সাকিব দুয়োধ্বনি আর ‘বিতর্কিত’ ছুটি

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৪:২৬ এএম

বৃহস্পতিবার শৈশবের কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিমের সঙ্গে নেটে ঘাম ঝরিয়ে মিরপুরের বিসিবি অ্যাকাডেমি ছাড়ার সময় সাকিব আল হাসানের কানে নিশ্চয় পৌঁছেছে একদল সমর্থকের দুয়োধ্বনি। বিশ্বকাপে হাসছে না তার ব্যাট। তাই হুট করেই বুধবার ঢাকায় ফিরে প্রিয় কোচের কাছে নিজের ভুল শুধরাতে এসেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। তার ঢাকায় ফেরা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। টিম ম্যানেজমেন্ট জানিয়েছে, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সাকিবের দুদিনের ছুটি মঞ্জুর করেছেন কোচ হাথুরুসিংহে। আবার এ বিষয়ে বিসিবির বক্তব্য বিতর্কটা বাড়িয়ে দিচ্ছে। টুর্নামেন্ট চলাকালে নাকি ‘ফ্যামিলি ইমার্জেন্সি’ ছাড়া কোনো ক্রিকেটার ছুটি পেতে পারেন না!

বিতর্ক এড়াতেই পারছেন না সাকিব। বিশ্বকাপের আগে থেকেই হাত ধরাধরি করে চলছে সাকিব ও বিতর্ক। তামিম ইকবাল ইস্যু দিয়ে শুরু। সর্বশেষটা তার ঢাকায় ফেরা নিয়ে। মিরপুরে সমর্থকদের দুয়োধ্বনি (ভুয়া-ভুয়া), দল ও নিজের করুণ দশা, সব মিলিয়ে ক্যারিয়ারে এতটা খারাপ সময় খুব আসেনি তার। বিশ্বকাপের বাকি চার ম্যাচে যদি নিজে ছন্দে ফিরতে পারেন, দলের দুর্দশাও যদি ঘোচাতে পারেন, তবেই হতাশ সমর্থকদের দুয়োধ্বনির জবাবটা দিতে পারবেন সাকিব।

পাঁচ ম্যাচের শেষ চারটিতে হেরে দলের আত্মবিশ্বাস তলানিতে ঠেকেছে। চোটে ভারতের ম্যাচ মিস করা সাকিব দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ফিরে করেছেন মোটে ১ রান। ব্যাট হাতে বাজে সময়টা বয়ে বেড়াচ্ছেন অনেক দিন ধরেই। ২০১৯ বিশ্বকাপে ২ সেঞ্চুরি, ৫ হাফ-সেঞ্চুরিতে যার ব্যাট থেকে এসেছিল ৬০৬ রান। সেই সাকিব চার ম্যাচে খেলেছেন ১৪, ১, ৪০, ১ রানের ইনিংস। ২০১৯ বিশ্বকাপের পর আর সেঞ্চুরির দেখা পাননি। এর মাঝে অবশ্য এক বছরের আইসিসির নিষেধাজ্ঞায় ক্রিকেট থেকে দূরে ছিলেন। ২০২১ সালে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফিরে ৩৮ ওয়ানডেতে ৩৩.৮৪ গড়ে তার সংগ্রহ ১১১৭ রান। তাতে ৮টি হাফ-সেঞ্চুরি থাকলেও তিন অঙ্কের মাইলস্টোন ছোঁয়া হয়নি। তো এ অবস্থা থেকে দ্রুত ছন্দে ফিরতে না পারলে এবং শেষ চার ম্যাচে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে না পারলে তার ওপর বিশ্বাসটা আরও টলে যাবে।

বুধবারের আগ পর্যন্ত পয়েন্ট টেবিলে বাংলাদেশ ছিল তলানিতে। সে রাতে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে (৩০৯ রান) অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে বাংলাদেশের জায়গাটা নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। এই দলটির সঙ্গে শনিবার ইডেন গার্ডেনে বাংলাদেশ নামবে কক্ষে ফিরতে। সেমিফাইনালের স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেলেও গাণিতিক হিসাবে সম্ভাবনা এখনো টিকে আছে। তার জন্য শেষ চার ম্যাচে বাংলাদেশকে জিততে হবে, পাশাপাশি রানরেটও বাড়িয়ে নিতে হবে। সেই লক্ষ্য থেকে যে দলও সরে এসেছে অনেকটা তা তো সাকিবের কথাতেই পরিষ্কার। তিনি তো বলেই দিয়েছেন, সেমিফাইনালে যদি যেতে না-ই পারেন, অন্তত পাঁচ বা ছয়ে বিশ্বকাপ শেষ করতে চান।

বাস্তবতা মেনে সাকিবের এই বদলে যাওয়া লক্ষ্য নির্ধারণ যুক্তিযুক্ত। তবে টানা হারে দলের ওপর যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তা থেকে সতীর্থদের সামলে রাখতে, সামনের চার ম্যাচের জন্য সবাইকে উজ্জীবিত করার দায়িত্বটা কী করে এড়াবেন সাকিব? মাঠের বাইরের সেই গুরুদায়িত্ব ভুলে নিজেতে মজেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। অন্য কোনো দলের কোনো অধিনায়ক কি এটা করতে পারতেন? কিংবা অন্য কোনো টিম ম্যানেজমেন্টও কি এটা এত সহজে মেনে নিত?

এটা ঠিক, প্রতিটি ক্রিকেটারের একটা কমফোর্ট জোন থাকে। নিজের সমস্যাগুলো নিয়ে কাছের কোনো কোচের সঙ্গে কাজ করতেই স্বস্তিবোধ করেন। বিদেশি কোচরা সেই ক্রিকেটারের সমস্যাটা ধরতে পারলেও ঠিকঠাক সমাধানটা হয়তো দিতে পারেন না কখনো কখনো। তাই সাকিবের ফাহিম অথবা মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের মতো কোচদের সঙ্গে আলাদা কাজ করাটা দোষের নয়। ব্যাটে টানা রান খরায় দলের ক্ষতিটা যাতে দীর্ঘায়িত না হয়, সে চিন্তা থেকেই সাকিব ঢাকায় সময় কাটাচ্ছেন অভিজ্ঞ ফাহিম স্যারের সঙ্গে। তবে চাইলে তো বাংলাদেশ অধিনায়ক কলকাতাতেই এই বিশেষজ্ঞ কোচকে ডেকে নিতে পারতেন। টিম ম্যানেজমেন্ট নিশ্চয় তাতে দ্বিমত করত না। আর খেলোয়াড়টা যখন সাকিব, তখন তো দ্বিমতের প্রশ্নই ওঠে না।

ঘাটতি শুধরাতে সাকিবের ফাহিমের কাছে ছুটে আসায় হাথুরুসিংহের দিকে আঙুলটা উঠছে সেরা ক্রিকেটারের কাছ থেকে সেরাটা আদায় করতে পারছেন না বলে। সাকিবের সমস্যাটা তো একদিনের নয়। শ্রীলঙ্কান কোচের দায়িত্ব ছিল সেটা ধরিয়ে দেওয়া, শুধরে নিতে সাহায্য করা। সাকিবের মতো ক্রিকেটারের ঘাটতিগুলোই যখন চোখ এড়িয়ে যায়, তখন হাথুরুসিংহে অ্যান্ড কোং-এর ওপর কি আস্থাটা থাকে?

টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ সুজন ও ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির প্রধান জালাল ইউনুসের ভিন্ন স্থান থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য যদি সত্য হয়, তবে সাকিব নিয়ে সৃষ্ট রহস্যের দায় বর্তাবে কোচ চ-িকা হাথুরুসিংহের ওপর। সুজন বলেছেন, ‘সাকিবকে দুদিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। কোচ ছুটি দিয়েছে। ও বলেছে যে, ব্যক্তিগত কারণে ওকে একটু ঢাকায় যেতে হবে। আমরা ব্যক্তিগত কারণ বলেই জানি।’ একটি বৈশ্বিক আসরের মাঝখানে, দলের খারাপ অবস্থায় কোনো ক্রিকেটার কি ব্যক্তিগত ছুটি পেতে পারেন? এ প্রশ্নে জালাল ইউনুস বলেছেন, ‘এমনিতে কোনো টুর্নামেন্টের মাঝখানে ক্রিকেটাররা ছুটি পান না। তবে ফ্যামিলি ইমার্জেন্সি থাকলে ভিন্ন কথা।’

এটা পরিষ্কার, সাকিব ছুটি পেয়েছেন শুধুই নিজের ভুলগুলো শুধরে নিতে, কোনো ফ্যামিলি ইমার্জেন্সির জন্য নয়। অর্থাৎ ছুটির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এক্ষেত্রে মানা হয়নি। সেটা হয়তো সাকিব বলেই...। অবশ্য এ সব কিছুই চাপা পড়ে যাবে, যদি আসছে চার ম্যাচে বাংলাদেশ ঘুড়ে দাঁড়ায়। তখন দুয়োধ্বনি পাল্টে সাকিব শুনবেন হর্ষধ্বনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত