ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শোধ

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৩, ১২:২৭ এএম

গেল অর্থবছর সরকার ব্যাংক খাত থেকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নিয়েছিল। যার অধিকাংশই নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। এক্ষেত্রে নতুন টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দেয়। এক বছরের মধ্যে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ১০ শতাংশে উন্নীত হয়। এমন পরিস্থিতিতে চাপে পড়ে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে মনোযোগী হয়েছে সরকার। এক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও অন্যান্য খাত থেকে ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের ঋণ পরিশোধ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর মাসে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২৯ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা ঋণ শোধ করেছে। এজন্য বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ২৫ হাজার ৭০৯ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। এতে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণ কমেছে ৩ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকব্যবস্থার মধ্য থেকেই ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের দায় শোধ করছে সরকার। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সরকারের ঋণ কমলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকে তা বাড়ছে। অবশ্য আলোচিত সময়ে ব্যাংকব্যবস্থার বাইরে থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে ৪ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা। এর ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ সামগ্রিকভাবে ৮৬৯ কোটি টাকা বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের মূল্যস্ফীতি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। যে কারণে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ বিতরণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এজন্য সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পরিশোধ করছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়ার সুযোগ কমেছে। গত আগস্টে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে আসে, যা গত ২১ মাসে সর্বনিম্ন।

বর্তমানে ব্যাংক খাতে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরের শেষে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে ঋণ কমেছে ৩ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা।

চলতি বছরের জুন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা, যা গত সেপ্টেম্বরে কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। আর জুন শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংকে সরকারের ঋণস্থিতি ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের সুদ ব্যয় কমাতে নানা কড়াকড়ির কারণে গত অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রে ঋণ কমলেও সম্প্রতি তা আবারও বাড়তে শুরু করেছে। এছাড়া বিশ^বাজারে তেল ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত অর্থবছর ব্যাংক খাত থেকে মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নিয়েছে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকজন অর্থনীতিবিদের সঙ্গে বৈঠক করে। এতে সবাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। আর সেই পরামর্শের আলোকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ কমাচ্ছে সরকার।

চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪০১ কোটি টাকা। এ হিসাবে এই দুই মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১৪ গুণ। যদিও এই খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে মাত্র ১৮ হাজার কোটি টাকা নেবে সরকার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা বা ৪৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ কম। গত অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্য ঠিক করা ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রজ্ঞাপন জারি করে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়েছিল সরকার। একই প্রজ্ঞাপনে কয়েকটি স্তর করে দিয়েছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)। এর পর থেকেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমতে থাকে। সরকার এ খাতে সুদ ব্যয় কমাতে এমন কঠোর উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণ নেবে সরকার। আগের অর্থবছরে এ খাতের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত