বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়া ঘিরে রাজনীতি করছে সরকার। খালেদা জিয়াকে বিদেশ নিতে শুরু থেকেই বিএনপি অস্বাভাবিক রাজনীতি করেছে বলে সরকারি দলের দাবি। তাই এখন তার বিদেশ যাওয়ার অনুমতি না দিয়ে সরকারও পাল্টা রাজনীতি করছে বলে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
তবে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে নাম প্রকাশ করে কোনো কথা বলতে রাজি নন সরকারি দলের নীতিনির্ধারকরা। প্রায় সবাই ইস্যুটি নিয়ে মুখে কুলুপ দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন হুমকি-ধমকি দিয়ে অস্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে বিএনপি। বিষয়টি শুধুই বিদেশ যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি এখন। বিএনপির নেতারা বিদেশ যাওয়াকে চলমান আন্দোলনে জয়-পরাজয় হিসেবেও নিয়েছে। দলটির নেতাদের পূর্বাপর অবস্থান, বক্তব্য ও বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করলে পুরোটাই রাজনৈতিক জয়-পরাজয়ের ব্যাপার হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার আবেদনে নেতিবাচক জবাব দিয়ে বিএনপিকে আরেকবার জানিয়ে দেওয়া হলো সরকার ও আওয়ামী লীগ শক্তিশালী। কোনো কোনো পথ বের করে খালেদা জিয়াকে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ করে দিলে বিএনপি সেটিকে আওয়ামী লীগের দুর্বলতা হিসেবে দেখবে, দেখাবে। বিএনপির আন্দোলন মোকাবিলায় রাজপথে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
ইস্যুটি নিয়ে সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত ১০ জন নেতার সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের। আড়ালে-আবডালে আওয়ামী লীগের নেতারা চান, অনুমতি পেয়ে গেলে মন্দ সিদ্ধান্ত হতো না। কারণ, রাজনৈতিক ইস্যু বানানোর ফলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলে সেটা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে সেই দুশ্চিন্তা থেকে যায়। তার চেয়ে ভালো হতো অনুমতি দিয়ে দেওয়া। তাতে একটা চাপ তো অন্তত কমে যেত।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা আরও জানান, খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারটি বিএনপি স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখলে ইতিবাচকভাবেই দেখার চেষ্টা করত সরকার। কিন্তু চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতি না দেওয়ার মূল কারণই এখন হয়ে গেছে রাজনীতি। কারণ খালেদা জিয়াকে এ সুযোগ দিলে বিএনপি প্রচার করবে এ ইস্যুতে তারা জিতেছে। সে ক্ষেত্রে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেতাকর্মীদের আরও বেশি সক্রিয় করে তুলবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে আসছে নভেম্বরে। অক্টোবর মাস রাজনৈতিক মাঠে নানা ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার দাবি পূরণ করা হলে বিএনপির গলা ফাটানো রাজনীতি আরও জোরালো হবে। তখন মাঠ সামাল দিতে আওয়ামী লীগের জন্য অনেকটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অর্থ আত্মসাতের মামলায় দন্ডিত বিএনপির চেয়ারপারসনকে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশ নেওয়ার দাবি করে আসছে বিএনপি। দীর্ঘদিনের এ দাবি পূরণ হতে পারে, গত সপ্তাহে এমন আশাবাদী হয়ে ওঠে বিএনপি। কারণ আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, আবেদন পেলে অনুমতির বিষয়টি দেখা হবে।
এরপর বিভিন্ন মহলেও আলোচনা শুরু হতে থাকে বিদেশ যাচ্ছেন অসুস্থ খালেদা জিয়া। তার পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন খালেদা জিয়া এমন ধারণার জন্ম নেয়।
গতকাল রবিবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়ে দিয়েছেন, খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার সুযোগ নেই। তারা এ মতামত জানিয়ে আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
এর আগে গত শনিবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হলে এখন যে সাজা স্থগিত করে তাকে বাসায় থাকার অনুমতি দিয়েছি, তা প্রত্যাহার করে নিতে হবে। আবার তাকে জেলে যেতে হবে, আদালতে যেতে হবে। আদালতের কাছ থেকে তাকে অনুমতি নিতে হবে।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়া নিয়ে সরকারের ভেতরে এক ধরনের সন্দেহ দেখা দিয়েছিল, বিদেশে গিয়ে খালেদা জিয়া রাজনীতি শুরু করবেন। জনমত সৃষ্টির জন্য ছেলে তারেক রহমান তাকে ব্যবহার করবেন। সর্বশেষ সে সন্দেহ কাটলেও দেশের আন্দোলনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে মনে করে ক্ষমতাসীনরা বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা দেখিয়েছে।
তারা আরও বলেন, বিষয়টি যেহেতু আইনি কাঠামোতে পড়েও না, তাই সরকারের দেখানো অনীহা বড় করে দেখাতে পারবে না বিএনপি। এটিও সাহস জুগিয়েছে ক্ষমতাসীন দলকে।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমনিতেই দেশে-বিদেশে কিছুটা চাপের মধ্যে রয়েছে সরকার। এ ইস্যুতে বিএনপির গলা ফাটানো রাজনীতি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মনোবলে চিড় ধরাবে। এ সুযোগে বিএনপি ধ্বংসাত্মক রাজনীতি শুরু করবে। সংঘাত-সংঘর্ষ বেড়ে যেতে পারে, এ আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত সরকার নিতে পারেনি।
সরকারের একজন মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি খালেদা জিয়ার বিদেশযাত্রাকে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে নিয়ে জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেলেছে। চিকিৎসার প্রয়োজনে তাকে বিদেশ নিতে হবে এ অবস্থানে থাকলে তার বিদেশযাত্রা সহজ ছিল। বিএনপি এটাকে যেখানে নিয়ে গিয়েছে, এ পর্যায়ে বিদেশযাত্রার অনুমতি পেয়ে গেলে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ব্যাকফুটে নিয়ে যাবে।’
