সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইনের প্রয়োগ জরুরি

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৩, ১০:০৮ পিএম

সড়ককে নিরাপদ করার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর ২২ অক্টোবর পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আইন মেনে সড়কে চলি, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’ সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের সৃষ্ট স্বাভাবিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় হেঁটে বা যানবাহনে চলাফেরা রীতিমতো বিপজ্জনক। বর্তমানে বাসায় সঠিক সময়ে কেউ না ফিরলে যে কথাটি সর্বপ্রথম মনে হয়, তা হলো সড়ক দুর্ঘটনা।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে দুর্ঘটনা প্রায় ৩০ গুণ বেশি। বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার উন্নত বিশে^র তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। এক হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫ হাজারেরও বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালের বিআরটিএর জরিপ মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর ২৩ হাজার ১৬৬ জন মানুষ নিহত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ৮০ হাজার শিশু মারা যায়। ২০১০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৯৬ শতাংশ শিশু ছিল অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যে ক্ষতি হয় তার আর্থিক পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির দুই ভাগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, আন্তর্জাতিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৫২০ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্বের অন্যতম জনবহুল মেগাসিটি- ঢাকা। প্রায় আড়াই কোটি লোকের তুলনায় এখানে রাস্তা বা যানবাহন কোনোটাই যথেষ্ট নয়। আর যেগুলো আছে সেগুলোর বেশিরভাগই জরাজীর্ণ। ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনার পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যা। তুলনামূলকভাবে ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে দুর্ঘটনার হার কিছুটা কম। দূরপাল্লার বাস, ট্রাকই মূলত এক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হয়। ২০১৮ সালে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর গণআন্দোলনে নামে দেশের প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা। তারা নিজের হাতে ট্রাফিক কন্ট্রোল করে দেশের আইন যে অন্ধত্বের ভূমিকা পালন করছে তা হাতেনাতে দেখিয়ে দিয়েছে। তাই আমাদের আজ ভাবতে হচ্ছে এর প্রতিকার নিয়ে।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিকারের জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে : ১. সাবধানে গাড়িচালনার জন্য চালকদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি মহাসড়কে অবৈধ রিকশার অনুপ্রবেশ রোধ, ২. অনির্ধারিত স্থানে গাড়ি পার্কিং বন্ধ, ৩. লাইসেন্স প্রদানের পূর্বে চালকের দক্ষতা ও যোগ্যতা ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে, লাইসেন্সবিহীন কেউ যেন গাড়ি চালাতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখাও আবশ্যক, ৪. গাড়ি রাস্তায় বের করার আগে এর যান্ত্রিক কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারলে দুর্ঘটনা অনেকাংশেই হ্রাস পাবে, ৫. সড়ক দুর্ঘটনার শাস্তির মেয়াদ আরও বাড়ানো দরকার। ৬. মোটরযান অধ্যাদেশে যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং শাস্তির বিধান উল্লেখ করা হয়েছে তা বাড়ানো দরকার, ৭. কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রচলিত পদ্ধতিতে লাইসেন্স প্রদানে প্রতিবন্ধকতা ও লাইসেন্সের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কম দামে জাল লাইসেন্স তৈরি ও বিক্রি করে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা কাগজপত্রের প্রমাণের অভাবে প্রতিকার করা দুরূহ। এ ধরনের জাল সার্টিফিকেট দেওয়া বন্ধ করা জরুরি, ৮. পুলিশ ও বিআরটিএর কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হবে, ৯. বীমা আইনের আওতায় বীমার টাকা তোলার বিষয়টি আরও সহজ করা দরকার, ১০. হাইওয়েতে মানুষ বা কোনো প্রাণী চালিত বাহন চলাচল বন্ধ করে তাদের জন্য বিকল্প রাস্তা তৈরি করা দরকার, ১১. রাস্তায় পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা, ১২. ফুটপাত হকারদের দখলমুক্ত করে পথচারী চলাচলের উপযোগী করে তোলার বিষয়গুলো মাথায় রেখে গোটা ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন ঘটানো অপরিহার্য। অন্যথায় সড়ক দুর্ঘটনা দিনের পর দিন আরও বাড়তে থাকবে, যা দেশ ও জাতির জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি পথচারীকেও ট্রাফিকের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, ১৩. গাড়ির প্রতিটি চালক ও যাত্রীদের স্মরণ রাখতে হবে সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। তাই সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অতিরিক্ত মাল ও যাত্রীবহন বন্ধ করা, ১৪. প্রয়োজনে সব রাস্তায় সিসি ক্যামেরা বসাতে হবে।

বর্তমান সমাজে ঘর থেকে বের হলেই প্রত্যেক মানুষকে সড়ক দুর্ঘটনা নামক আতঙ্ক তাড়া করে বেড়ায়। প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেই থাকে। যার ক্ষয়ক্ষতি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। জনসচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় সরকারি-বেসরকারি পদক্ষেপই এই মহামারীকে রুখে দিতে পারে। প্রতিটি প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ ভোগ করতে হবে। কিন্তু নিশ্চয়ই পথের বলি হয়ে কেউ মরতে চাই না। তাই সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি যতই জটিল সমস্যা হোক না কেন, সবার সামগ্রিক চেষ্টা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে এ থেকে রক্ষা পাওয়া তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ এ স্লোগানে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত