা হলে ওই আয়ের ওপর ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। এই সিদ্ধান্তকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মনে করছেন বেসরকারি খাতের চাকরিজীবী ও খাতসংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক বলেন, ‘আমি এটার কোনো যৌক্তিকতাই খুঁজে পাইনি’। এ ছাড়াও সরকারি চাকরিজীবীদের বাদ দিয়ে কেবল বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এটি কার্যকর করা ‘ভারসাম্যপূর্ণ হয়নি’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। 'জীবনযাত্রার ব্যয় তো সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য যা, বেসরকারিদের জন্যও তা। মাংস, সবজি– সবতো একই দামে কিনতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে (নতুন আইনকে) সরকারি চাকরিজীবীদের সঙ্গে তুলনা করলে মনে হবে এক দেশে, দুই আইন'।
সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে দ্বৈতনীতিকে ‘বৈষম্যমূলক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ। তিনি বলেন, এনবিআর থেকে আরও ব্যাখ্যার দরকার আছে। কেননা আগে যেখানে সর্বোচ্চ কর ১০ শতাংশ ছিল সেটাকে কোন যুক্তিতে বা কোন হিসেবে সাড়ে ২৭ শতাংশ করলো, এটা তাদের ব্যাখ্যা করতে হবে, ব্যাখ্যা করা উচিত হবে।
প্রভিডেন্ট ফান্ড কী?
কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সময় ব্যক্তির আয় থেকে প্রতিমাসে মূল বেতনের সাত থেকে ১০ শতাংশ কেটে একটি তহবিলে রাখা হয়। একই পরিমাণ অর্থ প্রতিষ্ঠানও ওই তহবিলে জমা রাখে। এর মাধ্যমে যে অর্থ জমা হয় তা কর্মী চাকরি শেষে পান। টাকা জমা রাখা এই তহবিলকেই বলা হয় প্রভিডেন্ট ফান্ড।
এ ছাড়াও একটি নির্দিষ্ট সময় পর চাকরি ছেড়ে দিলে বা অবসরে গেলে ব্যক্তি এককালীন একটি অর্থ পায়, একে বলা গ্র্যাচুইটি। গ্র্যাচুইটি ফান্ডের পুরো টাকা প্রতিষ্ঠান কর্মীকে দেয়। কোনো ব্যক্তি চাকরি ছাড়লে কিংবা অবসরে গেলে তিনি যত বছর কাজ করেছেন তত মাসের মূল বেতন পাবেন।
সরকারি চাকরিতে প্রফিডেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থা থাকলেও সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তা থাকে না। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান আইন মেনে চলে তারা কর্মীদের জন্য এই সুবিধা রাখে। যেহেতু বেসরকারি চাকরিজীবীরা সরকারি চাকরিজীবীদের মতো কোনো পেনশন পান না, চাকরিজীবন শেষে এই অর্থ তাদের জন্য অনেকটাই সামাজিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে।
প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ ফেলে না রেখে লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করা হয়, যাতে করে প্রভিডেন্ট ফান্ডের আয় বাড়ে।
আগে কী ছিল?
১৯৮৪ সালে প্রণীত আয়কর অধ্যাদেশে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক ছিল না। সেই তালিকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্রাচুইটিরও উল্লেখ ছিল। গত ২২ জুন পাস হওয়া নতুন আয়কর আইন- ২০২৩-এর ধারা ১৬৬(২)-এ দেওয়া তালিকা থেকে বেসরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্রাচুইটিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। একই আইনের ধারা ২(২২) এ দেওয়া সংজ্ঞা অনুসারে, তহবিলসমূহকে ‘করদাতা’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। ফলে এখন এই তহবিলসমূহের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক এবং নিয়ম অনুযায়ী এই কর হবে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
কর আরোপের প্রভাব কী?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকুরীজীবীরা যেমন চাকরীর মেয়াদ শেষে পেনশন পান, বেসরকারি চাকুরীজীবীরা তা পান না। ফলে অবসরে যাওয়ার পর প্রফিডেন্ট ফান্ডের টাকা তাদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, প্রভিডেন্ট ফান্ড এমন একটা বিষয় যা মানুষকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করে। সবাই যেন তহবিলের নিয়ম কানুন মেনে চলে তাই এই তহবিলের আইন কানুনও এনবিআর থেকে ভ্যাটিং করে নিতে হয়। এই ফান্ডগুলো এক ধরনের সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করে। এগুলোর ওপর কোনো কর আরোপ করা হলে স্বাভাবিকভাবেই অবসরকালীন সুবিধা কমে যাবে।
প্রভিডেন্ট ফান্ডের ওপর কর আরোপের কারণে এর সুবিধাভোগীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর এটিকেই করারোপের সবচেয়ে বড় প্রভাব হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক। তিনি বলেন, অবসরে যাবার পর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাটা অনেকের জন্যই খুব জরুরি। অনেকে হয়তো কেবল এই টাকার ওপরই নির্ভর করে। সে ক্ষেত্রে ফান্ডের টাকা কমে গেলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব তাদের ওপরই পড়বে।
এ ছাড়াও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থের ওপর উচ্চহারে করারোপ করলে প্রতিষ্ঠানগুলোও এতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবার সম্ভাবনা আছে। সে ক্ষেত্রে প্রভিডেন্ট ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকে।