ফিলিস্তিন নিয়ে বিএনপির নীরবতা দুর্ভাগ্যজনক

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৩, ০৫:৪৯ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের জঘন্য হামলার বিরুদ্ধে নীরব থাকায় বিএনপির কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, ফিলিস্তিনের ওপর বারবার হামলা আর সহ্য করা যায় না।

তিনি বলেন, ‘আমি দেখি অনেকেই (বিএনপি) চুপ থাকেন। কারণ যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে, তারা যদি আবার নাখোশ হয়। আর তারা আন্দোলন করে পদত্যাগের ডাক দেয়। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয়।’

প্রধানমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সড়ক ভবনে সারা দেশের আটটি বিভাগের ৩৯টি জেলায় একযোগে নবনির্মিত ১৫০ সেতু এবং ১৪টি ওভারপাস উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।

সেতুগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহ বিভাগে ৪০টি, ঢাকায় ৩২টি, চট্টগ্রামে ২৭টি, রাজশাহীতে ২২টি, খুলনায় ১২টি, বরিশাল ও রংপুরে ৮টি করে এবং সিলেটে ১টি রয়েছে। ১৪টি ওভারপাসের মধ্যে ৮টি রাজশাহী বিভাগে এবং ৬টি রংপুরে। প্রকল্পগুলো সড়ক ও জনপথ বিভাগের (আরএইচডি) অধীনে বাস্তবায়িত হয়েছে।

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে, আমরা শান্তি চাই। কারণ যুদ্ধের ভয়াবহতা আমরা জীবন দিয়ে দেখেছি। ইসরায়েল যেভাবে ফিলিস্তিনের ওপর হামলা করে, বিশেষ করে হাসপাতালে হামলা করে শিশু, নারী এবং মানুষ হত্যা করেছে, আমরা তার নিন্দা জানিয়েছি। আমাদের কথা হচ্ছে, দ্রুত এ যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। আর ফিলিস্তিনবাসী তাদের ভূমি যেন তারা ফেরত পায়। যে জায়গাগুলো দখল হয়ে গেছে, সেগুলো তাদের ফেরত দিতে হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বোমা মেরে মানুষ-শিশু হত্যা করা হলো, রক্তাক্ত শিশুদের সেই চেহারা সহ্য করা যায় না। সেজন্য আগামীকাল (আজ) শুক্রবার আমি সবাইকে অনুরোধ করব জুমার পর দেশের প্রতিটি মসজিদে এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেন দোয়া ও প্রার্থনা করা হয়। কেননা শুধু মুসলিম নয়, হতাহতদের মধ্যে অন্য ধর্মাবলম্বীরাও রয়েছে। আর শনিবার আমরা শোক দিবস ঘোষণা করেছি, সেদিন আমাদের জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনের যেসব নারী ও শিশুসহ জনগণ এখন কষ্ট পাচ্ছে, তাদের জন্য আমরা ওষুধসহ শুকনো খাবার এবং শিশু ও নারীদের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় পণ্য আমরা পাঠাব। কারণ আমাদের যেটুকুই সম্পদ তা নিয়ে আমরা সবসময় দুর্গত মানুষের পাশে আছি। যতটুকু পারি সাহায্য আমরা করব।’ এজন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং তার কার্যালয় থেকে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

ওআইসিভুক্ত দেশের রাষ্ট্রদূত এবং চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের সঙ্গে গত বুধবার বৈঠক করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই এক হয়ে ফিলিস্তিনের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের পাশে আছি। এভাবে তাদের ওপর বারবার আঘাত হানা এটা কখনো মেনে নেওয়া যায় না, আমরা মানতে পারি না।’

১৫০ সেতু এবং এর আগে গত বছর ৭ নভেম্বর ও ২১ ডিসেম্বর সারা দেশে ১০০ সেতু ও ১০০ সড়ক-মহাসড়ক উদ্বোধনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে অনেক সেতু ও সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ করেছি। সেগুলো মানুষের যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনে সুবিধা দেবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সড়ক ভবন চত্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি সুদৃশ্য ম্যুরাল ‘তৃতীয় নেত্র’ উদ্বোধন করেন। তিনি একই সঙ্গে অনুষ্ঠানে ডিটিসিএ ভবন, বিআরটিএর স্বয়ংক্রিয় মোটরযান ফিটনেস পরীক্ষা কেন্দ্র এবং বিআরটিসির বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র উদ্বোধনসহ ময়মনসিংহ জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর কেওয়াটখালী সেতু ও রহমতপুর সেতু নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কেওয়াটখালী সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে ৩২৬৩.৬৩ কোটি টাকা; যা দেশের বৃহত্তম স্টিল-আর্ক ব্রিজ হতে চলেছে এবং ১৪৭১ মিটার দীর্ঘ রহমতপুর সেতু নির্মাণে ৩৫৮ কোটি টাকা ব্যয় হবে। ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে সেতুগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হবে।

প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৬২ জন বা তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৭.০৮ কোটি টাকা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি চালু করেন এই অনুষ্ঠান থেকে।

গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু খাতের উন্নয়ন সংবলিত ‘উন্নয়ন দর্পণ’ নামে একটি বইয়ের মোড়কও উন্মোচন করেন তিনি।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী তেজগাঁও সড়ক ভবনে পৌঁছলে কিছু শিশু নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানায়। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান রওশন আরা মান্নান বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের (আরএইচডি) সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নূরী এবং এর প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসানও বক্তব্য রাখেন।

ঢাকার মিরপুর বিআরটিএ এবং ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজ মাঠ থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ মানুষ এ কর্মসূচিতে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। যাদের সঙ্গে পরে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী।

সরকারপ্রধান বলেন, ‘বিএনপি সন্ত্রাসী দল। মানুষ খুন করা দল। তারা প্রতিদিন আমাদের পদত্যাগ চায়। সে দাবিতে প্রতিদিন আন্দোলন করছে, করুক। আমার আছে জনগণ। আমার তো আর কেউ নেই। বাবা-মা, ভাইবোন সবই তো হারিয়েছি। কিন্তু আন্দোলনের নামে মানুষের ক্ষতি যেন করতে না পারে, সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন তারা নির্বাচন নিয়ে কথা বলে। অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন, নানান কথা বলে। সেটা নিয়ে আমি এখন সমালোচনা করতে চাই না। কারণ অনেক ভালো কাজ করেছি। তাই ভালো কথাগুলো বলে যেতে চাই। কিন্তু এদের কথা ও কাজ সবই ধ্বংসাত্মক। এ ব্যাপারে দেশবাসীকে আমি সতর্ক করতে চাই। আজকের উন্নয়নগুলো ধ্বংস করুক সেটা আমরা চাই না।’

বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০০৮-এর নির্বাচন এবং পরের উপনির্বাচন মিলিয়ে বিএনপি-জামায়াত ২০ দলীয় ঐক্যজোট ৩০০ সিটের মধ্যে মাত্র ৩০টি সিট পেয়েছিল। এই হলো তাদের শক্তি, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৫ বছর আগের বাংলাদেশ কী ছিল, তা এখনকার তরুণরা জানে না। তাদের কাছে বাংলাদেশের উন্নয়ন তুলে ধরতে হবে। ঘরে ঘরে সরকার বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ সুপেয় পানির নিশ্চয়তা পেয়েছে, যেজন্য একসময় হাহাকার ছিল।’ তিনি বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেন।

সড়কে অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করে সবাইকে ট্রাফিক আইন মেনে চলার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, চালকদের মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যারা আমাদের বাস, ট্রাক বা গাড়ি চালায় রাস্তায় তাদের যে একটা অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা, ওভারটেক করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। এজন্য চালকদের ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমরা তাদের সহায়তা করছি।’

ওআইসির প্রতিবেশীদের মধ্যে সমস্যা সমাধানে সংলাপের ওপর জোর : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওআইসির প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সব সমস্যা সমাধানের জন্য সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, ওআইসির প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সমস্যা থাকলেও (তাদের) সংলাপের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করা উচিত। বাংলাদেশে সৌদি রাষ্ট্রদূত এসা ইউসুফ এসা আলদুহাইলান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চলমান ফিলিস্তিন ইস্যুতে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্যের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি হস্তান্তর করে জেদ্দায় ৬-৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য ‘ওআইসি কনফারেন্স অন উইমেন ইন ইসলামে’ অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানান।

রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রীর কাছে আরেকটি চিঠি হস্তান্তর করেন এবং ২০৩৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের ক্ষেত্রে তার দেশের পক্ষে বাংলাদেশের সমর্থন চাইলে প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি রাষ্ট্রদূত ‘এক্সপো-২০৩০’-এর আয়োজন করতে তার দেশের পক্ষে নতুন করে সমর্থনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।

বৈঠকে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রদূতকে অবহিত করেন যে, বাংলাদেশ ‘ইমাম সম্মেলন’ আয়োজন করতে যাচ্ছে এবং তিনি ওই সম্মেলনে যোগদানের জন্য দুই পবিত্র মসজিদের ইমামদের আমন্ত্রণ জানান।

প্রধানমন্ত্রী আলদুহাইলানকে বলেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারতের সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় চালু করেছে এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গেও এটি করতে চায়। এ প্রসঙ্গে সৌদি রাষ্ট্রদূত তার দেশ বিষয়টি দেখবে বলে উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা দুই পবিত্র মসজিদের খাদেমকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে সৌদি আরবের জন্য বিশেষ স্থান রয়েছে। আলদুহাইলান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ধারাবাহিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এম তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া উপস্থিত ছিলেন। বাসস

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত