পরিপূর্ণ সুস্থতার জন্য শরীরের পাশাপাশি মনের পরিচর্যা করা গুরুত্বপূর্ণ। মনের সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখে মেডিটেশন। মেডিটেশনের ফলে মস্তিষ্ক অপ্রয়োজনীয় সবকিছু থেকে নিজেকে আলাদা করে নির্দিষ্ট বিষয়ে নিমগ্ন হয় এবং নিজের ক্ষমতাকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ও নিখুঁতভাবে ব্যবহার করতে শেখে। মেডিটেশন উপকারিতা ও অনুশীলনের পদ্ধতি সম্পর্কে জানাচ্ছেন আতিকুল হক
শিক্ষার্থীরা মিডটার্ম, ক্লাসটেস্ট, কুইজ, নানারকম প্রতিযোগিতা ইত্যাদির চাপে থাকে। মেডিটেশনের চর্চা এই স্নায়ুচাপ থেকে মুক্তি দিতে পারে। ব্রিদিং এক্সারসাইজ হয় বলে মেডিটেশন করলে ফুসফুস ভালো থাকে, রোগ প্রতিরোধ করে ক্ষমতা বাড়ে। তাই চিকিৎসকরা শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য মেডিটেশন চর্চার পরামর্শ দিচ্ছেন। মেডিটেশনের কয়েকটি উপকারী দিক নিচে উল্লেখ করা হলো :
# মেডিটেশন আইকিউ বৃদ্ধি করে। নিয়মিত মেডিটেশন করার ফলে স্মৃতিশক্তি, চিন্তাশক্তি ও নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়।
# অনেকেই পড়াশোনার চাপে ক্লান্তি অনুভব করে। একাডেমিক পড়াশোনার এই ধকল দূর করার ভালো উপায় হলো মেডিটেশন। মেডিটেশনের ফলে ভয়, উদ্বেগ ও ধকল হ্রাস পায়। মেডিটেশন দুশ্চিন্তা, দুঃখ ও রাগের মতো অনুভূতিগুলো কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।
# পড়ার সময় মনোযোগ না থাকলে সারাক্ষণ বসে পড়লেও কোনো লাভ নেই। মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে মেডিটেশন। প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে দুবার মেডিটেশন করলে মনোযোগ দ্বিগুণ পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।
# মেডিটেশন চিন্তাশক্তিকে একটি বিষয়ে কেন্দ্রীভূত করতে শেখায়। যার ফলে যে কোনো একটি বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, ফলে পড়ার সময় অন্যসব চিন্তা মস্তিষ্ক থেকে দূরে থাকে।
# মাত্র তিন মাস নিয়মিত মেডিটেশন উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমিয়ে আনে। নিয়মিত মেডিটেশন ক্লান্তি ও অবসন্নতা দূর করে, ফলে পুরো উদ্যমে পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজ করা সম্ভব হয়।
# মেডিটেশন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যারা নিয়মিত মেডিটেশন করে তাদের দেহে অ্যান্টিবডির পরিমাণ অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি থাকে।
# অনেক অভ্যাস আছে যেগুলো ক্ষতিকর জেনেও সহজে ত্যাগ করতে পারেন না অনেকেই। এর কারণ যথেষ্ট ইচ্ছাশক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব। মেডিটেশনের ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং বাজে অভ্যাস সহজেই ত্যাগ করা সম্ভব হয়।
# ভালো পড়াশোনার পূর্বশর্ত হলো শারীরিক সুস্থতা। যতই ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হোক না কেন, শারীরিকভাবে সুস্থ না থাকলে কখনোই পরীক্ষায় ভালো করা সম্ভব হয় না। মেডিটেশন মানসিকভাবে সুস্থ রাখার পাশাপাশি শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতেও সাহায্য করে।
# বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিষণ্ন তায় আক্রান্ত হয়ে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিচ্ছে। মেডিটেশন বিষণ্তান দূর করে। এটি অনেকটা Anti-Depression ওষুধের মতো কাজ করে।
মেডিটেশন করার নিয়ম
মেডিটেশনের নানা উপকারিতা যেমন রয়েছে তেমনি এটি চর্চা করাও খুব সম্ভব। তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এই যুগে মেডিটেশন করা পদ্ধতি জানা সম্ভব খুব সহজেই। রয়েছে বিভিন্ন মেডিটেশন কোর্স, সাহায্য নিতে পারেন এসব কোর্সেরও। তা ছাড়া কয়েকটি ছোট ধাপ মেনে নিজে নিজে অনুশীলন করতে পারেন মেডিটেশন। তবে যদি কোনো অসুবিধা অনুভব করেন তাহলে অবশ্যই একজন প্রশিক্ষক বা গুরুর সাহায্য নেবেন।
# মেডিটেশনের জন্য বেছে নিন কোনো নিরিবিলি জায়গা। মোবাইল সাইলেন্ট করে নিন। স্থানটিতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস যেন চলাচল করতে পারে তা খেয়াল রাখুন। পরনের পোশাক থাকবে ঢিলেঢালা। শক্ত বিছানা, কার্পেট বা মেঝেতে আদুর পেতে বসতে পারেন। চেয়ারে বসলে পা যেন মাটিতে লেগে থাকে তা খেয়াল রাখুন।
# শুরুতে কাছাকাছি সময়ে ঘটে যাওয়া কোনো আনন্দদায়ক ঘটনা মনে করুন। এবার হালকাভাবে চোখ বন্ধ করুন। নাক দিয়ে দম নিন। আস্তে আস্তে মুখ দিয়ে দম ছাড়ুন। দম নেবেন পেটের উপরিভাগে। দম নেওয়ার সময় পেটের উপরিভাগ ফুলে উঠবে এবং ছাড়ার সময় চুপসে যাবে। এভাবে ১০ বার দম নিন, দম ছাড়ুন।
# এরপর দম স্বাভাবিক হতে দিন। ভাবতে থাকুন শরীরের প্রতিটি অঙ্গ শিথিল হয়ে আসছে। এবার নাক দিয়ে ধীরে ধীরে দম নিন। বেশ সময় নিয়ে ধীরে ধীরে দম ছাড়ুন। দম নেওয়ার থেকে ছাড়ার জন্য একটু বেশি সময় নিন।
# দম স্বাভাবিক হতে দিন। এরপর দম অবলোকন করুন। লক্ষ করুন কীভাবে বাতাস নাকের ভেতর দিয়ে ফুসফুসে ঢুকছে, আবার নাক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। মন বিক্ষিপ্ত হলে আবার শ্বাস-প্রশ্বাসে ফিরিয়ে আনুন। শ্বাস-প্রশ্বাসের এই ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়াটা মেডিটেশনের একটা ধরন। কয়েকবার দম অবলোকন করার পর দেহ শীতল ও ভারী অনুভব করবেন। এটিই ধ্যানস্থ অবস্থা। এ অবস্থায় মন যে কোনো কাজ পূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে করতে পারে। এ অবস্থায় দিনের কাজের পরিকল্পনা, রাগ-ক্ষোভ-দুশ্চিন্তা দূর করা বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা ইত্যাদি বেশ ফলপ্রসূ হয়ে থাকে। দিনে দুবার মেডিটেশন চর্চা করলে মেডিটেশনের পরিপূর্ণ সুফল পাওয়া যায়।
গাইডেড মেডিটেশন
তা ছাড়া সিডি, এমপিথ্রি বা ইউটিউবেও নানা রকম মেডিটেশন পাওয়া যায়। এগুলো চালু করে বক্তার কথা অনুসারে দম নেওয়া, দম ছাড়া ও অবলোকনের মাধ্যমে সহজেই ধ্যান অবস্থা লাভ করা সম্ভব।
সতর্কতা
মেডিটেশনকালে সর্বদা ইতিবাচক চিন্তা করা উচিত। নিজের ও অপরের জন্য কল্যাণকর এমন কাজ সম্পর্কে ভাবা, পরিকল্পনা করা বা প্রার্থনা করা উচিত। মেডিটেশনের সময় যদি অতিরিক্ত মাথা ঘোরা, শ্বাসরোধ বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা হয় তাহলে সেই মুহূর্তে মেডিটেশন বন্ধ করে দেবেন এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তথ্যসূত্র : ‘কোয়ান্টাম মেথড’ বই
