অর্থনীতিতে সন্তান লালনপালনের প্রশ্ন

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৩, ১০:২২ পিএম

শ্রমবাজারে নারীর ভূমিকা নিয়ে বোঝাপড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায়, চলতি বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ৭৭ বছর বয়সী ক্লডিয়া গোল্ডিন। কর্মক্ষেত্রে নারী কেন পুরুষের চেয়ে কম বেতন পায়, তার কারণ অনুসন্ধানে গোল্ডিনের গবেষণাকে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী সংযোজন বলা হচ্ছে। তিনি দেখিয়েছেন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণের চেয়েও যে বাস্তবতা নারীকে পুরুষের সমান আয় করতে দিচ্ছে না, তা হলো সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব। 

প্রায় চার দশক ধরে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে কাজ করছেন গোল্ডিন। জেন্ডার এবং অর্থনীতিকে এক সূত্রে গাঁথার মতো কঠিন কাজটি সম্ভব করেছেন তিনি। বছরের পর বছর ধরে একজন পাকা গোয়েন্দার মতো করে তথ্য সংগ্রহ করেছেন গোল্ডিন, নিজেকে গোয়েন্দাই দাবি করেন ইতিহাসনির্ভর এই অর্থনীতিবিদ। খুঁজে বের করেছেন কখন কীভাবে আর কেন নারীরা আয়বৈষম্যের শিকার হয়েছে, আর কখনই-বা সেই বৈষম্য কমেছে এবং কেন কমেছে। আর এই গবেষণায় তিনি যুক্ত করেছেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শ্রমবাজারে যুক্ত থেকেও বঞ্চনার শিকার হওয়া নারীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা।

গোল্ডিনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পবিপ্লবের পর নারী হঠাৎ করেই অনেক বেশি পিছিয়ে পরে পুরুষের তুলনায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরিস্থিতির কিছুটা বদল ঘটে, বিশেষ করে সত্তরের দশকে গর্ভনিরোধক বড়ি আবিষ্কারের পর নারীরা কর্মক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। এই সময়টাকে, তিনি বলছেন বৈপ্লবিক অধ্যায়। এই সময়েই যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের গড় বিয়ের বয়সও আগের চেয়ে বেড়ে যায়, এতে কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রবেশের সুযোগও বাড়ে। এর ফলেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারায় শ্রমবাজারে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। কিন্তু এখনো, শেষতক সেই সন্তান লালনপালনের প্রশ্নে এসেই থমকে যায় বেশিরভাগ নারীর ক্যারিয়ার। গোল্ডিন দেখিয়েছেন, প্রথম সন্তানের জন্মের পর নারী-পুরুষ দুজনকেই ছাড় দিতে হয়, তবে পুরুষ যেখানে পরিবারে দেওয়া সময় কমিয়ে কর্মক্ষেত্রে বেশি মনোযোগী হয়, নারীর ক্ষেত্রে হয় তার ঠিক উল্টোটা। আবার একই পেশায় একই অবস্থান থেকে শুরু করেও একজন নারী পিছিয়ে পড়ে সন্তান জন্মদানের পর। 

মজার বিষয় হলো, গোল্ডিন দীর্ঘদিনের গবেষণায় তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যেটি প্রমাণ করেছেন, বিশ্বের বহু নারীই তা তাদের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করে। তবে গোল্ডিনই প্রথম অর্থনীতিতে এই বিষয়টির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হয়েছেন। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অর্থনীতিতে এককভাবে নোবেল পেয়েছেন কোনো নারী। একে নারীদের জন্য এক নীরব বিপ্লব আখ্যা দিচ্ছেন বিশ্লেষকদের অনেকেই। গোল্ডিনের এই নোবেল জয় অর্থনীতিতে ‘রিপল ইফেক্ট’ তৈরি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং থিংক ট্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অফ ল’ অ্যান্ড ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্রায়ান আলব্রেখট মনে করেন, একই সঙ্গে শ্রমবাজার, অর্থনীতি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে গোল্ডিনের গবেষণা। ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারকদের পথনির্দেশ দেবে।

গোল্ডিনের নোবেল জয় শুধু নারী-পুরুষের আয় বৈষম্য নয়, কাজের পরিবেশ নিয়েও আলোচনা এগিয়ে দিয়েছে। নারী-পুরুষ সবার জন্যই নমনীয় কর্মঘণ্টার সুপারিশ করেছেন তিনি। করোনা মহামারী শুরুর পর থেকেই অবশ্য এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বর্তমান বিশ্বের শ্রমবাজারে এক নেতিবাচক প্রপঞ্চ হিসেবে এক ধরনের ‘লোভী’ কর্মপরিবেশের কথা বলেছেন গোল্ডিন। তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘গ্রিডি জব’, যেখানে কাজের চাপ প্রচণ্ড রকম বেশি। ৮ ঘণ্টার নির্দিষ্ট সময় নয়, বরং আশা করা হয় একজন কর্মী দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই দায়িত্ব পালন করবেন। অফিস টাইমের বাইরে মিটিং, ফোনকল অথবা ইমেইলে যোগাযোগ করবেন। ছুটিছাটা নেবেন কম। সাধারণত, এই ধরনের কাজের ক্ষেত্রেই বেতন বেশি হয়, কিংবা যারা এ ধরনের কাজ করতে পারেন তারাই বেশি আয় করেন। আর এখানেই পিছিয়ে পড়ে নারীরা, যাকে একই সঙ্গে পরিবারে সেবাদানকারীর ভূমিকা পালন করতে হয়। সন্তান লালন-পালনের গুরুদায়িত্বটাও যে তার ওপরেই বর্তায়। অর্থাৎ, যেসব পেশায় কর্মঘণ্টা অনেক বেশি, নারী যে নিজের ইচ্ছায় সে পেশায় যাচ্ছে না এমনটা নয়, বরং সংগত কারণেই সে পেরে উঠছে না। সামাজিক রীতি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং নীতির কারণেই নারী পিছিয়ে থাকছে। ফলে আয়ের দিক থেকেও সে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। আর নারীর একার পক্ষে এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করাও সম্ভব নয়। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উপায় নেই বলে সাবধান করেছেন গোল্ডিন।

প্রথাগতভাবে যেমন মনে করা হয়, নারীরা কম বেতনের চাকরি বেছে নেয় বলেই পুরুষের সঙ্গে তাদের আয়ের বৈষম্য হয়, এই ধারণাও নাকচ করে দিয়েছেন গোল্ডিন। তিনি দেখিয়েছেন, একই পেশায় থেকেও, এমনকি আইনজীবী বা চিকিৎসকের মতো উচ্চ বেতনের চাকরির ক্ষেত্রেও নারী-পুরুষের আয়ের বৈষম্য রয়েছে।

কীভাবে নারীদের এই আয়-বৈষম্য কমিয়ে আনা যায়, তার সমাধান দিতে না পারলেও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন গোল্ডিন। কর্মক্ষেত্রে যেসব কাজ অনেক বেশি সময় দাবি করে, সেখানে কোনো একজনের প্রতি নির্ভরশীলতা না বাড়িয়ে বিকল্প তৈরি করা, কাজটা ভাগ করে নেওয়া। একইভাবে, পরিবারেও সব কাজ সন্তান লালন-পালন থেকে শুরু করে রান্না ও গৃহস্থালি, ভাগ করে নিতে হবে সমানভাবে, যাতে এককভাবে সেবাদানকারী হিসেবে চাপে না পড়ে নারী। আর এভাবে কাজ করতে পারলে সামগ্রিকভাবে উৎপাদনও বাড়বে। বর্তমান যুগের নারীরা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত কর্মক্ষেত্রে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তোলার জন্য। এমনকি অবসরের বয়স হয়ে গেলেও নারীরা কাজ অব্যাহত রাখছেন আরও অনেক বেশি বছর ধরে। তবে সন্তান জন্মদানের পর থেকে পরের কয়েকটি বছর অনেকেই কাজ ছেড়ে দেন। অথচ এই সময়টা পার করতে পারলে আবার তারা সহজে শ্রমবাজার ছেড়ে যান না।

৯ অক্টোবর রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমি যখন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারজয়ীর নাম ঘোষণা করেন, কাকতালীয়ভাবে এর কয়েক ঘণ্টা আগেই তার একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যার শিরোনাম ‘হোয়াই উইমেন ওন’। ওই প্রবন্ধে গোল্ডিন দেখিয়েছেন, কীভাবে শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পারিবারিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামোতে ধীরে ধীরে পুরুষের সমান হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে নারীরা। সম্পত্তির অধিকার, ভোটের অধিকার থেকে সন্তানের অভিভাবকত্বসহ বহু আইনি অধিকার আদায় করে নিয়েছে তারা। একে সমাজ এবং অর্থনীতির অন্যতম মহান অর্জন হিসেবেই দেখেন তিনি। কর্মক্ষেত্রে নারীর আয়-বৈষম্য কমাতে পারলে তাতে গোটা সমাজই উপকৃত হবে বলে মনে করেন তিনি।

নারীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে প্রথাগত বিজ্ঞানকে প্রায়ই আলাদা করে রাখা হয়।  কিন্তু গোল্ডিন প্রমাণ করে দিয়েছেন অর্থনীতিতে নারীর এই অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন খুবই জরুরি। পুরুষতান্ত্রিক পৃথিবীতে অর্থনীতিও বরাবরই পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এগিয়েছে। গোল্ডিন বলছেন, এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না ঘটলে অর্থনীতির উন্নয়নই বাধাগ্রস্ত থেকে যাবে। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে একটু মজার ছলেই গোল্ডিন বলেন, ‘পুরুষ মনে করে অর্থনীতি হলো আর্থিক ব্যাপারস্যাপার নিয়ে, তাই তারা এ বিষয়ে পড়াশোনা করে। আর নারী মনে করে অর্থনীতি হলো আর্থিক ব্যাপারস্যাপার নিয়ে, তাই তারা এ বিষয়ে পড়াশোনা করে না।’ গোল্ডিন বলছেন, আমাদের উচিত সবাইকেই এ কথাটা ভালোভাবে বোঝানো যে, অর্থনীতি হলো মানুষ নিয়ে। নোবেল জয়ের পর এক সাক্ষাৎকারে গোল্ডিন আশা প্রকাশ করে বলেন, তার গবেষণা শ্রমবাজারে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে। তবে এর জন্য সামাজিক আর পারিবারিক কাঠামোতেই সবার আগে পরিবর্তন আনতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘দম্পতিদের মধ্যে সমতা না থাকলে আমরা কখনোই সমাজে জেন্ডার সমতা দেখব না।’

লেখক: গণমাধ্যমবিষয়ক উন্নয়নকর্মী জেন্ডার ফোকাল

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত