পশ্চিমে সূর্য অস্ত গেছে ঘণ্টাখানেক আগেই। সন্ধ্যা নামতেই জ্বলে উঠেছে ফ্লাড লাইট। কার্তিকের শেষ বেলায়ও প্রকৃতিতে উষ্ণতা। সেই আবহাওয়াতেই কৃত্রিম আলোয় গা গরমের অনুশীলন করেছে বসুন্ধরা কিংস। ঘরের ছেলেরা ফিরে যাওয়ার পরই মাঠে আসে ভারত চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। যুব ভারতি কিংবা কলকাতার মাঠগুলোতে যারা সবুজ মেরুন জার্সি জড়িয়ে খেলতে নামে। অনুশীলনে তাদের পদচিহ্ন পড়তেই কিংস অ্যারেনায় যেন নেমে আসে ‘মেরুন সন্ধ্যালোক’।
ওপার বাংলার জনপ্রিয় ব্যান্ড দল ‘মহীনের ঘোড়াগুলির’ গানের শিরোনামটার আংশিক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। তাদের আবার ধরা হয় প্রথম বাংলা ব্যান্ড হিসেবে। যারা বাংলা গানে নতুন ধারা যোগ করেছিল। তেমনি মোহনবাগানও ঐতিহ্যবাহী একটি ক্লাব। জেমস কামিংসের মতো বিশ্বকাপ খেলা তারকাদের দলে ভিড়িয়ে ভারতীয় ফুটবলে নতুন দিনের সূচনা করতে তারাও বেশ অগ্রসর। সেই দলটি এএফসি কাপের ফিরতি লেগের ম্যাচ খেলতে এসেছে ঢাকায়।
আজ বসুন্ধরা কিংসের মাঠে রাত ৮টায় শুরু হবে খেলাটি। যে ম্যাচটি জয়ের জন্য মুখিয়ে আছে দুই দলই। এই ম্যাচে জিতলেই তিন পয়েন্ট। টুর্নামেন্টের পরের ধাপে যেতে যা দুই দলের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এএফসি কাপে এখন পর্যন্ত তিন ম্যাচ খেলা বসুন্ধরার জয়-পরাজয় ও ড্র আছে একটি করে। তাতে ৪ পয়েন্ট নিয়ে তারা আছে তালিকার দুই নম্বরে। অন্যদিকে ৭ পয়েন্ট নিয়ে সবার শীর্ষে থাকা মোহনবাগানের দুটি জয়ের সঙ্গে আছে একটি ড্র। যেটি হয়েছে বসুন্ধরার সঙ্গে সবশেষ দেখায়। দুর্গাপূজার কারণে যে ম্যাচটি হয়েছিল ভুবনেশ্বরের কলিঙ্গ স্টেডিয়ামে। গত ২৪ অক্টোবর রাতের সেই লড়াইয়ে ২-২ গোলে সমতায় শেষ হয় খেলাটি।
ভুবনেশ্বরের সেই লড়াইয়ের আগে দুই দল তিনবার মুখোমুখি হয়েছিল। যেখানে এক পরাজয় ও দুই ড্র ছিল বসুন্ধরার। ভারত চ্যাম্পিয়নকে এখনো হারাতে পারেনি টানা চারবারের বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নরা। তবে সবশেষ মোকাবিলার ড্রটাকে আত্মবিশ্বাস হিসেবে কাজে লাগাতে চান অস্কার ব্রুজনের শিষ্যরা।
কারণ ভিসা জটিলতায় ভারত যাওয়া নিয়ে শঙ্কা ছিল বসুন্ধরা কিংসের। একটা সময় মনে হয়েছিল যাওয়াই হবে না তাদের। তবে শেষ বেলায় সেটা হলেও ম্যাচের দিন সকালে তারা সেখানে পৌঁছায়। নানা শঙ্কা আর উৎকণ্ঠায় ম্যাচের দিন সকালে তারা ভারত পৌঁছায়। ভ্রমণক্লান্তি নিয়েও রাতে খেলতে নেমেই দাপুটে লড়াই করে ড্র। তাই আত্মবিশ্বাসের জোরে কোচ অস্কার ব্রুজন তো বলেই দিলেন জয় পেতে চান ম্যাচটিতে।
কিংস অ্যারেনায় আয়োজিত সংবাদ সম্মলনে অস্কার বলেন, ‘এটা গ্রুপে আমাদের চতুর্থ ম্যাচ। গ্রুপটা এখনো উন্মুক্ত। আমরা মোহনবাগানের শক্তি সম্পর্কে জানি। ওরা বড় ক্লাব। আইএসএল ও এএফসি কাপে এগিয়ে আছে। আমরাও সামনে তাকাচ্ছি। ঘরের মাঠে অবশ্যই ইতিবাচক ফল চাই। মোহনবাগানের সঙ্গে গত ম্যাচে আমরা ড্র করেছি। কাল ঘরের মাঠে খেলার কারণে আমরা সুবিধা পাব।’
অ্যাটাকিং ফুটবলই মোহনবাগানের শক্তি। দলে আছেন অস্ট্রেলিয়ান জেসান কামিংস ও দিমিত্রি পেত্রাদোচ। যার মধ্যে কামিংস আবার খেলেছেন কাতার বিশ্বকাপে। শেষ ষোলোর ম্যাচে তিনি প্রতিপক্ষ ছিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসির। এ ছাড়া জাতীয় দলের খেলা ৮ ফুটবলারই এই দলের হয়ে খেলেন। তাদের হাত ধরেই সবশেষ ডুরান্ড কাপের শিরোপা তারা ঘরে তুলেছে। তা ছাড়া তারা ভারত চ্যাম্পিয়নও। এমন দলটিকে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা মানলেও ম্যাচ নিয়ে আশাবাদী কোচ।
বলেছেন, ‘মোহনবাগান দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ক্লাব। তবে কালকের ম্যাচ নিয়ে আমরা আশাবাদী। গত তিন ম্যাচেই আমরা গোল খেয়েছি। এ ম্যাচে গোল খাওয়া চলবে না। আমাদের সাবধান থাকতে হবে। ভুল করা চলবে না। ১১ জনকেই ডিফেন্ডার হতে হবে। আমাদের পরিকল্পনা হলো, আক্রমণাত্মক খেলা। আমরা গোল করতে চাই, জিততে চাই। ফুটবলে গুরুত্বপূর্ণ হলো আক্রমণে। ড্র হলে মোহনবাগানের জন্য ভালো ফল। কিন্তু আমাদের অবস্থা ভিন্ন। আমাদের জিততেই হবে।’ অধিনায়ক রবসন রবিনহোর লক্ষ্যটাও একই, ‘আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ম্যাচ। আমরা জয়ের লক্ষ্য নিয়েই খেলব। তিনটি পয়েন্টের জন্যই খেলব আমরা। যাতে করে আমরা পরবর্তী ধাপে যেতে পারি।’
একই সুরে সুর মিলিয়েছেন মোহনবাগনের স্প্যানিশ কোচ হুয়ান ফেরান্দো। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘ম্যাচটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিন পয়েন্ট পেতে আমরা সেরাটাই দেব। জানি, কঠিন ম্যাচ হবে। বসুন্ধরা বাংলাদেশের সেরা দল। তাদের হারানো সহজ নয়।’
তারপর পরিসংখ্যান টেনে বলেন, ‘গ্রুপে এখন আমরা তিন পয়েন্ট এগিয়ে। কিংসের সঙ্গে আগে জিতেছি। তবে আগে কী হয়েছে, সেটা দেখে লাভ নেই। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বসুন্ধরার বিদেশিরা বেশ ভালো, মানসম্মত। ‘কিংসের মাঠে প্রথম খেলছি আমরা। কঠিন হবে জেতা। অবশ্যই আমাদের লক্ষ্য হলো জেতা।’
মোহনবাগান অধিনায়ক শুভাশীষ বোস বললেন, ‘এ ধরনের ম্যাচে আমরা অভ্যস্ত। ইস্ট বেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচ কতই হয়। অ্যাওয়ে ম্যাচে জানি প্রতিপক্ষ সমর্থন পাবে। তবে আমরা ইতিবাচক। অবশ্যই সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব। দুই বাংলার ম্যাচ। আর প্রত্যেকে আমরা ৯০ মিনিটের প্রতিপক্ষ। পরের সময়টা একে অন্যের শুভাকাক্সক্ষী। তারা ভারত গেলে সাক্ষাৎ করে, আমাদেরও কেউ এদিকে এলে তাদের সঙ্গে দেখা করি।’
এই ফাঁকে অনিবার্য প্রশ্নটাও হলো ইলিশ মাছ খেয়েছেন? একটু ভেবে তারপর বলেন, ‘হ্যাঁ খেয়েছি।’ ছোট্ট করে হাসি মুখে বললেন মোহনবাগান অধিনায়ক।
