শিক্ষা ক্যাডারে হযবরল

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৩, ১০:৫৫ এএম

একটি সমাজে যখন সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের ছড়াছড়ি, তখন শিক্ষা ক্যাডার কেন বাদ যাবে? অবশ্য এই বৈষম্য একটু অন্য ধাঁচের। অনেকটা মেধাবৃত্তিক চাতুর্য। অথবা বলা যেতে পারে, প্রবল লিপ্সা এবং উচ্চাকাক্সক্ষার গোষ্ঠী সমাজ প্রভাবক একটি শ্রেণিকে যেন কোণঠাসা করে রেখেছে। তবে এই বৈষম্যের শুরু হয়েছে দীর্ঘদিন। বর্তমানে শুধু প্রকট আকার ধারণ করেছে।

আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন, অধ্যাপক পদ তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত, শিক্ষা ক্যাডারকে নন-ভ্যাকেশন সার্ভিস ঘোষণা করে অর্জিত ছুটি, ক্যাডার কম্পোজিশন সুরক্ষা নিশ্চিত, শিক্ষা ক্যাডারের পদ থেকে শিক্ষা ক্যাডার বহির্ভূতদের প্রত্যাহার ও শিক্ষা ক্যাডারে প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টির দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে দীর্ঘদিন। তবু দাবি পূরণ করা হয়নি। কেন বিলম্ব হচ্ছে? এর উত্তর জানতে হলে, প্রয়োজন দীর্ঘ বিশ্লেষণের। তবে সংক্ষেপে বলা যায়, বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের প্রায় সব বিষয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতিতে জটিলতার মূল কারণ হচ্ছে, ক্যাডার-ক্যাডারে দ্বন্দ্ব।

এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে রবিবার ‘অন্তহীন বৈষম্য শিক্ষা ক্যাডারে’ প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। চাকরির বয়স পাঁচ-ছয় বছর হলে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সব ক্যাডারের কর্মকর্তারাই পদোন্নতি (ষষ্ঠ গ্রেড) পান। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারে সে সুযোগ নেই। অনেককেই এক পদে ১০-১২ বছর চাকরি করতে হয়। ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি হয় না। অন্য ক্যাডারে এর জন্য পদ খালি থাকার প্রয়োজন হয় না। তারা সুপার নিউমারারি পদে পদোন্নতি পান। শিক্ষা ক্যাডারে পদ খালি নেই বলে পদোন্নতি হয় না। তাই নতুন পদও সৃষ্টি করা হয় না।

এই না হওয়ার কারণ কী? একটি বিষয় মনে হয়, গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার। কী এমন কারণে শিক্ষা ক্যাডারের মেধাবীদের দাবিয়ে রাখা হচ্ছে? আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য শিক্ষা ক্যাডার সৃষ্টি হলেও শিক্ষা ক্যাডারকে বিশেষায়িত পেশা হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি। বঞ্চনা আর বৈষম্যের মাধ্যমে এ পেশার কার্যক্রমকে সংকুচিত করা হয়েছে। গ্রাস করছে অদক্ষ অপেশাদাররা। প্রায় সব ক্যাডারে গ্রেড-১, গ্রেড-২, গ্রেড-৩ পদ রয়েছে। কেবল শিক্ষা ক্যাডারে নেই। আদালতের রায়ে শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপকরা গ্রেড-৩ পেলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। কার্যত শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা চতুর্থ গ্রেডের ওপরে যেতে পারেন না। অন্য সব ক্যাডারের কর্মকর্তারা সহজেই তা টপকে যান। এমনকি ক্যাডার পরিবর্তনের মাধ্যমে উপসচিব মর্যাদায় উন্নীত হতে অন্যান্য ক্যাডারের সঙ্গে শিক্ষা ক্যাডারের অন্তত ১০ ব্যাচের পার্থক্য থাকে।

দেশের সার্বিক শিক্ষার উন্নয়নকল্পে শিক্ষা ক্যাডারের নানাবিধ সমস্যা ও  যৌক্তিক দাবিগুলো কর্তৃপক্ষের নজরে নিয়ে আসা হলেও তা আজও পূরণ হয়নি। কারণ হচ্ছে, এই দাবি পূরণের চাবি যাদের হাতে, তারা রয়েছেন প্রশাসন ক্যাডারে। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে, প্রায় সব ক্যাডারের কর্মকর্তারা চাকরির শুরু থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি গাড়ির সুবিধা পান। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যক্ষরাও তা পান না!

এ পেশাকে গ্রাস করছে অনভিজ্ঞ অপেশাদাররা। কিন্তু এই ক্যাডারকে অবকাশমুক্ত করা জরুরি। সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে ২৬টি ক্যাডারে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব ক্যাডারের মধ্যে পদোন্নতি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্য আছে। পিএসসিই যদি এমন কথা বলে, তাহলে আর কিছু বলার থাকে না। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, যে পদগুলো মন্ত্রণালয়ের হাতে আছে, সেগুলো শিক্ষার ক্যাডাররাই পূরণ করবেন। অন্য দাবিগুলো পূরণে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তবে এসব ব্যাপারেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নেবে। আমরা কিছুদিন দেখব। যদি অগ্রগতি দেখতে না পাই, তাহলে পরবর্তী করণীয় ঠিক করব। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, ‘পরবর্তী করণীয়’তে শিক্ষা ক্যাডারের নানাবিধ বৈষম্য দূর করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে সরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত