সমাজ, সাহিত্য ও অর্থনীতি প্রকারান্তরে রাজনীতি ও অর্থনীতি এদের মধ্যে সম্পর্কটা সুপ্রাচীন, তবে সময়ের বিবর্তনে সম্পর্কের মধ্যে মতান্তর ঘটেছে। হতেই পারে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কেননা সমাজ পরিবর্তনশীল নিজস্ব গতিতে, অর্থনীতি সমাজের সেই গতিশীলতার নিয়ামক; উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিফলন ঘটবে, এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তখন, যখন অর্থনীতির কাছে সমাজ পরিবর্তনের প্রেসক্রিপশন প্রত্যাশা করা হয়, যখন আশা করা হয় অর্থনীতিই সব কিছুর ঠিক ও ভুল নির্ণয় করার দায়িত্ব নেবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজ বিনির্মাণে আদর্শ ও দর্শন সরবরাহ করতে অর্থনীতির করণীয় কী? আবার অর্থনীতি যদি সমাজের সমৃদ্ধি সাধনে লাগসই ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে না পারে তাহলে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও বঞ্চনা বৈষম্যের পরিবেশ তৈরি হয়। তা কি কেবল শুধু চেয়ে চেয়ে দেখার বিষয়? রাজনীতির কি কোনো দায়দায়িত্ব নেই। যদি প্রশ্ন উত্থাপনই না করতে পারল সমাজ ও অর্থনীতির গতিধারা নিয়ে, সমাজের গন্তব্য নিয়ে, সমাজের স্বার্থকতা নিয়ে তাহলে তো সমাজের উন্নতির প্রচেষ্টা ব্যর্থতার বিবরে চলে যাবেই। সমাজ সমাজের মতো কঠিন কর্কশ পথে এগোতে থাকবে আর সুবোধ বালকের মতো অর্থনীতি তাতে সর্বনাশের পথ রচনা করে চলবে, পথ সুগম করবে স্বেচ্ছাচারী হয়ে চলাচলের। অর্থনীতির সনাতন নীতি ও নিয়মকানুনে বেকুব বনে যায় যে সমাজে, সেখানে উন্নতির কোনো কার্যকর গাইডলাইন বা রোডম্যাপ এখন কেন কস্মিনকালেও কেউ দিতে পারেনি, পারবে বলে মনে হয় না। কখনো-সখনো এ ব্যাপারে কথাবার্তা যে ওঠেনি তা নয়, কিন্তু কার্যকরণগত কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যার অবর্তমানে আলোচনাটা যেন সেভাবে রয়েই গেছে।
নিঃসন্দেহে সমাজ আগে, অর্থনীতি পরে। সমাজ একটা বড় ব্যাপার, অর্থনীতি সেখানে নিয়ামকের ভূমিকা পালনকারী অনুগামী একটা শরিকমাত্র। সমাজ অর্থনীতিকে আমলে না আনলে সমাজের কিছু একটা যায়-আসে না, কিন্তু অর্থনীতি সমাজকে উপেক্ষা করতে পারে না। সমাজই হচ্ছে অর্থনীতির ক্যানভাস, সমাজ ছাড়া অর্থনীতি চলে না, সমাজের জন্য অর্থনীতির ভূমিকা আছে। সমাজ নেই তো শুধু অর্থনীতি কেন আরও অনেক কিছুই তবে নেই। তবে অর্থনীতি সমাজকে নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ করে বলেই সমাজ তার অস্তিত্ব, গতিধারা এমনকি মিশন ও ভিশন নির্মাণের জন্য অর্থনীতির পথ চেয়ে থাকে। সমাজ এগোচ্ছে না পেছাচ্ছে তা অর্থনীতির চেয়ে আর কে ভালো বলতে পারে? সমাজ সীমাহীন তীর-হারা নদীর মতো চলার পথে অর্থনীতি তার তীর বেঁধে দেয়, অর্থনীতি তাকে নিয়ন্ত্রণের উপায় নির্দেশ করে, গতিশীল হতে শলাপরামর্শ ও প্রেরণা দেয়। সমাজ যেন স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে, স্বার্থকতা ফিরে পায় অর্থনীতির গতিশীলতায়। সাহিত্য সমাজকে আর্কাইভে ভরে রাখে, তাকে শ্রেণিবিন্যাস থেকে শুরু করে পর্যায় পর্ব পরিচিতি পর্যন্ত নির্মাণ নির্ধারণের কাজও করে। সাহিত্য না থাকলে সমাজ ইতিহাসের বিষয়বস্তু হতে পারত না, কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর তার থাকত না। চর্যাপদের মধ্যে অঙ্কিত প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলার সমাজচিত্র যেমন সমকালীন জীবনযাত্রার ইতিহাসের সংরক্ষক।
সমাজ চলে সমাজের সবাইকে নিয়ে, তাদের অর্থনৈতিক ধ্যানধারণা আদর্শ ও দর্শনকে অবলম্বন করে। এসবের ব্যত্যয় এর ব্যারোমিটার মনিটর করে অর্থনীতি। সমাজের গতি যুগধর্মকে অবলম্বন করে। পরিবেশ পরিস্থিতি যুগধর্মের নিশান বরদার। পরিবেশ আপনাআপনি নির্মিত হয় না। এর পেছনে কাজ করে নানান কার্যকারণ আর সেই কার্যকারণ সৃজিত হয় প্রকৃতির প্রতি মানুষের আচরণ, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের মাত্রা ও মর্জির দ্বারা এবং প্রকৃতির আচরণের বিপরীতে মানুষের প্রতিক্রিয়া প্রকাশের সূত্রে। মানুষ প্রকৃতির কোলে প্রতিপালিত হয়, প্রকৃতিকে আত্মস্থ করে, প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে কিংবা প্রকৃতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে মানুষ জীবনযাপনই শুধু করে না, সেই জীবনের নানান প্রেক্ষাপট নির্মাণ করে, সহায় সম্পদ সৌধ নির্মাণ করে, রুচি-অভিরুচির ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। এভাবেই প্রকৃতির সঙ্গে বোঝাপড়ায় বেড়ে ওঠে মানবজীবনের নানান পর্ব।
পার্ল এস বাকের ‘গুড আর্থ’-এ আমরা জীবন আর প্রকৃতির নিরন্তর সংগ্রাম-সৌহার্দের যোজনা দেখি। প্রায় শতবর্ষের কাল পরিক্রমার ক্যানভাসে আনন্দ-বেদনার কাব্য রচিত হয় চীনা সমাজে তিন পুরুষের সংগ্রাম আর সন্ধির আয়নায় দেখা অসংখ্য ঘটনা ও এর আকর্ষণ-বিকর্ষণের বর্ণিল অবয়বে। এখানে নিরন্তর রূপান্তর প্রত্যক্ষ করি উপলব্ধির, মূল্যবোধের, আচার-আচরণের। যুগধর্মের প্রতি প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে গিয়ে বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন আচরণে নিষ্ঠ হয়েছে এর বিভিন্ন চরিত্র। সমকালীন সমাজের রূপান্তর আমাদের কাছে উপস্থাপিত হয় চরিত্রনিচয়ের আবেগ অনুভূতি আর উক্তি ও উপলব্ধির সালতামামির মাধ্যমে। অর্থনীতির প্রযোজনায় নগরায়ণ ও শিল্পবিপ্লব এসেছে, গ্রামীণ জীবন থেকে নাগরিক জীবনে অনুপ্রবেশের অন্তরালে স্মৃতিভান্ডারে যে দোলাচাল সৃষ্টি হয়েছে, চেতনার কার্নিশে জল পড়ে পাতা নড়ের যে অনুরণন সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে পাঠক উপলব্ধি করে নস্টালজিক নান্দনিকতার। শরৎ চন্দ্রের দেবদাসে তাল সোনাপুর গ্রামে পার্বতী-দেবদাসের আবাল্য কৈশোর ও বয়োসন্ধির আবেগ উৎকণ্ঠাকে শহুরে চুনিলাল চন্দ্রমুখীর দগ্ধ জীবনবোধের সঙ্গে কালান্তরে এক অভিনব সমান্তরাল রৈখিক চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে জীবনের সেই নিত্যতাকে নির্মাণে প্রয়াসী হয়েছেন লেখক, যা মানবজীবনের শাশ^ত সম্পর্কের কাব্যগাথা। তাল সোনাপুর গ্রাম বাংলার হাজার গ্রামের একটি, কিন্তু দেবদাস-পার্বতীর গ্রাম হিসেবে তা হয়েছে স্বনামধন্য। সাহিত্য এভাবে সমাজকে কালান্তরে পৌঁছিয়ে দেয়। নগর আর গ্রামীণ জীবনের ক্যানভাসে পরিবর্তনের প্রান্তসীমায় মানব সম্পর্কের আটপৌরে অবয়ব, আনন্দ বেদনার, অভিমান আক্ষেপের, আভিজাত্য আর আবহমান হৃদবন্ধন প্রয়াসের ধ্রুপদ সংগীত এখানে শ্রুত হয়।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিবেশে, বাঙালির রাজনৈতিক অর্থনীতির আঙিনায় এখনো রবীন্দ্রনাথ প্রচ-ভাবে প্রাসঙ্গিক। পরাধীন ভারতবর্ষে স্বাধিকার ও স্বয়ম্ভর অর্জন আকাক্সক্ষায় সমকালে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অসম্ভব ধরনের অগ্রগামী। রবীন্দ্রভাবনায় বাঙালির আত্মশক্তির বিকাশ, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা লাভের উপায়, শিক্ষা স্বাস্থ্য সমবায় কৃষি ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন উপলক্ষ বারবার ফিরে এসেছে। শিল্পবিপ্লবের বিপুল বিস্তারে গড়ে ওঠা নগর জীবনের যান্ত্রিকতার বহরে পল্লী তার সব শ্রী হারাতে বসেছে, এটা দেখে তিনি বিচলিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন কেবল এক শ্রেণির মানুষ অর্থনৈতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলে বা শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন হলে দেশের উন্নতি হয় না প্রয়োজন দেশের সামগ্রিক উন্নতির। পল্লীবাসীরা অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকলে দেশের যথাযথ উন্নতি হয়েছে বলে তিনি মানতেন না।
একবিংশ শতাব্দীর পুঁজিবাদী রাজনীতি ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন ধারা এই পর্যায়ে এখনো সবার আকাক্সক্ষা সবার সহযোগে সার্বিক উত্থান। কারও সম্পদ কেড়ে নিয়ে নয়, কাউকে ছোট করে নয়। সেভাবে এগোলে বাস্তবে সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠবে। অবকাঠামো যেখানে দুর্বল, প্রায় অতিত্বহীন, সেখানে একে অমূল্য বলা যায় না। স্থানীয় শিক্ষিত ও সম্পন্ন জনসমুদয়ের হৃদয়ানুভূতির কাছে একান্ত আবেদন, তারা যেন আপন আপন গ্রাম থেকে মুখ ফিরিয়ে না রাখেন। সমবায় কাজে তারাও যেন যোগ দেন। অর্থ-বৃত্ত চিত্ত দিয়ে তারা যেন উৎপাদন ও উন্নয়নমুখী প্রতিষ্ঠান করে গড়ে তোলেন। ধনবৈষম্যকে রবীন্দ্রনাথ কখনো প্রশ্রয় দেননি। ১৯৩৪ সালে শ্রীনিকেতনের বার্ষিক উৎসবে ‘উপেক্ষিত পল্লী’ শীর্ষক ভাষণে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, ‘বর্তমান সভ্যতায় দেখি এক জায়গায় একদল মানুষ উৎপাদনের চেষ্টায় নিজের সব শক্তি নিয়োগ করেছে, আরেক জায়গায় আরেক দল মানুষ স্বতন্ত্র থেকে সেই অন্নে প্রাণধারণ করে। চাঁদের যেমন এক পিঠে অন্ধকার, অন্য পিঠে আলো এ সেই রকম। একদিকে দৈন্য মানুষকে পঙ্গু করে রেখেছে, অন্যদিকে ধনের সন্ধান, ধন অভিযান, ভোগবিলাস সাধনের প্রয়াসে মানুষ উন্মত্ত। অন্নের উৎপাদন হয় পল্লীতে আর অর্থের সংগ্রহ চলে নগরে। অর্থ উপার্জনের সুযোগ ও উপকরণ যেখানেই কেন্দ্রীভূত স্বভাব সেখানেই আরাম আরোগ্য ও শিক্ষার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে অপেক্ষাকৃত অল্পসংখ্যক লোককে ঐশ্বর্যের আশ্রয় দান করে। পল্লীতে সেই ভোগের উচ্ছিষ্ট, যা কিছু পৌঁছায়, তা যৎকিঞ্চিৎ। এই বিচ্ছেদের মধ্যে যে সভ্যতা বাসা বাঁধে তা বেশিদিন টিকতেই পারে না।’
লেখক: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান
