প্রতারণা এবং বিভ্রান্ত করা কিছু মানুষের স্বভাব। এটা তাদের ভুল নয়। আসলে লোভ আর আত্মস্বার্থ উদ্ধারের হীন মানসিকতাই মানুষকে এই পথে পা বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করে। থেমে থেমে চলা, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও তাদের জোটের সমর্থনে বর্তমান ধর্মঘটের সময়ও এক ধরনের প্রতারণা করলেন পরিবহন মালিক সমিতির প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা। তারা বলেছিলেন ধর্মঘটের সময় রাস্তায় গাড়ি চলবে। এই ঘোষণায় আর যাই হোক, দলমতনির্বিশেষে খেটেখাওয়া মানুষ স্বস্তি পেয়েছিলেন এই ভেবে যে, কর্মস্থলে যেতে-আসতে কোনো পরিবহন সংকট হবে না। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে তার উল্টো। আমরা যেন উল্টো দৃশ্যেই অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
কথা দিয়ে কথা না রাখা, রাজনীতিতে নতুন কিছু না। কিন্তু সারা বছর যারা সরকারের ঘি-মাখন খান, দুঃসময়ে সেই তারাই পিছটান দেন। পরিবহন মালিকদের এমন আচরণ সাধারণ মানুষকে স্তম্ভিত করেছে। তারা যুক্তি দেখাচ্ছেন, কেন সব গাড়ি রাস্তায় নামানো হয়নি! কিন্তু সবই কি ধোপে টেকে?
এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শনিবার প্রকাশিত ‘ঘোষণা দিয়েও অবরোধে বাস চালাননি পরিবহন নেতারা!’ প্রতিবেদন জানাচ্ছে অবরোধের প্রথম দিন অনেক রুটে পরিবহন মালিক সমিতির নেতা খন্দকার এনায়েত উল্লাহর প্রতিষ্ঠান এনা পরিবহনের বাস চলাচলের সংখ্যা ছিল স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক কম। বেশ কয়েকটি রুটে বন্ধ ছিল তার প্রতিষ্ঠানের বাস চলাচল। শুধু এনায়েত উল্লাহই নন, অন্য আরও অনেক নেতার প্রতিষ্ঠানের বাসগুলোর চলাচলের ক্ষেত্রে একই চিত্র দেখা গেছে। আবার ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিকল্প পরিবহনের মালিক জানাচ্ছেন, অবরোধের জন্য অনেক সময় চালক পাওয়া যায় না। সেই সঙ্গে যাত্রীও কম থাকায় সব গাড়ি সড়কে নামানো হয়নি।
পরিবহন নেতাদের বাস সব মিলিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলেছে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। কিন্তু বিপরীত চিত্র দেখা যায়, পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সদস্যদের ক্ষেত্রে। অবরোধ চলাকালে সড়কে চলাচলকারী অধিকাংশ বাসই ছিল তাদের। তবে ঢাকায় সদরঘাট-মিরপুর রুটে চলাচল করে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সহসভাপতি শফিকুল আলমের তানজিল পরিবহনের বাস। পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা ঘোষণা দিয়েও তাদের মালিকানাধীন কোম্পানির বাস কম চালানোয় স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ সাধারণ বাস মালিকরা। তবে এ ব্যাপারে একজন বাস মালিকের বক্তব্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন পরিবহন নেতারা আমাদের হরতাল-অবরোধে বাস নামাতে বলেন সড়কে। কিন্তু তাদের গাড়ি সড়কে দেখা যায় না। আমার মতো সাধারণ বাস মালিক যারা আছে, তাদের গাড়ির কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তারা (পরিবহন নেতারা) অবরোধে সড়কে গাড়ি নামালে ক্ষয়ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে দেবেন বলে আশ্বাস দিলেও পরে আর কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না। তবে এ ব্যাপারে অবশ্যই একটা সিদ্ধান্তে আসা দরকার। কারণ বেশ কয়েকজন বাস মালিক যখন বলছেন ক্ষতিপূরণের কথা তখন পরিবহনের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বকে এই বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। না হলে অবরোধের সময় কোনো গাড়ি থাকবে না। এর ফলে ভোগান্তি হবে সাধারণ মানুষের। পরিবহনের সর্বোচ্চ নেতা যখন বলেন আমার কাছে রেকর্ড আছে, আমার গাড়ি অবরোধের মধ্যে চলাচল করেছে। এখন সারা দেশে আমার ৩০০ গাড়ি চলাচল করে। কিন্তু যদি যাত্রী না থাকে তাহলে কীভাবে সব গাড়ি চলবে? এখানে আবার প্রশ্ন আসে, তাহলে ধর্মঘটের আগে তিনি কোন পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন, অবরোধে গাড়ি চলবে?
এ ধরনের প্রতারণা ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত, তা তদন্ত করা দরকার। একই সঙ্গে বলা প্রয়োজন, বাস্তবতা যদি বলেই বাস চালানো সম্ভব না, তাহলে সরকারকে বিভ্রান্ত না করাই ভালো। ফ্রেডরিখ নিৎশের একটা কথা আছে আমি বিচলিত নই যে, আপনি আমাকে মিথ্যা বলেছেন। আমি বিরক্ত এই কারণে যে, এখন থেকে আমি আপনাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। কিন্তু এ ব্যাপারে শুধু বিরক্ত হলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
