ঢাকা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর। এর অর্থ হলো, জনবহুল এ শহরের বাতাসের মান ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে। তবে কিছু শহর এর ব্যতিক্রম। এই দূষণ পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের মানসিকতাকেও দূষিত করেছে। কারণ বায়ুদূষণে মানসিক সমস্যার সম্ভাবনা প্রবল। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন শরীরে তখন বিশেষ ধরনের হরমোন নিঃসৃত হয়। দেখা দেয় অনিদ্রা, ক্ষুধামান্দ্য এবং অবসাদগ্রস্ততা। ফলে মেজাজ খিটখিটে হওয়া স্বাভাবিক। আবার মানুষের চরিত্র যখন দূষিত হয়, তখন ক্রোধ এবং মাত্রাতিরিক্ত লোভ তাকে ঘিরে ফেলে। এই দূষণে আক্রান্ত দেশের প্রায় সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী। এমনকি হাজতখানা এবং জেলখানাও সর্বগ্রাসী মানসিক দূষণে জর্জরিত। আমরা ভুলে যাই, অপরাধীর সঙ্গে অনেক নিরপরাধ মানুষও হাজত খাটেন। কোনো অপরাধ করেননি, এমন অসংখ্য নজির রয়েছে যিনি জেল খেটেছেন। এসব নিরপরাধ মানুষের কথা আলাদা। কিন্তু যারা অপরাধ করেছেন এবং বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে জেল খাটছেন সেই জেলখানাতেও চলছে অন্যায়-অপরাধের বাহারি কর্মকা-। কোর্ট হাজতখানায় কোনো আসামিকে দেখতে গেলে বা খাবার দিতে গেলে সর্বনিম্ন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে ভাত দেওয়া তো দূরের কথা, দেখা করারও সুযোগ নেই।
প্রতি থানায় সাধারণত দুটো হাজতখানা থাকে। একটা পুরুষ, অপরটি নারীদের। ঘুমানোর জন্য বিছানা, বালিশ, বৈদ্যুতিক পাখা বা গোসলের কোনো ব্যবস্থা নেই। আসামিরা সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েন মলমূত্র ত্যাগ নিয়ে। আসামি ১০ জন থাকুক আর ৫০ জন থাকুক, তাতে কিছু পরিবর্তন হয় না। কারাগারে বৈদ্যুতিক পাখা, ঘুমানোর বিছানা, চিত্তবিনোদনের জন্য টেলিভিশন বসছে। তবে কোনো পরিবর্তন নেই হাজতখানায়। আবার ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বন্দি, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, চিকিৎসক না থাকা, বিশুদ্ধ পানির সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা কারাগারগুলোতে কমবেশি রয়েছে। টাকা ছাড়া সেখানে কিছুই মেলে না। সিট বাণিজ্য, মোবাইল ফোনের ব্যবহার সবই চলছে। এক হাজার টাকার বিনিময়ে রাতভর মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ মেলে। নতুন এই কারাগারে থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ব্যবসা। টাকার বিনিময়ে মাদকও পাওয়া যায়। শোনা যায়, অনৈতিক কিছু কর্মকান্ডের কথাও।
হাজতখানার বিষয়ে সোমবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘টাকা দিলেই খাবার ঢোকে হাজতে!’ প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম জেলা আদালতের হাজতখানার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। জানা যাচ্ছে, বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের হাজতখানায় ঢুকে একনজর দেখতে এবং প্রিয়জনদের জন্য বাসাবাড়ি থেকে নিয়ে আসা খাবার পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে স্বজনদের কাছে টাকা দাবি করছেন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। টাকা পেলেই হাজতখানায় বন্দি ও আসামিদের খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। এই চিত্র শুধু জেলার থানা ও আদালতের হাজতখানায় নয়, চট্টগ্রাম মহানগর থানা ও আদালতের হাজতখানারও। আর দেশের বিভিন্ন বিভাগ-জেলা-উপজেলার হাজতখানা এবং জেলখানার কী চেহারা? কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিকে সেবা দেওয়ার নামে চলছে অনিয়ম আর দুর্নীতি। একজন বন্দিকে কারাগারে আরামে থাকতে হলে অবশ্যই তাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা গুনতে হচ্ছে। দিতে হয় নিত্যদিনের খাবার ও কারা ক্যানটিন থেকে অতিরিক্ত খাবারের টাকা।
বন্দিদের দুবেলা মানসম্মত এবং পরিমিত খাবার না দেওয়ার জন্যই কি সেখানে একটি ক্যানটিন করেছে কারা কর্তৃপক্ষ? আবার জেলখানার ভেতরেই পাওয়া যায় সব ধরনের মাদক। অধিকাংশ আসামি মাদকের ব্যবহার ও ব্যবসা করে যাচ্ছে। টাকা দিলে শীর্ষ সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে যে কেউ অসুস্থ না হয়েও কারা হাসপাতালে আরাম-আয়েশে থাকতে পারেন। এই ধরনের অন্যায়-অপরাধ কীভাবে ঘটছে, তার তদন্ত কে করবে? থানা ও আদালতের হাজতখানার আসামিদের জন্য দৈনিক দুবেলার খাবার বাবদ বরাদ্দ বর্তমানে ১৫০ টাকা। কিন্তু গত আড়াই বছরে আসামিদের দুপুরের খাবার না দিয়েও সরকারি কোষাগার থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে ১৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা। যাদের স্বজনরা হাজতখানায় আসেন না কিংবা টাকা থাকে না, তাদের উপোস করে যেতে হয় কারাগারে। তবে হাজতখানা ও জেলখানায় যে পরিমাণ অর্থ আসামির জন্য বরাদ্দ রয়েছে তার অঙ্ক বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। মানবিক কারণেই হাজতখানা ও জেলখানার পরিবেশ আরও উন্নত করা দরকার। অপরাধী-নিরপরাধীকে একই দৃষ্টিতে দেখা কোনোভাবেই ঠিক হবে না।
