এতটা একপেশে বিশ্বকাপ কি দেখেছে বিশ্ব

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৩, ০৯:৩৫ এএম

আবেদন হারাচ্ছে ওয়ানডে ক্রিকেট। ফর্মের তুঙ্গে থেকে অনেকেই বিদায় বলে দিচ্ছেন ৫০ ওভারের ক্রিকেটকে। মর্যাদার আসর টেস্ট আর রোমাঞ্চের জন্য টি-টোয়েন্টি, এতেই হবে। সেই সঙ্গে দুনিয়া জুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের হাতছানি। এমন সময়ে ভারতের মাটিতে ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ ছিল এ সংস্করণের জন্য কঠিন পরীক্ষা। বিশ্বকাপ চলার মাঝপথেই সেই পরীক্ষায় ডাহা ফেল ওয়ানডে ক্রিকেট এবং তার ১০ দলের বিশ্বকাপের সংস্করণ।

ওয়ানডের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগটা ছিল দ্বিপক্ষীয় সিরিজের অর্থহীন ম্যাচ নিয়ে। তিন বা পাঁচ ম্যাচের সিরিজে কোনো দল প্রথম দুটি বা তিনটি ম্যাচ জিতে নিলে সিরিজের বাকি দুটি ম্যাচ যেন কনে পালিয়ে যাওয়ার পর বিয়েবাড়ি। স্পন্সর, সম্প্রচারস্বত্ব, এসব নানান কারণে সিরিজের বাদবাকি ম্যাচ মাঠে গড়ায় বটে, কিন্তু তাতে দর্শকের আগ্রহ থাকে না। শীর্ষ তারকারা বিশ্রামে চলে যান। এই ‘অসুখ’ দূর করতে ২০১৯ বিশ্বকাপের পর শুরু করা হলো ‘ওয়ানডে সুপার লিগ’। তাতে চার বছর জুড়ে চলা দ্বিপক্ষীয় সিরিজগুলোতে হার-জিতের জন্য পয়েন্টভিত্তিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের একটা পদ্ধতি চালু করা হলো। ফলে দ্বিপক্ষীয় ওয়ানডে সিরিজগুলোতে একটা বাড়তি গুরুত্ব আরোপ করা হলেও যেহেতু শীর্ষ আটে থাকলেই চলে তাতে করে বড় দলগুলো গরজ দেখানো কমিয়ে দিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল বাংলাদেশে আসে শীর্ষ ক্রিকেটারদের ছাড়াই। আবার অস্ট্রেলিয়া ক্যারিবিয়ানে যায় তাদের সেরা ছয় ক্রিকেটারকে ছাড়াই! আইপিএল সূচির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়াতে দক্ষিণ আফ্রিকাও বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ খেলে শীর্ষ কয়েকজন ক্রিকেটারকে ছাড়াই। শুধু তাই নয়, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ঘরের মাঠে সিরিজও প্রোটিয়ারা পিছিয়ে দেয় এসএ টি-টোয়েন্টি লিগ আয়োজনে। বছর জুড়ে টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি; গত দুই বছর দুটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, আইপিএলের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকা, আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্রেও চালু হওয়া টি-টোয়েন্টি লিগে আইপিএলের দলগুলোর ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানায় আসা; সব মিলিয়ে ক্রিকেটের রীতিমতো অতিভোজন!

অতিভোজনে অমৃতেও অরুচি ধরে আর এবারের বিশ্বকাপের স্বাদ রীতিমতো পানসে। প্রায় মাস দেড়েকের ৪৮ ম্যাচের আসর এক মাসের মাথাতেই মনে হচ্ছে অতি দীর্ঘায়িত! যেন স্টার জলসার সিরিয়াল, কাহিনি এগোচ্ছে না শুধু এপিসোড বেড়ে যাচ্ছে! ৩৩ ম্যাচের মাথাতেই মোটামুটি বোঝা হয়ে যাচ্ছে কারা যাবে শেষ চারে। অর্থহীন ম্যাচ থেকে ওয়ানডে ক্রিকেটকে বাঁচানোর জন্য ২০২৩ বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব হিসেবে ‘ওয়ানডে সুপার লিগ’ চালু হয়েছিল, অথচ বিশ্বকাপেই অর্থহীন ম্যাচ বেড়ে যাচ্ছে।

সাত ম্যাচের ছয়টিতেই বিশাল ব্যবধানে হেরে বাংলাদেশ ছিটকে গেছে বিশ্বকাপের শেষ চারের দৌড় থেকে। তাদের এখনো বাকি আছে দুটি ম্যাচ। ৬ নভেম্বর দিল্লিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আর ১১ নভেম্বর পুনেতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। কোনো আশা নেই জেনেও ক্রিকেটারদের ভারতে থাকতে হবে আরও দিন দশেক, ভ্রমণ করতে হবে হাজার চারেক কিলোমিটার। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডের বাকি আছে আরও তিন ম্যাচ। তাদের শেষ চারে থাকতে হলে বাকি তিনটি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস এবং পাকিস্তানকে হারাতে হবে বিশাল ব্যবধানে। সেই সঙ্গে কামনা করতে হবে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড যেন তাদের বাকি সব ম্যাচ হারে আর পাকিস্তান, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং নেদারল্যান্ডসের কোনো দলই যেন ১০ পয়েন্টে পৌঁছাতে না পারে। অসম্ভব এক সমীকরণ, যা না মেলার সম্ভাবনাই বেশি। তবুও বাটলারের দল ভারতে থাকছে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত। অনেকটা একই রকম সমীকরণ নেদারল্যান্ডসেরও। আফগানিস্তান, ইংল্যান্ড এবং ভারতের বিপক্ষে জিততে হবে আর কামনা করতে হবে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড যেন আর ম্যাচ না জেতে! অস্ট্রেলিয়ার খেলা বাকি আছে ইংল্যান্ড, আফগানিস্তান আর বাংলাদেশের বিপক্ষে। আফগানরা অঘটন ঘটানোর সম্ভাবনা রাখলেও বাকি দুই দলের মানসিক অবস্থাই নেই তুঙ্গে থাকা অস্ট্রেলিয়ার পাল্লা নেওয়ার।

টানা চার জয়ে বিশ্বকাপে দারুণ শুরু করা নিউজিল্যান্ড এরপর টানা তিন ম্যাচ হেরে খানিকটা শঙ্কায়। একটা সময় মনে হচ্ছিল সবার আগে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করবে বরাবরের সেমিফাইনালিস্ট কিউইরা, সাত ম্যাচে ৮ পয়েন্ট নিয়ে চারে থাকলেও ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে পাকিস্তান। শনিবার বেঙ্গালুরুতে পাকিস্তানকে হারিয়ে দিলেই নিউজিল্যান্ডের সেমিফাইনালও প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাবে।

সাত ম্যাচে অপরাজিত ভারত ১৪ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে। স্বাগতিকরা রীতিমতো অশ্বমেধের ঘোড়া, তাদের থামানো হয়ে উঠছে অসাধ্য। সাত ম্যাচে ১২ পয়েন্ট আর ২-এর বেশি নেট রানরেট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলে দক্ষিণ আফ্রিকার জায়গাটা সুসংহত। শুরুতে হোঁচট খেলেও ঘুরে দাঁড়িয়ে ছয় ম্যাচে চার জয়ে অস্ট্রেলিয়া ৮ পয়েন্ট নিয়ে শক্তিশালী অবস্থানে, শেষ তিন ম্যাচের দুটিতে প্রতিপক্ষ ধুঁকতে থাকা ইংল্যান্ড আর বাংলাদেশ। একটু চিন্তা থাকতে পারে শুধু আফগানিস্তানকে নিয়ে।

৪ তারিখে নিউজিল্যান্ড যদি পাকিস্তানকে হারিয়ে দেয়, তাহলে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বটা একেবারেই অর্থহীন হয়ে যাবে। ১৫ নভেম্বর প্রথম সেমিফাইনালের আগে বাকি যে ম্যাচগুলো হবে সেসব নিছক দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মধ্যে দুই, তিন, চার কোন দলগুলো হবে সেসবের প্লেসমেন্ট। হয়তো চার নম্বর জায়গাটা এড়াতে চাইবে তিন দলই, যাতে সেমিফাইনালেই স্বাগতিকদের সঙ্গে দেখা না হয়ে যায়।

শুরু থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত বিশ্বকাপে ছিল দুটি গ্রুপ, দুই গ্রুপের শীর্ষ দুই দল খেলে সেমিফাইনাল। ১৯৯২ বিশ্বকাপে রঙিন জার্সি আর সাদা বলের সঙ্গে ৯ দলের সবার সঙ্গে সবার খেলার পদ্ধতি চালু হয়। তাতে গ্রুপ পর্ব শেষে চতুর্থ জায়গাটার জন্য লড়াই ছিল তিন দলের। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ৭৪ রানে অলআউট হয়েও বৃষ্টিতে প- হয় ম্যাচটি, সেই সুবাদে পাওয়া ১ পয়েন্টের সুবাদে অস্ট্রেলিয়া এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পেছনে ফেলে সেমিফাইনালে ওঠে পাকিস্তান। বাকিটা তো ইতিহাস। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে দল বাড়লেও গ্রুপ পর্বের পর কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই নকআউট পর্ব চালু হওয়াতে অর্থহীন ম্যাচ বাড়েনি। পাঁচ ম্যাচের পরই শিরোপার লড়াইয়ের বাইরে থাকা দলগুলো ধরেছে ফিরতি ফ্লাইট। ১৯৯৯ সালে ১২ দল বিশ্বকাপে খেললেও ম্যাচ ছিল মাত্র ৪২টি। দুটো গ্রুপ থেকে গ্রুপ পর্বের সেরা তিন নিয়ে সুপার সিক্স, অর্থাৎ পাঁচটা ম্যাচ পর হিসাবের বাইরের ছয় দলকে নিতে হয়েছে বিদায়। ২০০৩ সালে ১৪ দলের বিশ্বকাপ, সেখানেও দুটি গ্রুপ এবং ছয় ম্যাচ পর আট দলকে নিতে হয় বিদায়। টিকে থাকে সুপার সিক্সের ছয় দল। ১৬ দলের ২০০৭ বিশ্বকাপে তো চার দলের গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুই যায় সুপার এইটে, তাই অর্ধেক দল বিদায় নেয় চার ম্যাচের পরই। ২০১১ সালে আবার সুপার এইট বিলুপ্ত, ১৪ দলের বিশ্বকাপে ৪৯টি ম্যাচ। দুটি গ্রুপ, তাই ছয় ম্যাচ খেলার পর নকআউটের শুরু কোয়ার্টার ফাইনালে। ২০১৫ বিশ্বকাপেও একই পদ্ধতি। ছয়টি গ্রুপ ম্যাচের পর নকআউট, যারা গ্রুপের শীর্ষ চারে নেই তাদের নিতে হয়েছে বিদায়। ২০১৯ সালে বিশ্বকাপ ফের সেই ১০ দলের সংস্করণে ফিরলেও একপেশে হয়নি, বরং পয়েন্ট টেবিলে সাপ-লুডুর খেলার মতো ওঠানামা ছিল প্রতিনিয়ত। দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে সমীকরণ জমিয়ে তুলেছিল বাংলাদেশ, ছিল বৃষ্টির ভূমিকাও।

অথচ সাত ম্যাচ খেলে, ছয়টায় হেরে এখনো বিশ্বকাপে আছে বাংলাদেশ। থাকবে আরও দিন দশেক। খেলবে দুটি ম্যাচ। ঠিক পরের ম্যাচটাই বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা, যেটা হয়তো বিশ্বকাপের সবচেয়ে অর্থহীন ম্যাচ হতে পারে। কারণ দুই দলেরই যে আর এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। দিন যত গড়াবে, একপেশে বিশ্বকাপে ততই বাড়বে অর্থহীন ম্যাচের সংখ্যাও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত