দৈনিক ইত্তেফাকে কলাম লিখতেন- ‘মোসাফির’ নামে। অসাধারণ শব্দনৈপুণ্যে বিদ্ধ করতেন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা আইয়ুব খানকে। সেইসময় অসংখ্যবার তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে আজ ছাপা হলো সেই উপসম্পাদকীয়
সাংবাদিক সম্মেলনের মধ্য দিয়া জনাব আইয়ুব তাঁর পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনী সফর সমাপ্ত করেন। সাংবাদিক সম্মেলন কেন মাত্র ৫ মিনিট স্থায়ী হইল, তার কারণ প্রত্যক্ষভাবে আমাদের জানা নাই। তবে তিনি ১১ দিনব্যাপী প্রদেশ সফর করিতে পারিলেন, তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে এরূপ অধৈর্য হইয়া পড়িলেন কেন, তাহাই কিছুটা বিস্ময়ের ব্যাপার। যাই হোক, ইহা নিয়া আমাদের গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। তবে তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত-অলিখিত ভাষণে অনিমিষ্ঠ ভাষণে যে সকল কথা বলিয়াছেন, তার কতকগুলি বিষয়বস্তু নিয়া আলোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি অবশ্য সাংবাদিক সম্মেলনে কতকগুলি ভাল কথাও বলিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, বিরোধীদল জয়ী হইলে তিনি তাহা মানিয়া নিবেন। কেননা ইহাই শাসনতান্ত্রিক বিধান। ইহার পরক্ষণেই তিনি আবার বলিয়াছেন যে, বিরোধীদল অত্যাচার-অনাচার চালাইয়া গেলে এবং দেশে আবার ১৯৫৮ সালের অক্টোবরের পূর্বেকার ‘বিশৃংখলা’ দেখা দিলে দেশে পুনরায় ‘বিপ্লব’ অনুষ্ঠিত হইতে পারে। কেননা, মানুষের উপর অনাচার-অত্যাচার চলিলে বিপ্লব অনুষ্ঠিত হওয়াই প্রকৃতির নিয়ম। আইয়ুব সাহেবের এই বক্তব্যের মধ্যে প্রচ্ছন্ন হুমকি আছে কি-না তাহা অবশ্য আমরা বলিতে পারি না।
দেশরক্ষা বাহিনী দেশকে বহিরাক্রমণ হইতে রক্ষা করিবে এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করাই তাদের প্রধান কাজ। এই কারণেই দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল শ্রেণীর মানুষ দেশরক্ষা বাহিনীকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের রক্ষক হিসাবে শ্রদ্ধা করে, এই কারণেই সকল স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে দেশরক্ষা বাহিনীর মর্যাদা আলাদা এবং সর্বপ্রথমে তাদেরকে রাজনৈতিক বিতর্ক বা দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে রাখা হয়। স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মত ও পথের পার্থক্য শুধু স্বাভাবিকই নয়, ইহাই গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থার প্রাণস্বরূপ। যে দেশে এই স্বাভাবিক রাজনৈতিক বিতর্কে দেশরক্ষা বাহিনীকে জড়ানো হয়, সেই দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ বলিয়া কিছুই থাকে না; বরং মারামারি, কাটাকাটি, অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
আইয়ুব সাহেব সাংবাদিক সম্মেলনে হুমকির সুরে বলিয়াছেন যে, ১৯৫৮ সালের অক্টোবর ‘বিপ্লবের’ পর রাজনীতিকদের প্রতি যে ‘উদারতা’ প্রদর্শন করা হয়, তাঁরা তার মর্যাদা রক্ষা করেন নাই; অপরাপর দেশে এ ধরনের ‘বিপ্লব’ অনুষ্ঠানের পর রাজনীতিকদের ভাগ্যে কি ঘটিয়াছে তাহা হইতেও তারা শিক্ষা গ্রহণ করেন নাই। এ কথা সত্য যে, আইয়ুব সাহেব এই দেশে ‘বিপ্লব’ অনুষ্ঠান করিয়া রাজনীতিকদের প্রকাশ্যে গুলি করিয়া হত্যা করেন নাই। কিন্তু যে-সকল দেশে এই ধরনের হত্যাকান্ডের আশ্রয় নেওয়া হইয়াছে সেই দেশের পরিস্থিতি কি দাঁড়াইয়াছে, তাহা তিনি বর্ণনা করেন নাই। ইরাকের জেনারেল করিম কাসেম এবং মধ্যপ্রাচ্যের কতিপয় দেশের প্রতি তাকাইলে তিনি নিজেই তাহা দেখিতে পারিতেন। পূর্ব পাকিস্তানের নিকটবর্তী ভিয়েতনামে কি ঘটিয়াছে ও ঘটিতেছে তাহাও তাঁর দৃষ্টি এড়াইবার কথা নয়। স্বয়ং আইয়ুব সাহেবই বলিয়াছেন যে, অত্যাচার-নির্যাতনের স্বাভাবিক প্রতিফল হইল ‘বিপ্লব’। তিনি যেখানে এই সত্যটি উপলব্ধি করিয়াছেন, সেখানে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাইয়া তিনি অন্যান্য দেশের মতো রাজনীতিকদের গুলি করিয়া হত্যা করেন নাই, এই কথা বলার সার্থকতা কী।
৪৪ মাস স্থায়ী সামরিক শাসনকালে তিনি যে রেগুলেশন জারি করিয়াছিলেন তা দ্বারা শুধু রাজনীতিকদেরই মুখ বন্ধ করিয়া রাখা হয় নাই, দেশের যে কোনো লোক তাঁর শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এতটুকু সমালোচনা করিলে, তাদের জন্য বেত্রাঘাতসহ ১৪ বৎসর, এমনকি যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাইবার সামরিক আইন বলবৎ করা হইয়াছিলো। তাহা কি অত্যাচার-নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে না? প্রাক্তন সীমান্ত প্রদেশ, বেলুচিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক ধরপাকড় এবং বহু লোকের বিষয়-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, বেত্রাঘাতসহ কারাদন্ড এবং শত শত রাজনৈতিক নেতা এবং কর্মীকে বিনাবিচারে বছরের পর বছর জেলে আটক রাখা কি নির্যাতন নয়? সেই সময় দেশব্যাপী যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হইয়াছিল তাতে সচেতন, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির নিকট মৃত্যু এবং বাঁচিয়া থাকার মধ্যে কি বিশেষ কোন পার্থক্য ছিল। গুলি করিয়া হত্যা করা যন্ত্রণাদায়ক হইলেও, এই যন্ত্রণা অল্পকালের মধ্যেই শেষ হয়; কিন্তু যে দেশে কোন নাগরিকেরই মুখ খোলার অধিকার থাকে না এবং মুখ খুলিলে যেখানে বেত্রাঘাত, ১৪ বছর কিংবা যাবজ্জীবন কারাদন্ড এমন কি ফাঁসির ব্যবস্থা থাকা তাহা কি গুলি করিয়া হত্যা করা অপেক্ষা কম যন্ত্রণাদায়ক, না বেশি?
আইয়ুব সাহেব ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছেন; তাই তিনি দেশবাসীর এই মানসিক যন্ত্রণা হয়তো উপলব্ধি করিতে পারেন না; কিন্তু দেশ শাসনের নামে দেশের প্রতিটি মানুষের উপর ঐ ধরনের খড়গ ঝুলাইয়া রাখিলে মানুষ জীবিত অবস্থাতেই তো প্রতি মুহূর্তেই মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করে। আমরা এই যন্ত্রণার ভুক্তভোগী হইলেও প্রার্থনা করি, আইয়ুব সাহেবের যেন কোনদিন সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করিতে না হয়। আইয়ুব সাহেব ১৯৫৮ সালের অক্টোবরের পূর্বেকার ‘বিশৃংখলার’ উল্লেখ করিয়াছেন। ‘বিশৃংখলা’ বলিতে তিনি প্রাদেশিক পরিষদে শাহেদ আলী হত্যাকান্ডের কথাই বুঝাইতে চাহিয়াছেন। এই ঘটনাটি সকলের নিকটই বেদনাদায়ক, কিন্তু এই ধরনের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে উপলক্ষ করিয়া দেশের শাসনতন্ত্র বাতিল এবং সামরিক শাসন প্রবর্তনের নজিরও দুনিয়ায় বিরল। দুনিয়ায় এমন কোন গণতান্ত্রিক দেশ নাই, যেখানে ইহা অপেক্ষাও অবাঞ্ছিত মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে নাই। মানব সমাজে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কত কিছু অনর্থ, কত কিছু দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। মানুষ তার প্রতিকারের চেষ্টা করে। আইন আদালতের আশ্রয় নেয়। কিন্তু সমাজের এখানের-ওখানের অনাচারের জন্য সমাজ-ব্যবস্থাকে উড়াইয়া দেয় না। মরহুম শাহেদ আলীর হত্যাকা-কে সেই চোখে দেখা যাইত, তাঁর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইত। এমনকি চরম ব্যবস্থা হিসাবে প্রাদেশিক পরিষদ বাতিল করিয়া নূতন, নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়া যাইত। কিন্তু একটি বিক্ষিপ্ত ঘটনাকে উপলক্ষ করিয়া দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও বিধি-ব্যবস্থা চুরমার করা হইবে, আইনের অনুশাসনের পরিবর্তে গোটা দেশে জঙ্গী আইন প্রবর্তন করা হইবে, এমনকি জনগণকে ভোটাধিকার বঞ্চিত করিয়া রাখা হইবে, ইহা শুধু অন্যায়, অযৌক্তিকই নয়, মতলব প্রসূতও বটে। আর এই মতলব প্রকাাশ পাইয়াছে ক্ষমতা দখলকারীদের পরবর্তী কার্যকলাপ হইতেই।
যাঁরা ক্ষমতা দখলকালে দেশবাসীর উন্নতি অগ্রগতি বিধানের গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়া নিজেদের পরিবার-পরিজন-আত্মীয়-স্বজন এবং মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি-শিল্পপতিদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন করিয়াছেন; যারা দেশ হইতে দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি নির্মূল করিবার প্রতিশ্রুতি দিয়া দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির তা-বনৃত্য সৃষ্টি করিয়াছেন, তাঁদের নিকট হইতে এই প্রশ্নের সদুত্তর আশা করা যাইতে পারে না। রাজনৈতিক আমলে অনিয়মতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী আচরণ, দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি ছিলো না, এমন নয়। কিন্তু ইহার প্রতিকারের ব্যবস্থাও ছিলো জনগণের হাতে ভোটাধিকারের মাধ্যমে। আজ যে ১৯৫৮ সালের বিশৃঙ্খলার কথা আইয়ুব সাহেব বলিতেছেন তখন মরহুম শাহেদ আলীর একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া দেশে কোথায় নির্যাতন-অত্যাচার ছিল? এই সময় পূর্ব পাকিস্তানে জেলখানায় বিনা বিচারে একজন রাজবন্দিও ছিলেন না। পশ্চিম পাকিস্তানেও রাজনৈতিক বন্দিদের সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। দেশ বরং স্বাভাবিক অবস্থায় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হইতেছিল। ভোটার তালিকা মুদ্রিত হইতেছিল এবং নির্বাচনের মাস-তারিখও নির্দিষ্ট হইয়াছিল। আইয়ুব সাহেব বুঝাইয়া বলুন, তখন দেশের কোথায় নির্যাতন ও বিশৃঙ্খলার অস্তিত্ব ছিল? ১৯৫৮ সালের অক্টোবর ‘বিপ্লবের’ পূর্বে এইরূপ ঘটনাও তো অনুষ্ঠিত হইতে দেখি নাই। জানি, এই সমস্ত প্রশ্নের জবাব আইয়ুব সাহেব দিতে পারিবেন না। তিনি একতরফা কথা বলিতে ভালোবাসেন। অপরের কথা কানে তুলিবার ধৈর্য তাঁর নাই। কেন নাই, তার কারণও আজ আর বিশেষ অস্পষ্ট নয়।
জনাব আইয়ুব যখন হইতে ক্ষমতা দখলের চিন্তা করিতেছিলেন অর্থাৎ ১৯৫২ কিংবা ১৯৫৪ সালে তো মরহুম গোলাম মোহাম্মদ গভর্নর জেনারেল ছিলেন না। তাই মোহতারেমা মিস ফাতেমা জিন্না আইয়ুব সাহেবের এই দাবিকে অসত্য বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। ১৯৫২ এবং ১৯৫৪ সালের তাঁর চিন্তাধারা তার নিজেরই স্বীকারোক্তি। আর ১৯৫২ এবং ১৯৫৪ সাল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৫২ সালে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করিবার আন্দোলন চরম পর্যায়ে পৌঁছে। আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি-গোলা বর্ষণের পর গোটা পূর্ব পাকিস্তান রাষ্ট্রভাষার দাবিতে দৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়। আর ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে প্রতিক্রিয়াশীল স্বৈরাচারী শক্তির পরাজয় ঘটাইয়া এই প্রদেশের গণতান্ত্রিক শক্তি সর্বপ্রথম গণতন্ত্রের ঝা-া উঁচু করিয়া ধরিতে সক্ষম হয়। যে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের ঘোরবিরোধী এবং যারা গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটিলে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের রাজনীতি ও শাসন-ব্যবস্থার যোগ্য অংশগ্রহণ করিবে সেই ভয়েতে ভীত ছিলেন, তাঁরাই ১৯৫২ সালে এবং ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক শক্তির প্রাধান্য লক্ষ্য করিয়া উৎকণ্ঠা বোধ করিতেছিলেন। আইয়ুব সাহেবও এই সময় প্রধান সেনাপতি থাকাকালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কব্জা করিবার কথা চিন্তা করিতেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানে স্বৈরাচারী শক্তিকে পরাভূত করিয়া গণতান্ত্রিক শক্তির উন্মেষ এবং আইয়ুব সাহেবের ঐ সময়কার চিন্তাধারার মধ্যে কোন যোগসূত্র আছে কি-না তাহা আমরা বলিতে পারি না। তবে এখনো তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে খোলাখুলি কিছু না বলিলেও মাঝেমধ্যে যাহা বলিয়া ফেলেন, তাহা উহাকে নাকচ করিবারই প্রচ্ছন্ন আভাস। তিনি এখানে- ওখানে এখনও একটিমাত্র ‘জাতীয় ভাষার’ উপর গুরুত্ব দিতেছেন। তাঁর কোন কোন অনুগ্রহভোগীদের মধ্যেও এই ধরনের উদ্ভট উক্তি মাঝে মাঝে শোনা যায়। আর গণতান্ত্রিক শক্তির প্রাধান্য বিস্তারকে তিনি যে ভয় করেন তাহা তাঁর প্রণীত শাসনতন্ত্র, গত ছয় বৎসরের কার্যকলাপ এবং জনগণকে ভোটাধিকার-বঞ্চিত করিয়া রাখিবার মধ্যেই প্রকাশ পায়। তিনি এখনও ‘শক্তিশালী’ কেন্দ্রের পক্ষে ওকালতি করিতেছেন এবং এই শক্তিশালী কেন্দ্রের অর্থে তিনি রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষমতা পিন্ডি-ইসলামাবাদে এক ব্যক্তির হতে (এবং নিজ হস্তে) রাখিতে চাহিতেছেন। তাঁর এই ‘শক্তিশালী’ কেন্দ্রীয় শাসনের বদৌলতে গত ছয় বৎসর পূর্ব পাকিস্তানকে রাজনৈতিক এতিমে পরিণত করিয়া রাখা হইয়াছে; এখানের প্রতিনিধি তিনিই মনোনয়ন করেন, তাঁর খুশী-খেয়ালের উপরই তাদের নিয়োগ বরখাস্ত সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে; এখানে যে একটি আইন পরিষদ আছে, প্রাদেশিক প্রতিনিধি নির্বাচনেও তাঁদের কোন হাত নাই। স্থিতিশীলতার নামে তিনি ভবিষ্যতেও এই ব্যবস্থাই স্থিতিশীলতার কায়েম রাখিতে চান। মোহতারেমা মিস ফাতিমা জিন্না গতকল্য আইয়ুব সাহেবের বিরুদ্ধে বাঙ্গালীদের (পূর্ব পাকিস্তানি) সামরিক বিভাগে সুযোগ না দিবার যে অভিযোগ করিয়াছেন এবং মরহুম খাজা নাজিমুদ্দিন ‘পরলোকগমনের একপক্ষকাল পূর্বে বাঙ্গালী রেজিমেন্ট গঠনে আইয়ুব সাহেবের আপত্তির যে তথ্য প্রকাশ করিয়াছিলেন, এই প্রদেশবাসী তাহা কেন অবিশ^াস করিবে? এই তিনিই যদি পূর্ব পাকিস্তানের অভিভাবক সাজেন, তাঁর হস্তেই যদি রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে তাহা হইলে বর্তমানের মতো কতিপয় ভাগ্যবান এবং ক্ষমতাসীনদের কারও কারও ছেলেপিলের-আত্মীয়-স্বজনের পোয়াবারো হইলেও পূর্ব পাকিস্তানিদের ভাগ্যে যে কি জুটিবে তাহা সহজেই অনুমেয়। উদোর পি-ি বুধোর ঘাড়ে চাপাইয়া অর্থাৎ রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে কল্পিত নির্যাতন ও অনাচারের অভিযোগে তুলিয়া তাঁর গত ছয় বৎসরের শাসনকালের শ্বাসরুদ্ধকর ব্যবস্থা, অত্যাচার নির্যাতনের চাক্ষুষ ঘটনাবলি লোকচক্ষের অন্তরালে ঠেলিয়া দিতে পারিবেন না। কিংবা ভবিষ্যৎ ‘বিপ্লবের’ ভয় দেখাইয়া জনগণকে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন হইতে বিরত করিতে পারিবেন না। দেশে যদি মানুষের মান-মর্যাদা এবং অধিকারই না থাকে তবে সেই অসহায় অবস্থা অপেক্ষা মৃত্যুই অনেকের নিকট শ্রেয়।
(ঈষৎ সংক্ষেপিত)
লেখক: তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া প্রতিষ্ঠাতা, দৈনিক ইত্তেফাক ২৪ নভেম্বর, ১৯৬৪
